আস্থা সংকটে ধুঁকছে বীমা খাত

জাহিদুল ইসলাম

জাতীয়

দেশের বীমা খাতে চরম আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও টাকা না পাওয়া, মৃত্যু দাবির নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা,

2026-05-18T01:39:58+00:00
2026-05-18T01:39:58+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
আস্থা সংকটে ধুঁকছে বীমা খাত
জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ১:৩৯ এএম 
প্রতীকী ছবি
দেশের বীমা খাতে চরম আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও টাকা না পাওয়া, মৃত্যু দাবির নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, বোনাস না দেওয়া, আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন ও করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি- এসব অভিযোগ এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। 

দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় হিসেবে কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার আশায় কষ্টার্জিত অর্থ জমা দেওয়ার পরও সে টাকা পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরে নাজেহাল হতে হচ্ছে গ্রাহককে।

খাত সংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলোÑ অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়। 

নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে নানা খাতে ব্যয় দেখিয়ে অনেক কোম্পানি নিজেদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে ফেলছে। 

আর এই ব্যয় বৃদ্ধির সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা ভারপ্রাপ্ত সিইও রাখার কৌশল।

অনেকের মতে, এসব ভারপ্রাপ্ত সিইও অনেক সময় পরিচালনা পর্ষদের ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে কাজ করেন। চাকরি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তারা বোর্ডের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেন না, ফলে অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থানও নেওয়া হয় না। 

দেশের জীবন বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত প্রবণতা নিয়ে আলোচনা চলছে- অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়। 

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে নানা খাতে ব্যয় দেখানো, উচ্চ বেতন-ভাতা, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক খরচ এবং পরিচালন ব্যয়ের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে। 

এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে সরাসরি গ্রাহকের ওপর। মেয়াদোত্তীর্ণ পলিসির টাকা ফেরত কিংবা মৃত্যু দাবির অর্থ কিংবা অন্যান্য বীমা সুবিধা পেতে বছরের পর বছর ঘুরতে হচ্ছে পলিসিধারীদের।

খাত-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের সংস্কৃতির অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বছরের পর বছর ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দিয়ে কোম্পানি পরিচালনা। আইডিআরের বিধিমালা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ সিইও নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, যোগ্যতা যাচাই ও নির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর বিষয় থাকে। 

কিন্তু ভারপ্রাপ্ত সিইও নিয়োগের ক্ষেত্রে সেই স্বচ্ছতা অনেকাংশে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে পরিচালনা পর্ষদ নিজেদের অনুগত কর্মকর্তাকে দীর্ঘ সময় দায়িত্বে রেখে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

এ বিষয়ে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জালালুল আজিম সময়ের আলোকে বলেন, যেসব কোম্পানিতে নিয়মিত এমডি নেই, অর্থাৎ ভারপ্রাপ্ত এমডি দিয়ে চলছে; তাদের বিষয় হচ্ছে ওই সব কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত যিনি তার এমডি হওয়ার যোগ্যতা নেই। 

ফলে যার যোগ্যতা নেই, তাকে দিয়ে তো ভালো কিছু আশা করা যায় না। তাদের সেভাবে দায়-দায়িত্বও নেই। কখন হুটহাট চাকরি থেকে চলে যায়, ঠিক নেই। ফলে তারা যেমন ইচ্ছে তেমন খরচ করে। এসব কারণেই আমাদের বীমা খাতে যা-তা অবস্থা হয়ে গেছে।

কোম্পানিগুলো কোন খাতে কীভাবে এই অতিরিক্ত ব্যয় করছে- এমনটা জানতে চাইলে তিনি বলেন, জীবন বীমা ব্যবসায় আমরা যে ফিল্ড ফোর্সের মাধ্যমে ব্যবসা সংগ্রহ করি, সেখানে ইড্রা (নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ) দিয়েছে ৬টি লেয়ার (স্তর)। 

কিন্তু অনেক কোম্পানিই এই ছয় লেয়ার মানছে না। তারা আরও বেশি লেয়ার তৈরি করে, ফলে খরচ বাড়ে। তা ছাড়া কোন লেয়ারে কত খরচ করবে সেটিও ইড্রা ঠিক করে দিয়েছে। কিন্তু কোম্পানিগুলো তার চেয়েও বেশি খরচ করে।

এর বাইরে কিছু কিছু কোম্পানিতে সত্যিই লুটপাট হচ্ছে। সেগুলো সামাল দিতে গিয়েও ম্যানেজমেন্ট এক্সপেন্স বেড়ে যায়। যদি আইডিআরএ এটি ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তা হলে অনেক কোম্পানি আছে যারা গ্রাহকদের মোটেও টাকা দিতে পারবে না। 

ইড্রার আগের চেয়ারম্যান ১৫টি কোম্পানিকে ‘মৃত’ বলেছিল। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যাটা আরও বেশি। এই মুহূর্তে ব্যাংক মার্জারের মতো আমাদের দুর্বল বীমা কোম্পানিগুলোকেও মার্জারের আওতায় আনা দরকার।

জীবন বীমা খাতের ২০২৫ সালের অনিরীক্ষিত আর্থিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির মধ্যে অন্তত ২০টি কোম্পানি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। 

এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে প্রায় ৩৮১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ গ্রাহকের প্রিমিয়াম থেকে সংগৃহীত বিপুল অর্থ পরিচালন ব্যয়েই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

অতিরিক্ত ব্যয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটি একাই অতিরিক্ত ব্যয় করেছে প্রায় ২৪৬ কোটি ৭ লাখ টাকা। 

এরপর রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ও এনআরবি ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। এই পাঁচটি কোম্পানি মিলেই অতিরিক্ত ব্যয় করেছে প্রায় ৩০৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

অতিরিক্ত ব্যয়ের তালিকায় থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, জেনিথ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বেস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স, চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স, হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, লাইফ ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন অব বাংলাদেশ, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

বীমা খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের এই প্রবণতা নতুন নয়। গত এক দশকে জীবন বীমা খাতে অনিয়ম, আর্থিক দুর্বলতা এবং করপোরেট সুশাসন সংকট নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। 

বিভিন্ন সময়ে আইডিআরএ কিছু কোম্পানিকে সতর্ক করলেও বাস্তব পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। বরং অনেক কোম্পানিতে প্রশাসনিক ব্যয় ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও গ্রাহকসেবার মান উন্নত হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, অনেক কোম্পানি ব্যবসা সম্প্রসারণের নামে বিপুল পরিমাণ ব্যয় দেখায়। নতুন শাখা খোলা, এজেন্ট নিয়োগ, প্রচার কার্যক্রম, বিশেষ সভা, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা প্রশিক্ষণের নামে অর্থ ব্যয় করা হলেও বাস্তবে তার সুফল কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয় না। বরং বছরের শেষে দেখা যায়, দাবি নিষ্পত্তির জন্য পর্যাপ্ত তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে।

আইডিআরএর বিধিমালা অনুযায়ী জীবন বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। কারণ গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়ামের বড় অংশ ভবিষ্যৎ দায় পরিশোধের জন্য লাইফ ফান্ড হিসেবে সংরক্ষিত থাকার কথা। 

কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অনেক কোম্পানি সেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। এতে শুধু কোম্পানির আর্থিক ভিত্তিই দুর্বল হচ্ছে না, দীর্ঘমেয়াদে পুরো বীমা খাতও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর আয় মূলত গ্রাহকের প্রিমিয়াম থেকে আসে। এই অর্থের একটি অংশ ভবিষ্যৎ দাবি নিষ্পত্তি, রিজার্ভ গঠন এবং পলিসিধারীদের নিরাপত্তার জন্য সংরক্ষিত থাকার কথা। 

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক কোম্পানি সেই অর্থের বড় অংশ ব্যয় করছে প্রশাসনিক সুবিধা, গাড়ি, অফিস ভাড়া, বিদেশ সফর, পরামর্শক ব্যয়, বিশেষ ভাতা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আনুষাঙ্গিক সুবিধায়।

অন্যদিকে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে যে ২০টি কোম্পানি অতিরিক্ত ব্যয় করেছে তাদের মধ্যে ১৪টি কোম্পানিতে নিয়মিত সিইও নেই। এগুলো হলো- সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স, আলফা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বেঙ্গল ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বেস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স, চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স, হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এনআরবি ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

যদিও এসব কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ তাদের সিইওর দায়িত্ব প্রদান করেছে, কিন্তু বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর অনুমোদন না পাওয়ায় এবং অনেক ক্ষেত্রে পূর্বের নিয়োগ পুনঃনবায়ন না করায় তাদের ভারপ্রাপ্ত সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

আলফা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সিইও হিসেবে নুরে আলম ছিদ্দিকী অভির নিয়োগ অনুমোদন করেছে আইডিআরএ। ২০২৩ সালের ১ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন বছরের জন্য এই নিয়োগ অনুমোদিত হয়েছে। 

আইডিআরএ বেঙ্গল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স সিইও পদে এম এম মনিরুল আলমের নিয়োগে অনুমোদন দেয়। ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিন বছরের জন্য এই নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

একাধিক কোম্পানির সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা বলছেন, ‘ভারপ্রাপ্ত সিইও’ সংস্কৃতি এখন অনেক প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। কয়েক মাসের জন্য দেওয়া অস্থায়ী দায়িত্ব বছরের পর বছর ধরে বহাল রাখা হচ্ছে। এতে পরিচালনা পর্ষদের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য বাড়ে, কিন্তু কমে যায় জবাবদিহি।

বাংলাদেশ বীমা একাডেমি (বিআইএ) ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্টের (বিআইপিডি) কাজী মর্তুজা আলী সময়ের আলোকে বলেন, বীমা কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত সিইওদের কোনো দায় আছে কি না সেটি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই যাচাই করে দেখা দরকার। 

একদিকে উপযুক্ত লোক দিতে পারছে না, অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে চালানো হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি গ্রাহকের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয় তা হলে এই বিষয়টিকে প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।

একটি জীবন বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক সময় পূর্ণাঙ্গ সিইও হলে তিনি নীতিমালা মেনে চলতে বাধ্য হন। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত সিইও পদে থাকা ব্যক্তির চাকরি পুরোপুরি পরিচালনা পর্ষদের ওপর নির্ভর করে। 

ফলে তিনি বোর্ডের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেন না। এমনকি অনিয়ম দেখলেও অনেক সময় চুপ থাকতে বাধ্য হন।

এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সাধারণ পলিসিধারীদের ওপর। কারণ কোম্পানির আয় থেকে বড় অংশ পরিচালন ব্যয়ে চলে গেলে দাবি নিষ্পত্তির জন্য পর্যাপ্ত অর্থ হাতে থাকে না। 

ফলে মৃত্যু দাবি, মেয়াদ পূর্তির টাকা কিংবা বোনাসের অর্থ পেতে গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আইডিআরএ কিংবা আদালতের দ্বারস্থ হতেও হচ্ছে।

রাজধানীর মিরপুর সাংবাদিক কলোনির বাসিন্দা রোকেয়া রহমান বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও আমি এখন পর্যন্ত বীমার টাকা পাইনি। বারবার কোম্পানির অফিসে গিয়ে শুধু সময়ক্ষেপণই হচ্ছে।

তার ভাষায়, পলিসি করার সময় অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এখন টাকা চাইতে গেলে বলে ফাইল প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

আইডিআরএর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সমস্যার মূল জায়গা দুর্বল করপোরেট সুশাসন। অনেক কোম্পানিতে পরিচালনা পর্ষদই সব সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে। স্বাধীন পরিচালক ও অডিট কমিটির ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। 

ফলে ভারপ্রাপ্ত সিইওদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়ে যায়। বেশ কয়েকটি কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা অতিক্রম, অনুমোদন ছাড়া নিয়োগ এবং করপোরেট সুশাসন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্তও চলছে। 

তবে তিনি স্বীকার করেন, প্রভাবশালী মহলের কারণে অনেক সময় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বীমা খাত মূলত আস্থার ব্যবসা। গ্রাহক প্রিমিয়াম দেন ভবিষ্যতের নিরাপত্তার আশায়। কিন্তু যদি সেই অর্থের বড় অংশ পরিচালন ব্যয়ে চলে যায় এবং দাবি নিষ্পত্তিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তা হলে পুরো খাতের ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়। 

বাংলাদেশে এখনও জিডিপির তুলনায় বীমা খাতের অবদান অনেক কম। এর বড় কারণগুলোর একটি হলো মানুষের আস্থাহীনতা।

বীমা খাত বিশ্লেষক ড. কাজী মর্তুজা আলী বলেন, অনেক সময় বলা হয় আইডিআরএ জনবল নেই। কিন্তু কোম্পানিগুলো মাঝেমধ্যে স্পেশাল অডিট করা যায়, টিম তৈরি করে দিয়ে ইন্সপেকশন করা যায়। 

কিন্তু সেই মানের লোকের ঘাটতি আছে মনে হচ্ছে। ইড্রাকে জনবল এবং মনোবল উভয়ই বাড়াতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো দায়িত্বশীলদের সচেতনতা। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যদি সচেতন না হয়, তা হলে আইন করে কোনো কিছু বন্ধ করা যায় না।

তাদের মতে, বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর হতে পারে। কারণ একটি সময়ের পর গ্রাহকরা জীবন বীমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে পুরো খাতেই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তখন শুধু কয়েকটি কোম্পানি নয়, সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাই চাপে পড়তে পারে। 

এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত সিইও রাখার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সিইও নিয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। 

দ্বিতীয়ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের খাতগুলো ডিজিটাল পর্যবেক্ষণের আওতায় এনে তা নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। তৃতীয়ত দাবি নিষ্পত্তিতে ব্যর্থ কোম্পানির বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত অডিট কমিটি ও স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।

/এসএকে


  বিষয়:   আস্থা  সংকট  বীমা  খাত 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: