আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) রাস্তাজুড়ে কুরবানির পশুর হাট বাসানোয় তীব্র যানজটের আশঙ্কা বাড়ছে। ইতিমধ্যে সংস্থা দুটি রাজধানীতে ২৭টি অস্থায়ী কুরবানির পশুর হাট বসানোর বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে। আগামী শুক্রবার রাজধানীতে কুরবানির পশুর হাট জমে উঠবে। এই হাট ঈদের আগের দিন গভীর রাত পর্যন্ত চলবে। সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী ঈদের দিনসহ মোট পাঁচ দিন হাট বসার কথা রয়েছে।
এদিকে ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার পশুবাহী ট্রাক ঢাকায় প্রবেশ করে। কিন্তু নির্ধারিত পার্কিং না থাকায় এসব ট্রাক অনেক সময় মূল সড়কেই দাঁড়িয়ে থাকে। এতে দ্রুত যানজট ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কের পাশে পশুর হাট নিয়ন্ত্রণে বাঁশ, টিন ও অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেছে। এতে অনেক সড়কের চলাচলযোগ্য অংশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। কিন্তু অধিকাংশ হাটই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মহাসড়কের পাশে কিংবা ব্যস্ত নগর এলাকায় স্থাপন করা হচ্ছে। ফলে ঈদের আগে ও পরে রাজধানীতে ভয়াবহ যানজট, জনভোগান্তি ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রবেশপথ, ফ্লাইওভার সংযোগ সড়ক, বাস টার্মিনাল এলাকা এবং বাজারকেন্দ্রিক সড়কগুলোতে হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, এবার ডিএনসিসি ১৬টি ও ডিএসসিসির এলাকায় ১১টি অস্থায়ী পশুর হাট বসবে। মোট ২৭টি কুরবানির পশুর হাট। তবে বিগত বছরগুলোতে এ হাটের সংখ্যা ছিল ১৬ থেকে ২২টি পর্যন্ত। মূলত যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পশুর হাট কম বসানো হতো। কিন্তু নানা নির্দেশনা দিয়েও হাটগুলো নির্দিষ্ট সীমানায় রাখতে পারছে না সংস্থা দুটি। কোথাও কোথাও সংস্থা দুটির সীমানার বাইরেও বসে যায় অস্থায়ী পশুর হাট। হাটগুলোর বেশিরভাগই প্রধান রাস্তার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় ঈদের ৭-৮ দিন আগে থেকেই যানজট বাড়ে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘিরেই অধিকাংশ পশুর হাট। এর মধ্যে রাজধানীর গাবতলী, আফতাবনগর, মেরাদিয়া, পূর্বাচল সংলগ্ন এলাকা, কামরাঙ্গীরচর, ধোলাইখাল, সারুলিয়া, শনিরআখড়া, বংশাল, উত্তরখান, তেজগাঁও ও মিরপুর এলাকার কয়েকটি হাট সরাসরি ব্যস্ত সড়কের পাশে বসছে। বিশেষ করে গাবতলী পশুর হাট রাজধানীর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাট। প্রতি বছর এই হাটকে কেন্দ্র করে আমিনবাজার, টেকনিক্যাল মোড়, শ্যামলী, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, মিরপুর রোড এলাকায় কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে আব্দুল্লাহপুর-উত্তরা করিডোর, আফতাবনগর ও মেরাদিয়া এলাকায় হাট বসার কারণে বাড্ডা-রামপুরা সড়ক, প্রগতি সরণি ও হাতিরঝিল সংযোগ সড়কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। পোস্তগোলা সেতু সংযোগ সড়ক, যাত্রাবাড়ী-মাওয়া সড়ক, শনিরআখড়া ও সারুলিয়া এলাকায় হাট বসলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যানজটের বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, পশুবাহী ট্রাকের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ, রাস্তার ওপর পশু নামানো এবং ক্রেতাদের ব্যক্তিগত গাড়ির অবৈধ পার্কিং।
দুই সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ডিএসসিসির ১১টি অস্থায়ী হাটের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর পাড়ের খালি জায়গায়, উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গায়, রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গায়, শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ডের খালি জায়গায়। এ ছাড়া আফতাবনগর (ইস্টার্ন হাউজিং) ব্লক-ই, এফ, জি, এইচ, সেকশন-১ ও ২-এর খালি জায়গায়, কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পানির পাম্প সংলগ্ন রাস্তার অব্যবহৃত জায়গায়, দয়াগঞ্জ রেলক্রসিং থেকে জুরাইন রেলক্রসিং পর্যন্ত রাস্তার খালি জায়গায়, মোস্তমাঝি মোড় সংলগ্ন খালি জায়গায়, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ-পূর্ব পাশের খালি জায়গা এবং গোলাপবাগ আউটার স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর পাশের খালি জায়গায়ও কুরবানির পশুর হাট বসবে। ডিএনসিসির ১৬টি হাটের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো গাবতলী স্থায়ী পশুর হাট।
আর অস্থায়ী হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে মিরপুর সেকশন-৬ এলাকায়, মিরপুর কালশী বালুর মাঠের ১৬ বিঘা খালি জায়গায়, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন এলাকায়, মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার সংলগ্ন খালি জায়গায় এবং পূর্ব হাজীপাড়ায় ইকরা মাদরাসার পাশের খালি জায়গায়। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের বসিলায় ৪০ ফুট রাস্তা সংলগ্ন খালি জায়গায়, উত্তরা দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন বউবাজার এলাকায়, ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদরাসা থেকে ১০ নম্বর সেক্টর রানাভোলা অ্যাভিনিউ সংলগ্ন উত্তরা রানাভোলা সুইসগেইট পর্যন্ত এলাকায়, কাঁচকুড়া বাজার সংলগ্ন রহমান নগর আবাসিক এলাকায়, মস্তুল চেকপোস্ট সংলগ্ন পশ্চিম পাড়ায়, ভাটারা সুতিভোলা খাল সংলগ্ন খালি জায়গায়, মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠের জায়গায় পশুর হাট বসবে।
অবশ্য কুরবানির পশুর হাট হাইওয়ে সড়কের ওপরে বা পাশে বসবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, ঈদযাত্রা উপলক্ষে ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলায় মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ঢাকায় ৬৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে, যাতে অযাচিত যানজট এড়ানো যায়। কুরবানির ঈদ উপলক্ষে অসংখ্য গরুর ট্রাকও সড়কে যাতায়াত করে। এ জন্য রাজধানীর ধোলাইপাড় বাসস্ট্যান্ড, আব্দুল্লাহপুর ও গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বনশ্রীর স্থানীয় বাসিন্দা হান্না চৌধুরী বলেন, হাট ইজারাদাররা অনেক সময় নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে ফুটপাথ ও সড়কের অংশ ব্যবহার করেন। ইতিমধ্যে মেরাদিয়া কুরবানির পশুর হাটের ইজারার বাইরে গিয়ে টিন ও বাঁশ দিয়ে ঘিরে রেখেছে। ফলে ঈদের আগে তীব্র যানজট বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীদের বলেছি নির্দিষ্ট সীমানা বা কোন সীমানা পর্যন্ত তারা ব্যবহার করবে, সেটি আমরা টেনে দিয়েছি। কাজেই এর বাইরে যদি বসে, তা হলে সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, পশুর হাটের কারণে যেন কোনো জনদুর্ভোগ, কোনো যানজটের যাতে সৃষ্টি না হয়। পশুর হাটে যে বর্জ্যগুলো থাকে সেটা তার নিজ দায়িত্বে তারা পরিষ্কার করতে বাধ্য থাকবে, এমন শর্ত দিয়েই ইজারা দেওয়া হয়। এর বাইরে কেউ গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরবিএন