বিশ্বজুড়ে এআইয়ের উন্নয়নে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা কী ভূমিকা রাখছেন

সময়ের আলো ডেস্ক

প্রযুক্তি

২০২১ সালে বৈশ্বিক অনলাইন শ্রম বাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ ছিল বাংলাদেশের দখলে। সরকারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৬

2026-07-11T22:02:09+00:00
2026-07-11T22:02:09+00:00
 
  বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রযুক্তি
বিশ্বজুড়ে এআইয়ের উন্নয়নে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা কী ভূমিকা রাখছেন
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ১০:০২ পিএম 
এআই জেনারেটেড ছবি।
২০২১ সালে বৈশ্বিক অনলাইন শ্রম বাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ ছিল বাংলাদেশের দখলে। সরকারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যারা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছেন। 

চ্যাটজিপিটি সাধারণ মানুষের কাছে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর প্রায় চার বছর পার হতে চলেছে। বর্তমানে এই প্রযুক্তি ইমেইল লেখা, কোডিং করা কিংবা ভিডিও নির্মাণের মতো ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার নানা জটিল কাজ অবলীলায় করে দিচ্ছে। 

Advertisement
তবে এআইয়ের প্রতিটি নির্ভুল উত্তরের নেপথ্যে কাজ করেন একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। এই 'ডেটা অ্যানোটেটর' বা 'এআই ট্রেইনার'রাই মূলত এআই মডেলগুলোকে যাচাই করেন, উত্তরগুলো ক্রমানুসারে সাজান এবং ভুল সংশোধন করে দেন। এই ক্রমবর্ধমান শিল্পে এখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করছেন। 

ডেটা অ্যানোটেটর কী কাজ করেন 

২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মেটায় (ফেসবুকের মাতৃপ্রতিষ্ঠান) ডেটা অ্যানোটেটর হিসেবে কাজ করেছেন তাওসিফ নিলয়। নিজের কাজের ধরন সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি মূলত নির্দিষ্ট কিছু প্রম্পট বা নির্দেশনার সীমাবদ্ধতার ওপর ভিত্তি করে ডেটা লেবেলিং করতাম। এআই মডেলগুলো যাতে কোনো ক্ষতিকর বা নীতিবিরুদ্ধ উত্তর না দেয়, সেজন্য বিভিন্নভাবে সেগুলোকে পরীক্ষা করা হতো। এর মধ্যে কোড ইনজেকশন কিংবা ভুল তথ্যের মাধ্যমে এআইকে বিভ্রান্ত করার মতো পদ্ধতিও ছিল। 

তাওসিফের কাজ ছিল মূলত মডেল টেস্টিং এবং 'রেড-টিমিং' করা। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে এআই-এর সক্ষমতা ও সহনশীলতা যাচাইয়ের জন্য এর বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়।

এই খাতের অন্যান্য সাধারণ কাজের মধ্যে রয়েছে ছবি ও অডিও ট্যাগিং। এর মাধ্যমেই একটি এআই মডেল চিনতে শেখে সে আসলে কী দেখছে বা শুনছে। এছাড়া চ্যাটবটের উত্তরগুলো লিখে রাখা এবং সেগুলোর মান নির্ধারণ করাও এই পেশার নিয়মিত কাজের অংশ।

এভাবেই একটি মডেল শিখতে পারে মানুষ কোন ধরনের উত্তর পছন্দ করে। ক্ষতিকর তথ্যগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে এটি শেখে কোন কথাগুলো বলা যাবে না। হাজার হাজার এমন সংশোধনের মাধ্যমেই এআই আজ মানুষের মতো সাবলীল ভাষায় কথা বলতে পারছে।


বিশাল এক বাজার

ডেটা অ্যানোটেটর কাজের বাজার দ্রুত বাড়ছে। 'স্ট্রেটস রিসার্চের' তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ডেটা অ্যানোটেশন টুলের বৈশ্বিক বাজার ছিল প্রায় ২.৩৭ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সাল নাগাদ এটি ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

বিশ্বব্যাংকের হিসেবে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৫ কোটি থেকে ৪৩ কোটি মানুষ ছবি লেবেলিং বা কনটেন্ট রিভিউয়ের মতো এআই প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত নানা অনলাইন কাজে যুক্ত। 

চাহিদা থাকলেও অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির কারণে এই খাতের কিছু সাধারণ কাজ দিন দিন কমে আসছে। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে, অটোমেশনের যুগে বাংলাদেশের এই ফ্রিল্যান্সিং বাজার কি টিকে থাকবে? 

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থানের মূলে রয়েছে এর বিশাল এক ইংরেজি জানা জনগোষ্ঠী, যারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাজ করে দিচ্ছেন। ২০২১ সালে বৈশ্বিক অনলাইন শ্রম বাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ ছিল বাংলাদেশের দখলে। 

সরকারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যারা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছেন।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং কম্পিউটার ভিশন ও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং বিশেষজ্ঞ নাবিল মোহাম্মদ বাংলাদেশের এই এআই প্রশিক্ষণ শিল্পকে বিপিও (বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং) খাতের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তার মতে, এআই ডেটার কাজ অনেকটা আগের বিপিও খাতের মতোই— যেখানে কম খরচে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো করা হয়। তবে এআই ডেটা নিয়ে কাজ করতে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন বেশি। যদি আমরা এই অভিজ্ঞতাকে উচ্চমানের আউটপুট তৈরির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারি, তবে এটি স্রেফ আউটসোর্সিংয়ের আরেকটি জোয়ার হয়েই থেকে যাবে। 

তিনি আরও বলেন, দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় ও বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে পারলে এই কাজগুলো এআই সাপ্লাই চেইনে প্রবেশের ভালো সুযোগ হতে পারে। 

আয় বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

সুযোগ থাকলেও মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ২০২৫ সালে 'টাইম ম্যাগাজিনের' এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আমেরিকান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অ্যানোটেশনের জন্য আউটসোর্সিং ফার্মগুলোকে ঘণ্টায় ১২.৫০ ডলার পর্যন্ত দেয়। কিন্তু কেনিয়ার কর্মীরা পান মাত্র ২ ডলার। এই মজুরি বৈষম্যের শিকার বাংলাদেশের কর্মীরাও। লিংকডইনের চাকরির সার্কুলারগুলোতেও প্রায়ই এমন নিম্ন হারের মজুরি দেখা যায়। 

এছাড়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কেনিয়ার একটি আদালত রায় দেয় যে, সে দেশের ১৮৪ জন আউটসোর্সড কনটেন্ট মডারেটরের জন্য মেটা আইনিভাবে দায়ী। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি ১.৬ বিলিয়ন ডলারের মামলার মুখে পড়ে। কোম্পানিগুলো মূলত খরচ কমাতেই এমন নিম্ন মজুরির অঞ্চলগুলো বেছে নেয়।

ডেটা অ্যানোটেশন শিল্পে প্রবেশ করা সহজ হলেও এখানে টিকে থাকার জন্য উচ্চতর দক্ষতার প্রয়োজন। সাধারণ লেবেলিং বা রেটিংয়ের কাজ সহজেই শেখা যায় বলে বাংলাদেশ বড় আকারে এই বাজারে প্রবেশ করতে পেরেছে। তবে এই কর্মীরা সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য হওয়ায় তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা কম, যা মজুরিকেও নিম্নমুখী রাখে।

অন্যদিকে, রেড-টিমিং বা পলিসি মেকিংয়ের মতো উচ্চস্তরের কাজগুলোতে আয় অনেক বেশি এবং এগুলো অটোমেশনের ঝুঁকিমুক্ত। সমস্যা হলো, বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ প্রচেষ্টাগুলোর বড় অংশই এখনও সাধারণ এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

নাবিল মোহাম্মদ এই পদ্ধতির মানবিক ও পেশাগত ঝুঁকির বিষয়ে বলেন, আমাদের অনেক মেধাবী তরুণ সাধারণ কাজে আটকে আছেন, যা তাদের ক্যারিয়ারের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতিতে কাজে আসছে না। সঠিক পরিবেশ পেলে তারা আরও উন্নত মানের কাজ করতে পারত। এআই প্রশিক্ষণ কাজে দিলেও আসল মূল্য আসে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। সব ট্রেনিং প্রোগ্রাম সেই অভিজ্ঞতা দিতে পারে না, ফলে দক্ষতার একটি মিথ্যে ধারণা তৈরি হয়।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এআইয়ের দ্রুত উন্নতি। এখন যেসব কাজ মানুষ করছে, কয়েক মাস পর এআই নিজেই তা করতে সক্ষম হতে পারে। নাবিল মোহাম্মদের সতর্ক করে বলেন, আজ যেসব দক্ষতার চাহিদা আছে, কয়েক মাস পরই তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যেতে পারে। আমাদের লক্ষ্য যদি আরও উঁচুতে না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের একটি বড় জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।  

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

সামষ্টিক অর্থনীতির প্রভাবের বাইরে একজন ব্যক্তির জন্য ডেটা অ্যানোটেশনের কাজ কতটা কার্যকর—এটি কি দীর্ঘমেয়াদি পেশা হতে পারে, নাকি কেবল অস্থায়ী আয়ের উৎস—তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।

ডেটা অ্যানোটেটর তাওসিফ নিলয়ের মতে, এই খাত থেকে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর কিংবা নীতিনির্ধারণ-সংশ্লিষ্ট দলে কাজ করার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

তবে সাবেক এআই অ্যানোটেটর ফারদিন জারিফের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তাঁর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠান পদোন্নতির আশ্বাস দিলেও এক বছরের মধ্যেই কর্মী ছাঁটাই শুরু করে। ফলে ক্যারিয়ার উন্নয়নের সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর হয়নি।

চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের জন্য স্থানীয় অনেক কাজের তুলনায় এখানে তুলনামূলক বেশি আয়ের সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক লাভ নির্ভর করবে এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কী ধরনের প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা তৈরি করা হচ্ছে তার ওপর।

নাবিল মোহাম্মদের মতে, এআই প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উন্নত মানের মানবিক ইনপুটের প্রয়োজনও বাড়ছে। তাই শুধু সেবা প্রদান নয়, নিজস্ব এআইভিত্তিক পণ্য ও সমাধান তৈরির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য কার্যকর নীতিমালা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে শুধু এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং এআই প্রযুক্তির সরবরাহকারী ও উদ্ভাবক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী এআই সমাধান তৈরিতে সরকার, বেসরকারি খাত ও গবেষকদের সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।


সময়ের আলো/ইউএমএইচ
  বিষয়:   বাংলাদেশ  ফ্রিল্যান্সার  এআই 


Loading...
Loading...
প্রযুক্তি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: