এ গ্রেডের মাল লাগব...হোয়াটসঅ্যাপে কল দেন

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

‘এ গ্রেডের মাল লাগব, দিতে পারবেন?’‘পারমু। এক ঘণ্টা পর হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দেন।’এই কথোপকথনটি কোনো সাধারণ পণ্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে নয়। ভয়ংকর

2026-05-16T00:12:26+00:00
2026-05-16T02:31:53+00:00
 
  শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
এ গ্রেডের মাল লাগব...হোয়াটসঅ্যাপে কল দেন
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ১২:১২ এএম  আপডেট: ১৬.০৫.২০২৬ ২:৩১ এএম
প্রতীকী ছবি
‘এ গ্রেডের মাল লাগব, দিতে পারবেন?’

‘পারমু। এক ঘণ্টা পর হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দেন।’

এই কথোপকথনটি কোনো সাধারণ পণ্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে নয়। ভয়ংকর এক অপরাধ চক্রের সদস্যের সঙ্গে। যে চক্র জাল টাকা তৈরি ও বাজারজাত করে সর্বস্বান্ত করছে মানুষকে। কুরবানির ঈদ সামনে রেখে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই চক্র। ফেসবুক পেজ খুলে প্রকাশ্যেই চলছে জাল নোটের কেনাবেচা, দেওয়া হচ্ছে ‘এ গ্রেড’ জাল টাকার বিজ্ঞাপন। অনলাইনেই অর্ডার, অগ্রিম লেনদেন আর কুরিয়ারে সরবরাহের আশ্বাসে বিস্তার লাভ করছে এই অপরাধ চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে সদস্যরা গ্রেফতার হলেও আইনের ফাঁকফোকর ও বিচার দীর্ঘসূত্রতায় বারবার ফিরে আসছে তারা। ফলে ঈদকেন্দ্রিক বাজার ও পশুর হাটকে ঘিরে বাড়ছে সাধারণ মানুষের শঙ্কা।

জাল টাকা বিক্রির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ফেসবুক পেজ ‘জাল টাকা’য় দেওয়া ফোন নম্বরে (০১৯৮....৭৩) বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টায় উপর্যুক্ত কথা হয় এ প্রতিবদকের।

রাত প্রায় সাড়ে ১০টায় ফিরতি ফোন আসে জাল টাকা কারবারির কাছ থেকে। অপরপ্রান্ত জানতে চাওয়া হয়, কী পরিমাণ জাল টাকা লাগবে। তারপরই বলেন, তার কাছে ৫০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত সব ধরনের জাল নোট আছে। কোয়ালিটি এ গ্রেডের। এক লাখ জাল টাকার বান্ডিল ১২ হাজার টাকা। তবে অর্ধেক টাকা অগ্রিম দিতে হবে। টাকা পাওয়ার পর বান্ডিল কুরিয়ারে পৌঁছে দেওয়া হবে।
আরও পড়ুন

কথপোকথনের এক পর্যায়ে জানান, তার বাড়ি দিনাজপুরে। শুক্রবার তিনি ঢাকায় আসবেন। চাইলে গুলিস্তানে তার সঙ্গে দেখা করা যাবে। সঙ্গে স্যাম্পলও (জাল নোট) থাকবে। সেখানেই জাল নোটের মান যাচাই করে দেখে নেওয়া যাবে।

এভাবেই অনলাইনে জাল টাকা বিক্রি পেজ খুলে প্রকাশ্যেই জাল নোটের কেনাবেচা করছে জাল নোটের কারবারিরা। ‘জাল টাকা বানাই’, ‘জাল টাকা বিক্রি করি’, ‘এ গ্রেট জাল নোট পাইকারি’, ‘টাকার শহর’, ‘জাল টাকা’, ‘জাল টাকার বাজার’, ‘জাল টাকা বিক্রির ডিলার’ এরকম বিভিন্ন নামে অনলাইনে জাল টাকা কেনাবেচা হচ্ছে। তবে এসব পেজ বিশ্লেষণে এবং এখানে অনেকের মন্তব্য (কমেন্টস) বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই কারবারেও অনেক প্রতারণা হয়। এসব পেজে পোস্ট দেওয়া হয় আকর্ষণীয় ইমেজ ও ভিডিও।

‘জাল টাকা আনপেকিং দেখুন। একদম রিয়েল রিবি’ও (রিভিউ) এবং এই কুরবানির ঈদে আমরা নতুনদের সুযোগ দিচ্চি (দিচ্ছি) এবং অফার  তো থাকছেই। আসন্ন ঈদের জন্য আমাদের অফার এ মাল দেওয়া হচ্ছে, যারা অর্ডার করবেন তারাই পাবেন, অফার পেতে ১ লাখের ওপরে অর্ডার থাকতে হবে।’

এটা অনলাইনে জাল নোট বিক্রির পেজ ‘জাল টাকা বিক্রি প্রতিরোধ’র একটি ভিডিও পোস্ট। যেখানে ৫০০ টাকার দুটি জাল নোটের বান্ডিল আনপ্যাকিং দেখানো হচ্ছে। আরেকটি ভিডিওতে কাগজের কার্টনে সারি সারি জাল নোট প্যাকিং করার ভিডিও দেখানো হয়। ‘মাল বানানোর কিছু প্রক্রিয়া দেখানো হলো। ৫০ বান্ডিল এ গ্রেড।’- এ রকম ক্যাপশন দিয়ে জাল নোট কীভাবে প্রিন্টারের মাধ্যমে ছাপা হয়ে বের হচ্ছে দেখানো হচ্ছে তাও।

প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদকে সামনে রেখে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে জাল নোট তৈরি ও বিক্রি চক্রগুলো। সেসব জাল নোট এখন বাজারেও ছাড়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে কিছু কিছু ধরাও পড়ছে। তবে সেই সংখ্যা খুবই সামান্য।

গত ১৩ মে পৃথক অভিযানে র‌্যাব ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) রাজধানী কমলাপুর, উত্তরা ও গাজীপুর থেকে ৩৪ লক্ষাধিক টাকা মূল্যমানের জাল টাকা ও জাল টাকা তৈরির সরঞ্জামসহ চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করে।

জাল টাকার কারবারিরা এখন অনলাইন ও অফলাইন সর্বত্র সক্রিয়। মূলত ঈদ, পূজা বিশেষ করে ঈদুল আজহায় কুরবানির পশুর হাটকে সামনে রেখে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রগুলো। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

খুচরা বিক্রতাদের আস্থা অর্জনের জন্য ফেসবুক পেজে রীতিমতো ইমেজ, ভিডিও দিয়ে চালানো হচ্ছে প্রচার। কোনো কোনো পেজে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হচ্ছে ফোন নম্বর।

গোয়েন্দা বিভাগসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, জাল নোট তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্তরা এখন ‘ব্যস্ত’ সময় পার করছেন। গোয়েন্দাদের বক্তব্য থেকেও পাওয়া যায় তাদের ‘ব্যস্ততার’ চিত্র।

গত ১৩ মে গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, এ চক্রটি ঈদকে সামনে রেখে জাল টাকা বাজারে ছড়িয়ে দিতে তিনটি মেশিনের মাধ্যমে অনবরত টাকা ছাপছিল। চক্রটি জাল টাকা ছাপতে প্রেসের এক কর্মীকেও নিয়োগ দিয়েছিল। পশুর হাট ও বিপণিবিতানে জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তাদের।

অনলাইনে জাল নোট চক্রের তৎপরতার প্রসঙ্গে ডিবিপ্রধান সময়ের আলোকে বলেন, ঈদ সামনে রেখে সবসময়ই জাল টাকার কারবারিদের তৎপরতা বেড়ে যায়। সব ধরনের মাধ্যমেই তাদের তৎপরতা নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।

জাল নোট তৈরির চক্রগুলো ঈদের কয়েক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকে। ঈদের মাসখানেক আগে থেকে জাল নোট বাজারে ছাড়তে শুরু করে তারা।

গত এপ্রিলে ১৫ দিনে প্রায় এক কোটি জাল টাকাসহ ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর গুলশানে অর্ধ কোটি জাল টাকাসহ গ্রেফতার করা হয় কালীগঞ্জ উপজেলা যুবলীগ নেতা রেজাউল শেখসহ তিন জনকে। এর তিন দিন পর রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা থেকে ৪০ লাখ জাল টাকাসহ এক যুবককে আটক করে পুলিশ। এর আগে গত ৩০ মার্চ ১৩ লাখ জাল টাকাসহ দুজনকে গ্রেফতার করে সিরাজগঞ্জ র‌্যাব-১২-এর একটি দল।

জাল নোটের কারবারিরা গ্রেফতারের পর আইনের ফাঁক গলে সহজেই জামিন পেয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসামিপক্ষের কৌশলে সময় ক্ষেপণ, সাক্ষীর অভাবসহ বিভিন্ন কারণে তাদের জামিন পাওয়া সহজ হয়ে যায়।

সিনিয়র আইনজীবী মঞ্জুর আলম এ প্রসঙ্গে সময়ের আলোকে বলেন, আইনের প্রয়োগ ও বিচার যদি দ্রুত করা যায় তা হলে জাল টাকা সংক্রান্ত মামলায় অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে বিচারের সময়সীমা মানা হয় না। সাক্ষীও পাওয়া যায় না।

নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে জাল নোটের এমন মামলাও আছে যা ৩০ বছর ধরে ঝুলছে।’ তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আসামি পক্ষ কৌশল অবলম্বন করে। দেখা যায়, উচ্চ আদালত একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয় মামলা নিষ্পত্তির জন্য। আসামিপক্ষ কৌশলে ওই সময়সীমা অতিক্রম করে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সাক্ষী না আসায় সহজে জামিন হয়ে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুলিশ মূল আসামি না ধরতে পেরে তার স্ত্রী বা পরিবারের অন্য কাউকে গ্রেফতার করে। ওইসব ক্ষেত্রেও জামিন পাওয়া সহজ হয়ে যায়। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। বিভিন্ন কারণে বিচার প্রক্রিয়া প্রলম্বিত হওয়ায় ঝুলে যায় বিচারকাজ। এ কারণেও জামিন পাওয়া সহজ হয়।

এএডি/
Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: