২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ দুয়ারে কড়া নাড়ছে। অথচ বিশ্বজুড়ে ফুটবলের সেই চিরচেনা উন্মাদনা এবার যেন অনেকটাই ফিকে। সাধারণত বিশ্বকাপ সামনে এলে দেশে দেশে সমর্থকদের উত্তেজনা, কোটি কোটি ডলারের বৈশ্বিক বাণিজ্য, জনপ্রিয় দলগুলোর শক্তি-দুর্বলতা নিয়ে বিশ্লেষণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে তর্ক-বিতর্কে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো বিশ্ব। কিন্তু এবার ঢাকা থেকে লন্ডন, বুয়েনস আয়ার্স থেকে বার্লিন-ফুটবল মানচিত্রের প্রায় সবখানেই এক ধরনের অস্বাভাবিক নীরবতা দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসর ঘিরে কেন এমন নির্লিপ্ততা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো ফিফার অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ। ফুটবলের বিশ্বায়নের নামে আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন (ফিফা) এবারের আসরে কঠোর বাণিজ্যিক নীতি গ্রহণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী টিকিটের দাম বাড়বে বা কমবে। এর ফলে গ্রুপ পর্বের সাধারণ টিকিটের দামও আগের যেকোনো বিশ্বকাপের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গেছে।
ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন বড় সমর্থকগোষ্ঠী ইতোমধ্যে এবারের বিশ্বকাপকে ‘সাধারণ সমর্থকদের পকেট কাটার উৎসব’ বলে সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, মাঠে খেলা দেখতে যাওয়া এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিশ্বকাপ থেকে অনেক সমর্থককে মানসিকভাবেও দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
এবার মাঠে গিয়ে খেলা দেখার খরচও আগের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে তিনটি দেশ-যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো জুড়ে। আয়োজক শহরগুলো এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে থাকায় যাতায়াত ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এক শহর থেকে আরেক শহরে যেতে বিমান বা ট্রেন ভাড়ায় গুনতে হবে বড় অঙ্কের অর্থ। পাশাপাশি হোটেল, মোটেল ও এয়ারবিএনবির আবাসন খরচও আকাশচুম্বী।
রাশিয়া ও কাতার বিশ্বকাপে সমর্থকদের জন্য তুলনামূলক সহজ ও কম খরচের যাতায়াত সুবিধা ছিল। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে যাতায়াত ও থাকার পেছনে যে বিপুল ব্যয় হবে, তা বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে অধিকাংশ সমর্থকের পক্ষেই বহন করা কঠিন।
বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহ কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসানীতি। আগের কয়েকটি বিশ্বকাপে ‘ফ্যান আইডি’ বা ম্যাচ টিকিট থাকলেই সহজে ভিসা পাওয়ার সুবিধা ছিল। এতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সমর্থকরা সহজেই মাঠে গিয়ে খেলা দেখতে পারতেন। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো তেমন কোনো সহজ বা বিশেষ ভিসা প্রক্রিয়া ঘোষণা করেনি।
উল্টো কঠোর স্ক্রিনিং, দীর্ঘ অপেক্ষমাণ তালিকা এবং বিভিন্ন দেশে মার্কিন ভিসা পাওয়ার জটিলতা সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এমনকি অনেক সচ্ছল ফুটবলপ্রেমীর কাছেও যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়া এখন অনেকটা লটারির মতো মনে হচ্ছে।
টাইম জোনের সমস্যাও এবারের বিশ্বকাপের উন্মাদনায় বড় প্রভাব ফেলছে। উত্তর আমেরিকায় ম্যাচ হওয়ায় ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার দর্শকদের অনেক ম্যাচ গভীর রাত, ভোর কিংবা কর্মব্যস্ত সকালের সময়ে দেখতে হবে।
যুক্তরাজ্যে করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৭ শতাংশ মানুষ গভীর রাতের ম্যাচ সরাসরি দেখতে অনাগ্রহী। প্রতিদিন রাত জেগে খেলা দেখার পরিবর্তে অনেকে পরদিন সকালে হাইলাইটস দেখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ফলে সরাসরি ম্যাচ দেখার উত্তেজনা আগের মতো তৈরি হচ্ছে না।
এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। আগে যেখানে ৩২টি দল অংশ নিত, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৪৮। একই সঙ্গে ম্যাচ সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ।
ফিফা একে ফুটবলের বিশ্বায়নের অংশ হিসেবে তুলে ধরলেও অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ও দর্শক মনে করছেন, এটি মূলত বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত। ম্যাচ সংখ্যা বাড়ায় সম্প্রচার ও বিজ্ঞাপন আয়ও বাড়বে। তবে এত বেশি ম্যাচের কারণে টুর্নামেন্টের গুণগত মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া এক মাসের বদলে প্রায় দেড় মাস ধরে চলা এই দীর্ঘ টুর্নামেন্ট দর্শকদের মধ্যে একঘেয়েমিও তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের আবেগও এখনো মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। অনেকের মতে, সেটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও নাটকীয় বিশ্বকাপ। বিশেষ করে লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি ওঠার মধ্য দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের একটি বড় রোমান্টিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
ক্রীড়া মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা হয় ‘পোস্ট-সাকসেস স্যাচুরেশন’ অর্থাৎ বড় অর্জনের পর একধরনের মানসিক তৃপ্তি, যা নতুন করে একই মাত্রার উত্তেজনা তৈরি হতে বাধা দেয়। গত দেড় দশক ধরে বিশ্ব ফুটবল মূলত লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। যদিও তারা ২০২৬ বিশ্বকাপে থাকতে পারেন, তবে ক্যারিয়ারের শেষ দিকে চলে আসায় আগের মতো সেই অতিমানবীয় গতি ও ফর্ম আর নেই। বর্তমান প্রজন্মে কিলিয়ান এমবাপ্পে বা ভিনিসিয়াস জুনিয়রদের মতো তারকা উঠে এলেও তারা এখনো মেসি-রোনালদোর মতো বৈশ্বিক আবেগ তৈরি করতে পারেননি।
বিশ্বকাপকে ঘিরে করপোরেট প্রচারণাও এবার তুলনামূলক কম চোখে পড়ছে। সাধারণত বিশ্বকাপ সামনে এলে বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলোর বড় বড় বিজ্ঞাপন, ট্রফি ট্যুর, অফিসিয়াল থিম সং এবং বিপণন প্রচারণা বিশ্বজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি করে। কিন্তু এবার সেই প্রচারণায় অনেকটাই শিথিলতা দেখা যাচ্ছে। অফিসিয়াল থিম সং বা মাসকট নিয়েও তেমন আলোচনা তৈরি হয়নি।
ফলে দৈনন্দিন ব্যস্ততার বাইরে গিয়ে বিশ্বকাপ নিয়ে আলাদা আবেগ তৈরি করার মতো পরিবেশও তৈরি হয়নি। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং কর্মজীবনের চাপ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব ফেলেছে। ফলে অনেক ফুটবলপ্রেমী এখন মধ্যরাতের ম্যাচ দেখার চেয়ে দৈনন্দিন জীবন ও কাজকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তবে অনেকের আশা, উত্তর আমেরিকার মাঠে যখন প্রথম বাঁশি বাজবে এবং সবুজ ঘাসে বল গড়াবে, তখন হয়তো আবারও ফুটবল বিশ্বে উন্মাদনার জোয়ার ফিরবে। কিন্তু মাঠের বাইরের এই কঠিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা যে ২০২৬ বিশ্বকাপের আবহে বড় ধাক্কা দিয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আরবিএন