‘এ গ্রেডের মাল লাগব, দিতে পারবেন?’
‘পারমু। এক ঘণ্টা পর হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দেন।’
এই কথোপকথনটি কোনো সাধারণ পণ্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে নয়। ভয়ংকর এক অপরাধ চক্রের সদস্যের সঙ্গে। যে চক্র জাল টাকা তৈরি ও বাজারজাত করে সর্বস্বান্ত করছে মানুষকে। কুরবানির ঈদ সামনে রেখে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই চক্র। ফেসবুক পেজ খুলে প্রকাশ্যেই চলছে জাল নোটের কেনাবেচা, দেওয়া হচ্ছে ‘এ গ্রেড’ জাল টাকার বিজ্ঞাপন। অনলাইনেই অর্ডার, অগ্রিম লেনদেন আর কুরিয়ারে সরবরাহের আশ্বাসে বিস্তার লাভ করছে এই অপরাধ চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে সদস্যরা গ্রেফতার হলেও আইনের ফাঁকফোকর ও বিচার দীর্ঘসূত্রতায় বারবার ফিরে আসছে তারা। ফলে ঈদকেন্দ্রিক বাজার ও পশুর হাটকে ঘিরে বাড়ছে সাধারণ মানুষের শঙ্কা।
জাল টাকা বিক্রির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ফেসবুক পেজ ‘জাল টাকা’য় দেওয়া ফোন নম্বরে (০১৯৮....৭৩) বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টায় উপর্যুক্ত কথা হয় এ প্রতিবদকের।
রাত প্রায় সাড়ে ১০টায় ফিরতি ফোন আসে জাল টাকা কারবারির কাছ থেকে। অপরপ্রান্ত জানতে চাওয়া হয়, কী পরিমাণ জাল টাকা লাগবে। তারপরই বলেন, তার কাছে ৫০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত সব ধরনের জাল নোট আছে। কোয়ালিটি এ গ্রেডের। এক লাখ জাল টাকার বান্ডিল ১২ হাজার টাকা। তবে অর্ধেক টাকা অগ্রিম দিতে হবে। টাকা পাওয়ার পর বান্ডিল কুরিয়ারে পৌঁছে দেওয়া হবে।
আরও পড়ুন
কথপোকথনের এক পর্যায়ে জানান, তার বাড়ি দিনাজপুরে। শুক্রবার তিনি ঢাকায় আসবেন। চাইলে গুলিস্তানে তার সঙ্গে দেখা করা যাবে। সঙ্গে স্যাম্পলও (জাল নোট) থাকবে। সেখানেই জাল নোটের মান যাচাই করে দেখে নেওয়া যাবে।
এভাবেই অনলাইনে জাল টাকা বিক্রি পেজ খুলে প্রকাশ্যেই জাল নোটের কেনাবেচা করছে জাল নোটের কারবারিরা। ‘জাল টাকা বানাই’, ‘জাল টাকা বিক্রি করি’, ‘এ গ্রেট জাল নোট পাইকারি’, ‘টাকার শহর’, ‘জাল টাকা’, ‘জাল টাকার বাজার’, ‘জাল টাকা বিক্রির ডিলার’ এরকম বিভিন্ন নামে অনলাইনে জাল টাকা কেনাবেচা হচ্ছে। তবে এসব পেজ বিশ্লেষণে এবং এখানে অনেকের মন্তব্য (কমেন্টস) বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই কারবারেও অনেক প্রতারণা হয়। এসব পেজে পোস্ট দেওয়া হয় আকর্ষণীয় ইমেজ ও ভিডিও।
‘জাল টাকা আনপেকিং দেখুন। একদম রিয়েল রিবি’ও (রিভিউ) এবং এই কুরবানির ঈদে আমরা নতুনদের সুযোগ দিচ্চি (দিচ্ছি) এবং অফার তো থাকছেই। আসন্ন ঈদের জন্য আমাদের অফার এ মাল দেওয়া হচ্ছে, যারা অর্ডার করবেন তারাই পাবেন, অফার পেতে ১ লাখের ওপরে অর্ডার থাকতে হবে।’
এটা অনলাইনে জাল নোট বিক্রির পেজ ‘জাল টাকা বিক্রি প্রতিরোধ’র একটি ভিডিও পোস্ট। যেখানে ৫০০ টাকার দুটি জাল নোটের বান্ডিল আনপ্যাকিং দেখানো হচ্ছে। আরেকটি ভিডিওতে কাগজের কার্টনে সারি সারি জাল নোট প্যাকিং করার ভিডিও দেখানো হয়। ‘মাল বানানোর কিছু প্রক্রিয়া দেখানো হলো। ৫০ বান্ডিল এ গ্রেড।’- এ রকম ক্যাপশন দিয়ে জাল নোট কীভাবে প্রিন্টারের মাধ্যমে ছাপা হয়ে বের হচ্ছে দেখানো হচ্ছে তাও।
প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদকে সামনে রেখে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে জাল নোট তৈরি ও বিক্রি চক্রগুলো। সেসব জাল নোট এখন বাজারেও ছাড়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কিছু কিছু ধরাও পড়ছে। তবে সেই সংখ্যা খুবই সামান্য।
গত ১৩ মে পৃথক অভিযানে র্যাব ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) রাজধানী কমলাপুর, উত্তরা ও গাজীপুর থেকে ৩৪ লক্ষাধিক টাকা মূল্যমানের জাল টাকা ও জাল টাকা তৈরির সরঞ্জামসহ চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করে।
জাল টাকার কারবারিরা এখন অনলাইন ও অফলাইন সর্বত্র সক্রিয়। মূলত ঈদ, পূজা বিশেষ করে ঈদুল আজহায় কুরবানির পশুর হাটকে সামনে রেখে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রগুলো। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
খুচরা বিক্রতাদের আস্থা অর্জনের জন্য ফেসবুক পেজে রীতিমতো ইমেজ, ভিডিও দিয়ে চালানো হচ্ছে প্রচার। কোনো কোনো পেজে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হচ্ছে ফোন নম্বর।