বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিমণ্ডলে এক ভয়াবহ ও অদৃশ্য বিপদের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বটবাহিনী’। সাধারণ মানুষের অজান্তেই রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণ, জনমত গঠন এবং ব্যক্তি জীবনের গোপনীয়তা ও সম্মান আজ এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সফটওয়্যার ও সুসংগঠিত ট্রল আর্মির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সাইবার জগতের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ট্রাফিকই এখন এই বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপের দখলে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, ‘বট’ হলো এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার প্রোগ্রাম, যা মানুষের মতোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করা, প্রতিক্রিয়া জানানো বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ক্ষমতা রাখে। বর্তমান বাংলাদেশে দুই ধরনের অপশক্তি এই ডিজিটাল অরাজকতা চালাচ্ছে: ১। কম্পিউটার প্রোগ্রাম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নির্দিষ্ট কি-ওয়ার্ড বা এজেন্ডার ভিত্তিতে এরা সেকেন্ডের মধ্যে শত শত কমেন্ট ও রিয়্যাকশন তৈরি করতে সক্ষম; ২। হিউম্যান ট্রল আর্মি: মানুষ পরিচালিত কিন্তু ভুয়া আইডি ব্যবহারকারী চক্র। অর্থের বিনিময়ে বা রাজনৈতিক স্বার্থে এরা দলবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট টার্গেটকে আক্রমণ করে।
বটবাহিনীর ৩টি বিধ্বংসী কৌশল: ১. ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ বা কৃত্রিম জনমত তৈরির মাধ্যমে এরা পরিকল্পিতভাবে মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে; ২. বিশিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে হাজার হাজার ভুয়া আইডি থেকে অভিন্ন ভাষায় গালি বা কুৎসা রটনা করা হয়; ৩. পরিকল্পিতভাবে গণ-রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে ফেসবুকের অ্যালগরিদমকে বিভ্রান্ত করে যেকোনো আইডি বা পেজ বন্ধ করে দেওয়া।
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বট শনাক্ত করার কিছু সহজ লক্ষণ রয়েছে। যেমন— কোনো পোস্ট প্রকাশের মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে কমেন্ট জমা হওয়া, হুবহু একই কমেন্ট বারবার আসা এবং প্রফাইল পিকচার বা টাইমলাইনে কোনো ব্যক্তিগত পরিচয়হীন ভুয়া অ্যাকাউন্টের আধিক্য।
এই ‘ডিজিটাল বন্দিদশা’ থেকে মুক্তি পেতে সংশ্লিষ্ট মহল তিনটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে: ১। মেটা ও গুগলের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় অফিস স্থাপন এবং স্থানীয় ভাষা ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী মনিটরিং ব্যবস্থার উন্নয়ন।; ২। সংঘবদ্ধ ডিজিটাল অপপ্রচার ও ট্রল ফার্মের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর শাস্তিমূলক আইন প্রয়োগ; ৩। শিক্ষাব্যবস্থায় তথ্য যাচাই ও সচেতনতার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করে জনগণকে এই ডিজিটাল প্রতারণা সম্পর্কে সজাগ করে তোলা।
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টার সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি স্পষ্ট করে দিয়েছে, অনলাইনের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করার সময় এখন অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় বটবাহিনীর এই ডিজিটাল আগ্রাসন রোধ করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সময়ের আলো/কহু