ডি-বক্সের বাইরে ফ্রি-কিক। সামনে প্রতিপক্ষের দেয়াল। কয়েক পা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে বাঁ পায়ের জাদুতে বলকে এমন এক বাঁক দিতেন, গোলরক্ষকের হাত ছুঁয়ে যাওয়ার আগেই যেন গোলের ঠিকানা লেখা হয়ে যেত। কখনো বক্সের ভেতরে পেনাল্টি, কখনো তিন-চারজন প্রতিপক্ষকে একসঙ্গে কাটিয়ে গোল আবার কখনো এমন এক পাস— যা মাঠে থাকা সবাই বুঝে ওঠার আগেই সতীর্থের পায়ে পৌঁছে যেত। ফুটবলকে সহজ করে দেখানোর এই অসম্ভব ক্ষমতাটাই ছিল লিওনেল আন্দ্রেস মেসির সবচেয়ে বড় পরিচয়।
আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে সেই জাদুকরের পথচলা শেষ হয়েছে। বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি হয়ে থাকল জাতীয় দলে মেসির শেষ অধ্যায়। ৮৬ হাজার দর্শকের সামনে ৩৯ বছর বয়সেও তিনি দেখিয়েছেন, বয়স তার শরীরকে হয়তো কিছুটা ধীর করেছে, কিন্তু পায়ের শিল্পকে নয়। গোল করেছেন, সতীর্থকে দিয়ে গোল করিয়েছেন দুটি। দারুণ পারফরম্যান্সে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জিতেছেন। শেষবারের মতো গ্যালারির দিকে হাত নেড়ে যখন মাঠ ছাড়লেন, তখন হয়তো অনেকেরই মনে হয়েছে— এটা কেবল একজন ফুটবলারের শেষ ম্যাচ নয়, তাদের নিজেদের জীবনেরও একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি।
মেসির আন্তর্জাতিক গল্পের শেষটা যতটা আবেগের, শুরুটা ততটাই নাটকীয়। ২০০৫ সালে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেন ১৮ বছর বয়সি মেসি। ছয় গোল করে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেন। একই সঙ্গে জেতেন গোল্ডেন বল ও গোল্ডেন বুট। বার্সেলোনার যুব একাডেমি থেকে উঠে আসা সেই ছোট্ট ছেলেটি তখনই জানান দিয়েছিলেন, তার গল্প অন্যদের মতো হবে না।
তবে সিনিয়র জাতীয় দলে প্রথম পা রাখার মুহূর্তটি ছিল বিব্রতকর। ১৭ আগস্ট ২০০৫ হাঙ্গেরির বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন মেসি। বয়স তখন মাত্র ১৮। কিন্তু অভিষেক স্থায়ী হয় মাত্র ৪৭ সেকেন্ড। হাঙ্গেরির ডিফেন্ডার ভিলমোশ ভানচাককে হাত দিয়ে সরানোর ঘটনায় রেফারি তাকে লাল কার্ড দেখান। মাঠে নামার পর এত দ্রুত মাঠ ছাড়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার ক্যারিয়ারে আর কখনো ঘটেনি। সেই লাল কার্ডই হয়ে আছে তার একমাত্র লাল কার্ড।
অভিষেকের সেই অস্বস্তি অবশ্য খুব দ্রুতই ঢেকে যায় প্রতিভার আলোয়। ২০০৭ কোপা আমেরিকায় মেসি প্রথমবারের মতো বড় কোনো সিনিয়র আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নিজের সামর্থ্য দেখান। আর্জেন্টিনা পৌঁছে যায় ফাইনালে। কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন ব্রাজিল, তখন আবারও স্বপ্নভঙ্গ। ফাইনালে ৩-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। এক বছর পর অবশ্য আসে স্বর্ণের হাসি। ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে নাইজেরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্বর্ণপদক জেতে মেসির আর্জেন্টিনা। জাদুকরের ক্যারিয়ারে তখন যুব বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক স্বর্ণপদক, দুটি বড় অর্জন। কিন্তু জাতীয় দলের সিনিয়র পর্যায়ের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত শিরোপা তখনও দূরের বাতিঘর।
২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ব্যর্থতা; তখনও পাদপ্রদীপের আলোয় নেই মেসি। তবে ২০১৪ বিশ্বকাপ নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। ব্রাজিলের মাটিতে বসে সেই আসর। সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষ জার্মানি। ভেন্যু মারাকানা স্টেডিয়াম। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো গোল হলো না। অতিরিক্ত সময়েও যখন ম্যাচের ভাগ্য ঝুলে আছে, তখন ১১৩ মিনিটে জার্মানির বদলি খেলোয়াড় মারিও গোটশে গোল করলেন। আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে গেল। মেসির হাতে উঠল না বিশ্বকাপ। এরপর এলো আরও দুটি আঘাত। ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হার। পরের বছর ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালেও একই প্রতিপক্ষ, একই পরিণতি। টানা দুই ফাইনালে হারের পর মেসির হতাশা চরমে পৌঁছায়। টাইব্রেকারে নিজের পেনাল্টি মিস করার পর ২০১৬ সালে জাতীয় দল থেকে অভিমানে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।
