কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন এক মাইলফলক অর্জনের দাবি করেছেন যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। মানবদেহের জন্য তৈরি এই প্রথম কোনো ভ্যাকসিনের মূল উপাদান সম্পূর্ণরূপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নকশা করা হয়েছে এবং এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য ইতিমধ্যে মানুষের ওপর প্রাথমিক পরীক্ষামূলক প্রয়োগও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
গবেষকদের দাবি, এটি একটি মৌলিক ও যুগান্তকারী নতুন ধরনের বহুমুখী টিকা, যা একক কোনো ভাইরাস নয় বরং একাধিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দিতে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বড় মহামারি প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি নিউজ সম্প্রতি এই চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্য নিয়ে একটি বিশেষ বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক মহামারির কারণ হতে পারে এমন বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক ভাইরাসের বিরুদ্ধে আগাম ও নিরেট সুরক্ষা দেওয়ার দূরদর্শী লক্ষ্য নিয়েই মূলত এই বিশেষ টিকাটি নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে। এই ভ্যাকসিনের সুরক্ষার আওতায় কোভিড-১৯ এর বিভিন্ন জটিল ভ্যারিয়েন্টের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম এমন অনেক অজানা ভাইরাসও রয়েছে।
যদিও পুরো গবেষণাটি এখনও প্রাথমিক স্তরে রয়েছে, তবুও মানুষের শরীরে এর প্রথম দফার অভাবনীয় ফলাফল বিশ্ব বিজ্ঞানীদের মধ্যে এক নতুন আশার আলো তৈরি করেছে। এই কেমব্রিজ গবেষক দলটি বর্তমানে একই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু এবং মারাত্মক ইবোলা ভাইরাস সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য পৃথক দুটি নতুন টিকা তৈরির কাজও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছেন।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো সাধারণ টিকার মূল কাজ হলো মানবদেহের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট কোনো ক্ষতিকর ভাইরাস বা জীবাণু আগে থেকেই চিনতে বা শনাক্ত করতে শেখানো, যার ফলে ভবিষ্যতে প্রকৃত সংক্রমণ ঘটলে মানুষের শরীর খুব দ্রুত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পায়। তবে বর্তমান বিশ্বের অনেক ভাইরাসই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের জিনগত গঠন বা বৈশিষ্ট্য ক্রমাগত পরিবর্তন করতে সক্ষম, যা বিজ্ঞানের ভাষায় মিউটেশন নামে পরিচিত।

এই দ্রুত রূপান্তরের কারণে আগে থেকে তৈরি করা অনেক ভালো ভ্যাকসিনের কার্যকারিতাও ধীরে ধীরে কমে যায়, যে কারণে কোভিড-১৯ এবং মৌসুমি ফ্লুর মতো ভাইরাসের ক্ষেত্রে প্রতি বছরই নতুন করে টিকা নিয়মিত হালনাগাদ বা আপডেট করার প্রয়োজন পড়ে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অধ্যাপক জোনাথন হিনি এই বিষয়ে বলেন, ‘ভাইরাসের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে আমরা চিকিৎসকেরা প্রায়ই এক ধাপ পিছিয়ে থাকি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো পরিস্থিতির চেয়ে সবসময় এক ধাপ এগিয়ে থাকা এবং এমন একটি স্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা আগে থেকেই গড়ে তোলা, যা নতুন কোনো প্রাদুর্ভাব বা মহামারি পৃথিবীতে দেখা দেওয়ার আগেই শতভাগ কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে’।
সাধারণত বিশ্বজুড়ে কোনো ভাইরাসের বিদ্যমান বা বর্তমান স্ট্রেইনকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরে ল্যাবরেটরিতে টিকা তৈরি করা হয়, তবে কেমব্রিজের গবেষকরা এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আধুনিক এক বৈজ্ঞানিক পথ অনুসরণ করেছেন। তারা ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে এমন সম্ভাব্য সমস্ত ভাইরাসগুলোর বিশাল জেনেটিক তথ্য ও কোড বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ ঝুঁকিগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। এই বিশেষ গবেষণায় বিভিন্ন ভাইরাসের জটিল জেনেটিক কোড একটি উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
সেই এআই বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা ল্যাবে তৈরি করেছেন একটি বিশেষ ‘সুপার-অ্যান্টিজেন’, যা মানুষের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত ও শক্তিশালী করতে পারে যাতে শরীর কেবল একটি নির্দিষ্ট ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো একটি ভাইরাস পরিবারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। গবেষকদের প্রবল আশা, এই পদ্ধতি পুরোপুরি কার্যকর প্রমাণিত হলে ভাইরাসের যেকোনো ধরনের রূপান্তর বা মিউটেশনের পরও এর দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা বজায় থাকবে এবং প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে নতুন কোনো সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লেও মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা তা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে।
ভ্যাকসিন বা টিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান উপাদানগুলোর একটি হলো ‘অ্যান্টিজেন’, যা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট ভাইরাস বা জীবাণু দ্রুত শনাক্ত করতে এবং তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা প্রাচীর গড়ে তুলতে সরাসরি সহায়তা করে। গবেষণার মূল নেতৃত্বদানকারী অধ্যাপক জোনাথন হিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানান, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই প্রথম মানুষের শরীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নতুনভাবে নকশা করা কোনো অ্যান্টিজেন পরীক্ষামূলকভাবে সফল প্রয়োগ করা হয়েছে এবং মানবকল্যাণে এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সত্যিই বিস্ময়কর।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বিবিসি নিউজকে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য কেবল আজকের পরিচিত ভাইরাসগুলোর বিরুদ্ধে সাময়িক সুরক্ষা দেওয়া নয়। আমরা এমন আধুনিক টিকা তৈরি করতে চাই, যা ভবিষ্যতে উদ্ভূত যেকোনো নতুন প্রাদুর্ভাব বা অজ্ঞাত রোগের বিরুদ্ধেও মানবজাতিকে দীর্ঘ সময় ধরে ঢাল হিসেবে সুরক্ষা দিতে পারবে’। তার মতে, এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক মহামারির জন্য বিশ্বকে আগাম প্রস্তুত রাখা, যাতে নতুন কোনো ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগেই তার কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা মানুষের হাতে চলে আসে।
নতুন এই ভ্যাকসিনটি মানুষের শরীরের জন্য কতটা নিরাপদ ও কার্যকর তা প্রথম ধাপে সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করার জন্য ইতিমধ্যে ৩৯ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকের ওপর এই টিকা সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল ফলাফলে বলা হয়েছে, মানবদেহে এর ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল একেবারেই সামান্য ও নগণ্য।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, আগামী দ্বিতীয় ধাপে আরও বড় পরিসরে প্রায় ২০০ জনকে নিয়ে একটি বিস্তারিত গবেষণা পরিচালনা করা হবে, যা মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এই এআই ভ্যাকসিনের সঙ্গে কতটা ভালোভাবে সাড়া দিচ্ছে বা এর আরও কী কী উন্নয়ন প্রয়োজন সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের আরও সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট ধারণা দেবে। এই গবেষণার গুরুত্ব ও বিজ্ঞানীদের অবদান তুলে ধরে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রিসার্চের প্রধান বৈজ্ঞানিক পরিচালক অধ্যাপক মারিয়ান নাইট বলেন, ‘মানুষের ওপর পরীক্ষিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নকশাকৃত এই সুপার অ্যান্টিজেনের প্রাথমিক সাফল্য সত্যিই এক অসাধারণ ঘটনা।
এটি মানবজাতিকে বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী ভাইরাস-সুরক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানের সক্ষমতায় এক নতুন যুগান্তকারী অগ্রগতির সূচনা করেছে’। তার মতে, এই বিশেষ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে এমন বহুমুখী টিকা তৈরির পথ উন্মুক্ত করতে পারে, যা একাধিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ইমিউনিটি তৈরি করবে এবং বৈশ্বিক মহামারি প্রতিরোধে এক অনন্য অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে।
সূত্র: বিবিসি
সময়ের আলো/টিএইচ