জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বিশ্বের যে দেশগুলোকে সবথেকে বেশি বিপন্ন করেছে, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও খরার মতো প্রাকৃতিক ঝুঁকির চাপ এখানে প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তা সত্ত্বেও মানবসৃষ্ট পরিবেশ সংকট নিরসনের পথ থেকে আমরা বহু দূরে রয়েছি। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা এই সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান কেন্দ্র। এখানে জলবায়ু ঝুঁকি আর নগরায়ণের চাপ একে অন্যকে আরও তীব্র করে তুলছে। ফলে শহরটি শুধু ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বরং ঝুঁকির লাইভ পরীক্ষাগার (ল্যাবরেটরি) হয়ে উঠেছে।
একসময় নদী, খাল, পুকুর ও সবুজে ঢাকা ছিল এই শহর। এখন সেই জায়গা দখল করেছে কংক্রিট, অবকাঠামো আর যানজট। নগর পরিকল্পনার মৌলিক উপাদান তথা উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, খেলার মাঠ, জলাধার ও সবুজ এলাকা ধারাবাহিকভাবে কমে গেছে। এতে শহরের শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতাও সংকুচিত হয়েছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের বার্তা ও বাস্তবতা : আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের বার্তা নিয়ে আসে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘জলবায়ু পরিবর্তন : আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা’।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ উপলক্ষে পৃথক বাণী দেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ ও জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষি ব্যবস্থা জরুরি।
তিনি এটিকে বৈশ্বিক মানবজাতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বক্তব্য ও দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব সংকট আরও গভীর। কারণ পরিবেশ এখন আর একটি ইভেন্ট বা দিবসের বিষয় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন।
ক্রমেই তাপমাত্রা বাড়ছে ঢাকায় : ঢাকার জলবায়ু ঝুঁকির সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক হলো তাপমাত্রা বৃদ্ধি। ২০২৪ সালে দেশের ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ তাপপ্রবাহ দেখা যায়। যশোরে তাপমাত্রা ৪৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। ঢাকাতেও তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৭ সালে ঢাকা উত্তর সিটির গড় তাপমাত্রা ছিল ৩৩.৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭.৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
ঢাকা দক্ষিণেও একই প্রবণতা দেখা গেছে- ৩৩.৫০ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ৩৬.৫৪ ডিগ্রি। অর্থাৎ মাত্র সাত বছরে প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নগর পরিবেশে অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত।
সবুজ ও জলাভূমির পতন : ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হলো সবুজ ও জলাভূমির দ্রুত সংকোচন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গবেষণা অনুযায়ী ২০১৫ সালে ঢাকায় সবুজ এলাকা ও খোলা জায়গা ছিল ৫৩.১১ বর্গকিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২৯.৮৫ বর্গকিলোমিটারে। অর্থাৎ মাত্র আট বছরে প্রায় অর্ধেক সবুজ হারিয়েছে রাজধানী।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রিমোট সেন্সিং ও জিআইএস ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, একটি শহরের টেকসই ভারসাম্যের জন্য অন্তত ২০ শতাংশ সবুজ থাকা প্রয়োজন। ঢাকায় আছে মাত্র প্রায় ২ শতাংশ। এর ফলাফল সরাসরি নগরবাসীর ওপর পড়ছে। তাপপ্রবাহ, অস্বস্তিকর আবহাওয়া এবং তাপদ্বীপ প্রভাব এখন দৈনন্দিন বাস্তবতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাধার ভরাট, গাছপালা কমে যাওয়া, কংক্রিটের বিস্তার, যানবাহনের চাপ, এয়ার কন্ডিশনারের তাপ নির্গমন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ- সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একটি উদাহরণ হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে ধরা হয়, যেখানে ৫০ শতাংশ সবুজ ও ২২ শতাংশ জলাভূমির কারণে ঢাকার তুলনায় গড় তাপমাত্রা প্রায় ৩ ডিগ্রি কম।
বিশ্বের দূষিত নগরীর তালিকায় ঢাকা : ঢাকা এখন নিয়মিতভাবেই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় উঠে আসে। শীত মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে, যখন বাতাসে ধুলা, ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণার ঘনত্ব মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। পরিবেশ অধিদফতর ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হলো ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধুলাবালি, পুরোনো যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প-কারখানার নির্গমন, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এবং উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো।
শহরের চারপাশে থাকা শত শত ইটভাটা বাতাসে অতিক্ষুদ্র কণা ছড়িয়ে দেয়, যা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুতে ক্ষতিকর কণার মাত্রা অনেক সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ সীমার কয়েকগুণ বেশি থাকে। এর ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, হাঁপানি, ফুসফুসের ক্যানসার ও শ্বাসকষ্টের মতো রোগ বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণাও বলছে, পরিবেশ দূষণজনিত অকালমৃত্যুর একটি বড় অংশ বায়ুদূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
শব্দদূষণের নীরব সংকট : ঢাকায় এখন আরেকটি নীরব বিপদ হলো শব্দদূষণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আবাসিক এলাকায় শব্দের নিরাপদ সীমা দিনে ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ঢাকার অনেক এলাকায় শব্দের মাত্রা নিয়মিতভাবে ৮০ থেকে ১১০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। শাহবাগ, ফার্মগেট, গুলিস্তান, সায়েদাবাদ, মিরপুর, মহাখালীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এই পরিস্থিতি প্রায় স্থায়ী।
এই শব্দদূষণের উৎস হলো অবাধ হর্ন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, নির্মাণকাজ, জেনারেটর, লাউডস্পিকার এবং অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকলে শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অনিদ্রা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। শিশুদের শেখার ক্ষমতাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বন উজাড়ের বিস্তৃত চিত্র : ঢাকার বাইরের পরিবেশ সংকটও সমানভাবে উদ্বেগজনক। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ অনুযায়ী ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বনভূমি কমেছে ব্যাপকভাবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে- প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার একর বৃক্ষ আচ্ছাদন হারিয়েছে, যা মোট ক্ষতির ৯৪ শতাংশ।
এর মধ্যে বান্দরবান একাই হারিয়েছে ২ লাখের বেশি একর বনভূমি। রাঙামাটিতে প্রায় ১.৩৫ লাখ একর, খাগড়াছড়িতে ৬০ হাজার একরের বেশি বন উজাড় হয়েছে। এই বন ধ্বংসের প্রভাব সরাসরি ভূমিধস, বন্যা এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়ছে। পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশ এখন ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
কী বলছেন বিশ্লেষকরা : রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, ঢাকার নদীগুলো এখন নির্বিচার শিল্প ও গৃহস্থালি দূষণের শিকার। শিল্প-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় মিশছে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন ও ওয়াসার পাইপের মাধ্যমে মানববর্জ্যও নদীতে পড়ছে। তার মতে, পানিতে জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে প্রতি লিটারে ন্যূনতম ৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বুড়িগঙ্গায় বর্ষা ও শরৎ ছাড়া প্রায় সারা বছরই সেই মাত্রা থাকে না। অনেক সময় তা ২ মিলিগ্রামের নিচেও নেমে যায়। তিনি আরও জানান, হাজারীবাগ ও হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য ধলেশ্বরী হয়ে বুড়িগঙ্গায় মিশছে, যা দূষণকে আরও তীব্র করছে।
অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার খালগুলো ধীরে ধীরে দখল ও ভরাট হয়ে গেছে। পরীবাগ, ধোলাইখাল, রায়েরবাজার, আরামবাগ, গোপীবাগ, সেগুনবাগিচা, গোবিন্দপুর, কাঁঠালবাগান, নারিন্দা ও ধানমন্ডির মতো বহু খাল এখন বাস্তবে অস্তিত্বহীন। বক্স কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে খাল ঢেকে ফেলা হয়েছে, যা এখন জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, একটি দেশের মোট ভূখণ্ডের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশে তা নেই, বরং প্রতি বছর বনভূমি কমছে। তিনি বলেন, বনভূমি ও জলাশয় ছাড়া নগর পরিবেশ টেকসই হতে পারে না। তাই সামাজিক বনায়ন বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আরও জোরদার করা জরুরি।
পরিবেশবিদদের মতে, ঢাকার সংকট এখন আলাদা আলাদা নয়। বায়ু, পানি, শব্দ, তাপ সব একসঙ্গে একটি সম্মিলিত বিপর্যয় তৈরি করেছে। এটি একটি ‘ক্যাসকেডিং এনভায়রনমেন্টাল ক্রাইসিস’, যেখানে এক সংকট আরেকটিকে তীব্র করছে।