বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় ও উত্তেজনাপূর্ণ মহোৎসব ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। বিভিন্ন দিক থেকে এবারের গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ হতে যাচ্ছে এক অনন্য আয়োজন। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশে (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) যৌথভাবে অনুষ্ঠিত এই আসরে থাকবে রেকর্ড সংখ্যক ৪৮টি দল ও ১০৪টি ম্যাচ।
পাশাপাশি, এবারের আসর হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসে এযাবৎকালের সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তিনির্ভর টুর্নামেন্ট, যেখানে খেলা ও ম্যাচ পরিচালনায় যুক্ত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির একাধিক উন্নত ব্যবস্থা। রেফারিংয়ের নিখুঁত সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে মাঠের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ, সবখানেই এবার জায়গা করে নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক সেন্সর প্রযুক্তি।
এআই প্রযুক্তির এই মহোৎসবে খেলার মূল আকর্ষণ হিসেবে ব্যবহার করা হবে স্পোর্টস জায়ান্ট অ্যাডিডাসের তৈরি নতুন ম্যাচ বল ‘ট্রাইওন্ডা’ (স্প্যানিশে যার অর্থ তিন ঢেউ)। এই বিশেষ বলের ভেতরে বসানো আছে একটি অত্যন্ত ছোট ‘ইনার্শিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট’ (আইএমইউ) সেন্সর চিপ, যা প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের গতি, নিখুঁত অবস্থান ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এই রিয়েল-টাইম ডাটা সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) সিস্টেমে পাঠানো হবে, যার ফলে অফসাইডসহ বিভিন্ন জটিল সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নেওয়া সম্ভব হবে।
এর পাশাপাশি ফিফা ও টেক জায়ান্ট লেনোভোর অংশীদারিত্বে খেলোয়াড়দের থ্রি-ডি ডিজিটাল মডেল বা ভার্চুয়াল অ্যাভাটার তৈরি করা হবে, যা দিয়ে খেলোয়াড়দের দ্রুত স্ক্যান করে তাদের শরীরের সঠিক মাপসহ ভার্চুয়াল প্রতিরূপ তৈরি করা হবে এবং সেটি অফসাইড ও ম্যাচ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হবে। মাঠের ভেতর থেকে দর্শকদের খেলা দেখার বাস্তব অভিজ্ঞতা দিতে এবার রেফারিদের শরীরে বিশেষ বডি ক্যামেরাও ব্যবহার করা হবে।
এবারের ফুটবল আসরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব সংযোজন হিসেবে ব্যবহার করা হবে চার-পা বিশিষ্ট রোবোটিক কুকুর। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটগুলো স্টেডিয়ামের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল এলাকাগুলোতে প্রবেশ করে লাইভ ভিডিও পাঠাবে, যা দেখে পুলিশ ও স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবে। বিশেষ করে মেক্সিকোর কিছু অতি সংবেদনশীল ও জনাকীর্ণ শহরে এই রোবট কুকুরগুলো মোতায়েন থাকবে।

এছাড়াও লাইনম্যানদের দেরিতে অফসাইডের পতাকা তোলার চিরচেনা জটিলতা দূর করতে ফিফা একটি উন্নত আধা-স্বয়ংক্রিয় বা সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি চালু করেছে, যা ম্যাচ অফিশিয়ালসদের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করেই দ্রুত সংকেত দিতে সক্ষম। কাতার বিশ্বকাপের সিস্টেমে কোনো খেলোয়াড় ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইডে থাকলে রেফারিদের সতর্ক করা হতো, তবে এবারের নতুন সিস্টেমে কোনো খেলোয়াড় মাত্র ১০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইডে গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত চলে যাবে রেফারির ইয়ারপিসে। তবে জটিল পরিস্থিতিতে বা খেলোয়াড়দের অবস্থান খুব কাছাকাছি থাকলে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে এই সিস্টেমের কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকবে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।

প্রযুক্তিগত এই আধুনিকায়নের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের শারীরিক সুস্থতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে এবার টুর্নামেন্টে বাধ্যতামূলক ৩ মিনিটের হাইড্রেশন বা পানি বিরতি চালু করা হচ্ছে। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে ভেন্যুর তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকলে কেবল কুলিং ব্রেক দেওয়া হতো, তবে এবারের বিশ্বকাপে আবহাওয়া যাই হোক না কেন প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিটি অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে (সাধারণত ২২তম মিনিটে) এই পানি বিরতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু একটি বড় ক্রীড়া টুর্নামেন্টই নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ‘টেক-ড্রিভেন ফুটবল ইভেন্ট’, যেখানে এআই, আধুনিক সেন্সর, রোবট ও উন্নত ডাটা সিস্টেম ফুটবলের ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
সময়ের আলো/টিএইচ