অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য ঢোকার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু অজান্তেই সেই কয়েক মিনিট একসময় ঘণ্টায় পরিণত হয়। কেউ একের পর এক নেতিবাচক খবর পড়তে থাকেন, আবার কেউ রিল বা শর্ট ভিডিও দেখতে দেখতে দীর্ঘ সময় পার করে ফেলেন। অনেকের মনে প্রশ্ন আসে— ডুমস্ক্রলিং এবং রিলে আসক্তি কি একই বিষয়? আসলে নয়। তবে দুটি আচরণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ডুমস্ক্রলিং বলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টানা নেতিবাচক, উদ্বেগজনক কিংবা চাঞ্চল্যকর খবর ও কনটেন্ট দেখে বা পড়ে যাওয়ার অভ্যাসকে বোঝায়। এখানে মানুষের আগ্রহ মূলত তথ্যের দিকে, বিশেষ করে এমন তথ্যের দিকে যা উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা বাড়ায়। অন্যদিকে, রিল বা শর্ট ভিডিওর আসক্তিতে মানুষ ছোট ছোট ভিডিওর অবিরাম ফিডে আটকে যায়। অর্থাৎ ডুমস্ক্রলিংয়ে মূল আকর্ষণ নেতিবাচক তথ্য, আর রিল আসক্তিতে আকর্ষণ থাকে দ্রুত পরিবর্তিত বিনোদনমূলক ভিডিওর ধারাবাহিকতায়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক, কথাসাহিত্যিক ও মনোশিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামালের মতে, এ ধরনের অভ্যাস শুধু মূল্যবান সময়ই নষ্ট করে না; ধীরে ধীরে ঘুমের মান, মানসিক সুস্থতা এবং দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে কাটানোর ফলে শরীর ও মনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তবে সচেতনভাবে কিছু অভ্যাস গড়ে তুললে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
অনেকেই মনে করেন, ‘আর মাত্র এক মিনিট।’ কিন্তু সেই এক মিনিট কখন দীর্ঘ সময়ে রূপ নেয়, তা টের পাওয়া যায় না। একসময় মানুষ তথ্য সংগ্রহের বদলে তথ্যের স্রোতে ভেসে যেতে থাকে। পাশাপাশি কোনো গুরুত্বপূর্ণ আপডেট মিস হয়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় বারবার ফোন আনলক করা, নোটিফিকেশন দেখা কিংবা একই পেজ রিফ্রেশ করার অভ্যাসও তৈরি হয়।
যেসব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হওয়া জরুরি
১. ঘুমানোর আগে ‘আর একটু দেখি’ বলতে বলতে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকা।
২. ফোন সরিয়ে রাখার পরও খবর বা ভিডিও নিয়ে বারবার চিন্তা করা।
৩. সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথম কাজ হিসেবে ফোন হাতে নেওয়া।
৪. নতুন নোটিফিকেশন না থাকলেও বারবার ফোন চেক করা।
৫. অজান্তেই দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাটিয়ে দেওয়া, যার ফলে পড়াশোনা বা কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া।
ডুমস্ক্রলিং কীভাবে ঘুমের ক্ষতি করে
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামালের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘুমের ওপর বিভিন্নভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নীল আলোর প্রভাব
মোবাইলের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ ব্যাহত হয়।
মস্তিষ্কের অতিরিক্ত সক্রিয়তা
যুদ্ধ, দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক সংঘাত বা ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মতো খবর মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সময় সতর্ক অবস্থায় রাখে। ফলে শরীর বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হলেও মস্তিষ্ক সহজে ঘুমের অবস্থায় যেতে পারে না।
ডোপামিনের প্রভাব
রিল বা শর্ট ভিডিওর দ্রুত পরিবর্তিত কনটেন্ট মস্তিষ্কে ডোপামিনের কার্যক্রম বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে নতুন নতুন কনটেন্ট দেখার আগ্রহ তৈরি হয় এবং ঘুমানোর সময় পিছিয়ে যায়। পরদিন ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
ডুমস্ক্রলিংয়ের ক্ষতিকর প্রভাব
১. মানসিক প্রভাব
২. উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি
৩. হতাশাবোধ বেড়ে যাওয়া
৪. মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়া
৫. শারীরিক প্রভাব
৬. পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া
৭. মাথাব্যথা
৮. চোখে ক্লান্তি
৯. সারাদিন অবসন্ন অনুভব করা
সামাজিক প্রভাব
১. পরিবারের সঙ্গে সময় কম কাটানো
২. বাস্তব জীবনের সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়া
৩. পড়াশোনা ও কর্মক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়া
৪. ডুমস্ক্রলিং নিয়ন্ত্রণে যা করতে পারেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, লক্ষ্য ফোন ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা নয়; বরং সচেতন ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।
১. প্রতিদিনের স্ক্রিন টাইম নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখুন।
২. প্রয়োজনে অ্যাপ টাইমার বা অ্যাপ ব্লকার ব্যবহার করুন।
৩. ঘুম থেকে ওঠার পরপরই এবং ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
৪. নেতিবাচক কনটেন্ট প্রচার করে এমন পেজ বা গ্রুপ আনফলো কিংবা মিউট করুন।
৫. ইতিবাচক, শিক্ষামূলক ও উপকারী কনটেন্ট অনুসরণ করুন।
৬. বই পড়া, ব্যায়াম, গান শোনা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো অফলাইন অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৭. বিছানায় শুয়ে মোবাইল ব্যবহার করবেন না।
৮. রাতে ফোনের নোটিফিকেশন সাইলেন্ট বা Do Not Disturb মোডে রাখুন।
৯. ঘুমানোর আগে বই পড়া, ধ্যান, প্রার্থনা বা হালকা সংগীত শোনার অভ্যাস করুন।
১০. ফোন বিছানা থেকে দূরে চার্জে রাখুন।
১১. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের পর ফোন ব্যবহার বন্ধ করার জন্য একটি ডিজিটাল কারফিউ নির্ধারণ করুন।
অধ্যাপক ডা. মোহিত কামালের ভাষ্য অনুযায়ী, ডুমস্ক্রলিং এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মানসিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি না পেলেও এটি আধুনিক ডিজিটাল জীবনের একটি অস্বাস্থ্যকর ও আসক্তিমূলক আচরণ, যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তির মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