সেই সময় আর্জেন্টিনায় মেসিকে ঘিরে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, ক্লাবের হয়ে এত কিছু করা মানুষটি দেশের হয়ে কেন পারছেন না? কেউ কেউ বলছিলেন, মেসি বার্সেলোনার, আর্জেন্টিনার নন। ইউরোপে ট্রফির পর ট্রফি জেতা মেসি তখন নিজের দেশের হয়ে একটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপার জন্য হাহাকার করছেন।
অবসর ভেঙে প্রায় দেড় মাস পরই আবার জাতীয় দলে ফেরেন মেসি। এরপর তার ক্যারিয়ারে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে ইকুয়েডরের বিপক্ষে জয় ছাড়া আর্জেন্টিনার সামনে কোনো পথ ছিল না। প্রতিপক্ষের মাঠ সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে কিটোর উচ্চতাও বাধা হতে পারেনি। সেই ম্যাচে মেসি করেন হ্যাটট্রিক। আর্জেন্টিনা জেতে ৩-১ গোলে। বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় তার পায়ের জাদুতেই। তবে রাশিয়া বিশ্বকাপেও শেষ হাসি হাসতে পারেনি আর্জেন্টিনা। শেষ ষোলোয় ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয় দল। মেসির বিশ্বকাপ অভিযান আবারও থেমে যায় শিরোপার অনেক আগেই। ততদিনে মেসির ক্যারিয়ারের সঙ্গে ‘অপূর্ণতা’ শব্দটি যেন জুড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝে সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো লেখে দীর্ঘ অপেক্ষার পর।
২০২১ কোপা আমেরিকা। আবার সেই ব্রাজিলের বিখ্যাত মারাকানা। আবার ফাইনাল। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। তবে এবার গল্পটা ভিন্ন। অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার একমাত্র গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। মেসি পান তার কাঙ্ক্ষিত প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। এত বছরের অপেক্ষা, ফাইনালে হারের যন্ত্রণা, সমালোচনা— সবকিছুর পর সেই রাত ছিল মুক্তির। এরপর ২০২২ সালে ফিনালিসিমায় ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আরেকটি ট্রফি জেতে আর্জেন্টিনা। কিন্তু মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তখনও বাকি।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। মেসির ক্যারিয়ার যেখানে পূর্ণতা পেয়েছিল। শুরুতেই সৌদি আরবের কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। চারদিকে আবারও প্রশ্ন। কিন্তু এরপর যেন অন্য এক মেসিকে দেখা গেল। একের পর এক ম্যাচ জিতে দল পৌঁছে যায় ফাইনালে। প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। ম্যাচটি যেন মেসির পুরো ক্যারিয়ারেরই প্রতিচ্ছবি।
ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে প্রথমে ২-০ গোলে এগিয়ে আর্জেন্টিনা। তারপর দুই গোল করে ম্যাচে ফেরে ফ্রান্স। অতিরিক্ত সময়ে আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। আবারও সমতায় ফেরে ফ্রান্স। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকার। এমিলিয়ানো মার্তিনেজের সেভ। আর মেসির হাতে বিশ্বকাপ। ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, লুসাইল স্টেডিয়াম। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় রাত। যে ট্রফির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা, যে ট্রফির অভাবে তাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেই ট্রফিই সেদিন তার হাতে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির গল্প যেন সেদিন পূর্ণতা পায়।
তারপরও তিনি থামেননি। ২০২৪ কোপা আমেরিকায় কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। মেসির ট্রফির তালিকায় যোগ হয় আরও একটি আন্তর্জাতিক শিরোপা। আর তিনি এগিয়ে যেতে থাকেন শেষ প্রান্তের দিকে।
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল শেষ বড় মঞ্চ। তিন দেশের আয়োজনে হওয়া বিশ্বকাপে বয়সের ভার থাকলেও মেসির পায়ের জাদু হারায়নি। গোল করেছেন, রেকর্ড গড়েছেন, দলকে আবারও ফাইনালে তুলেছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনটি ফাইনালে অধিনায়কত্ব করা প্রথম খেলোয়াড়ও হয়েছেন তিনি। তবে এবার শেষটা আগের মতো হয়নি। ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়।
কিন্তু মেসির সিদ্ধান্ত তখন প্রায় চূড়ান্ত। ফাইনালের পরই জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়াবেন। নিজের সিদ্ধান্ত লিখেও রেখেছিলেন। এর মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা হোর্হে মেসি। ৮ আগস্ট তার মৃত্যু হয়। পারিবারিক এই শোকের মধ্যে অবসরের ঘোষণা প্রকাশে দেরি হয়। অবশেষে ৩১ আগস্ট আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানান মেসি।
তবু আর্জেন্টিনা তাকে এত সহজে বিদায় দিতে চায়নি। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) অনুরোধে আরও একবার নীল-সাদা জার্সি গায়ে মাঠে নামেন তিনি। প্রতিপক্ষ বেনিন। স্থান মনুমেন্টাল। গ্যালারিতে ৮৬ হাজার মানুষ। শেষ ম্যাচেও মেসি যেন মেসিই। গোল করেছেন। সতীর্থকে দিয়ে গোল করিয়েছেন দুটি। দর্শকদের দিকে তাকিয়েছেন, হাত নেড়েছেন। শেষ বাঁশির পর যখন গ্যালারির দিকে তাকালেন, তখন বোঝা যাচ্ছিল— এই মুহূর্তটা শুধু তার নয়, পুরো আর্জেন্টিনার।
মেসির শেষ ম্যাচ শেষে রেফারি উপহার হিসেবে তার হাতে তুলে দেন ম্যাচের হলুদ ও লাল কার্ড। কিন্তু ম্যাচ শেষ হলেও মাঠ ছাড়েননি মনুমেন্টালের দর্শকরা। প্রিয় মেসিকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে তারা অপেক্ষা করছিলেন আরও কিছুক্ষণ। এরপর মনুমেন্টালের আকাশে শুরু হয় ড্রোনের প্রদর্শনী। একে একে ফুটে ওঠে আর্জেন্টিনার পতাকা, ‘মেসি, ১০’ এবং ২০২২ বিশ্বকাপ হাতে মেসির ছবি। যে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে বছরের পর বছর ছুটেছেন তিনি, বিদায়ের রাতেও সেই স্মৃতিই ফিরে আসে মনুমেন্টালের আকাশে। শেষ পর্যন্ত ভেসে ওঠে ‘গ্রাসিয়াস, লিও’— ধন্যবাদ, লিও।
মাঠেও তখন আবেগের ঢেউ। সতীর্থদের মাঝে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মেসি। ম্যাচ চলাকালীন কান্নাভেজা দায়িত্ব পালন কোচ লিওনেল স্কালোনির। ম্যাচ শেষে অশ্রুসিক্ত মেসিকে ঘিরে একে একে দাঁড়িয়ে পড়েন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা। কানায় কানায় পূর্ণ মনুমেন্টাল তখন করতালিতে জানায় তাদের প্রিয় অধিনায়ককে শেষ বিদায়।
একসময় যাকে বলা হয়েছিল বার্সেলোনার মেসি, আর্জেন্টিনার নয়, সেই মানুষটিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি লিখে গেলেন। যে মানুষটি ফাইনালে কেঁদেছেন, অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন, সমালোচনার মুখে পড়েছেন, সেই তিনিই আবার ফিরে এসে দেশকে কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন।
২০০৫-এর যুব বিশ্বকাপ থেকে ২০০৮-সালের অলিম্পিক। ২০১৪-এর বিশ্বকাপ ফাইনাল থেকে ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার হতাশা। ২০১৬-এর অবসর থেকে ফিরে আসা। ২০২১-এর কোপা আমেরিকা, ২০২২-এর বিশ্বকাপ, ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়। তারপর ২০২৬-এর শেষ ম্যাচ।
মেসির গল্প নিছক একজন ফুটবলারের নয়। এটি অপেক্ষার গল্প। ব্যর্থতার গল্প। ফিরে আসার গল্প। আর শেষ পর্যন্ত পূর্ণতার গল্প। নীল-সাদা জার্সিতে তার পায়ের জাদু হয়তো আর দেখা যাবে না। কিন্তু যে গল্পে এত কান্না, এত অপেক্ষা আর এত আনন্দ; সেই গল্পের শেষ লাইনটি হয়তো একটাই হতে পারে— ধন্যবাদ লিও।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে