বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও এবং ডিপফেইকের অপব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি সব কনটেন্ট ক্রিয়েটরের জন্য ডিপফেইক ভিডিও দ্রুত শনাক্ত এবং তা অপসারণে সহায়তার লক্ষ্যে একটি বিশেষ এআই টুল উন্মোচন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সোমবার (১৮ মে) ইউটিউবের পক্ষ থেকে এই নতুন প্রযুক্তি চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। এই টুলের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা সহজেই জানতে পারবেন যে তাদের অনুমতি ছাড়া চেহারা বা অবয়ব ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মে কোনো বিভ্রান্তিকর ভিডিও তৈরি করা হয়েছে কি না। অননুমোদিত এসব কনটেন্ট দ্রুত সরিয়ে ফেলে নির্মাতাদের মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।
প্রযুক্তি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সাইট এনগ্যাজেটের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নতুন এই বিশেষ এআই টুলটি মূলত পেশাদার কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সুরক্ষার জন্য ডিজাইন করা হলেও সাধারণ ব্যবহারকারীরাও এটি ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন।
ইউটিউবের মুখপাত্র জ্যাক ম্যালন এই বিষয়ে বলেন, ‘এই নতুন সুরক্ষা ব্যবস্থাটি নতুন কিংবা পুরোনো—সব ধরনের কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, যাতে প্ল্যাটফর্মের সবাই একই স্তরের নিরাপত্তা উপভোগ করতে পারেন।’ বর্তমানে এআই প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির কারণে আসল এবং ভুয়া ভিডিওর মধ্যকার পার্থক্য আলাদা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন টুলটি বিশেষ করে সেইসব মানুষের জন্য বড় সহায় হিসেবে কাজ করবে, যাদের চেহারা অনুমতি ছাড়া কোনো বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকর কনটেন্টে ব্যবহার করা হয়।
ইউটিউব কর্তৃপক্ষ আশা করছে, কোনো ব্র্যান্ড বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যদি কোনো কনটেন্ট নির্মাতার অনুমতি ছাড়া তার চেহারা ব্যবহার করে কোনো ডিজিটাল বিজ্ঞাপন তৈরি করে, তবে সেটিও নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে এই টুল সাহায্য করবে। এই প্রযুক্তিটি ব্যবহারের জন্য ব্যবহারকারীদের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আগ্রহী ব্যবহারকারীদের প্রথমে নিজেদের ইউটিউব স্টুডিওতে প্রবেশ করে ‘কনটেন্ট ডিটেকশন’ অংশের অন্তর্গত ‘লাইকনেস’ অপশনটি চালু করতে হবে। এরপর একটি নির্দিষ্ট কিউআর কোড স্ক্যান করে জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে এবং একটি সেলফি ভিডিওর মাধ্যমে নিজের ভেরিফিকেশন বা পরিচয় নিশ্চিতকরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
এই প্রাথমিক সেটআপ সম্পূর্ণ হয়ে গেলে ইউটিউবের সিস্টেমে থাকা এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্ল্যাটফর্মে আপলোড হওয়া প্রতিটি ভিডিও স্ক্যান করবে। স্ক্যানিংয়ের সময় যদি কোনো ভিডিওতে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর চেহারার মিল খুঁজে পাওয়া যায়, তবে সিস্টেমটি তাৎক্ষণিকভাবে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে তা অবহিত করবে। এরপর আক্রান্ত ব্যবহারকারী চাইলে খুব সহজেই সেই নির্দিষ্ট ভিডিওটি ইউটিউব থেকে স্থায়ীভাবে অপসারণের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানাতে পারবেন।
উল্লেখ্য, ইউটিউব ২০২৪ সালে প্রথমবার এই উন্নত প্রযুক্তিটি বিশ্বের সামনে প্রদর্শন করেছিল এবং দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০২৫ সালের শেষ দিকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করে। শুরুতে এই সুবিধাটি শুধুমাত্র ‘ইউটিউব পার্টনার প্রোগ্রাম’-এর সুনির্দিষ্ট সদস্যদের জন্য সীমিত আকারে উন্মুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে এর পরিধি বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদদের সুরক্ষায় এটি ব্যবহার করা হয়।
ইউটিউব সতর্কতার সঙ্গে জানিয়েছে, এই টুলটি মূলত মানুষের চেহারা বা অবয়ব নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হলেও শুধু কণ্ঠস্বর একা ব্যবহার করে তৈরি করা ডিপফেইক পুরোপুরি শনাক্ত করতে পারবে না। যদিও ভিডিও সামগ্রিকভাবে যাচাই করার সময় ব্যবহারকারীর কণ্ঠস্বর সম্পর্কেও সিস্টেমে কিছু প্রশ্ন করা হতে পারে।
সময়ের আলো/টিএইচ