ঝটিকা মিছিলে সরকারে অস্বস্তি

সাব্বির আহমেদ

রাজনীতি

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের ধারাবাহিক মিছিলে কিছুটা অস্বস্তিতে সরকার। সম্প্রতি নোয়াখালীতে ছাত্রলীগের লাঠি মিছিল এবং পরবর্তীতে

2026-06-08T01:21:37+00:00
2026-06-08T01:21:37+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
রাজনীতি
ঝটিকা মিছিলে সরকারে অস্বস্তি
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ১:২১ এএম   (ভিজিট : ২১)
ছবি : সংগৃহীত
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের ধারাবাহিক মিছিলে কিছুটা অস্বস্তিতে সরকার। সম্প্রতি নোয়াখালীতে ছাত্রলীগের লাঠি মিছিল এবং পরবর্তীতে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন সরকারপ্রধান তারেক রহমান। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। এ ঘটনায় কারও গাফিলতি আছে কি না তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। 

একই সঙ্গে সংগঠন হিসেবে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের নিষ্ক্রিয়তার কারণ অনুসন্ধান করছে কেন্দ্র। এর কারণ হিসেবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয় ভোটের সমীকরণ এখানে বড় প্রভাব ফেলছে। সম্ভাব্য প্রার্থী ও অনুসারীরা এই মুহূর্তে নতুন করে আঞ্চলিক বিবাদের জড়াতে চান না।

জানা যায়, ‘ছাত্রলীগের বিশাল মিছিল, ব্যাপক উপস্থিতি দেখে সরে গেল পুলিশ’- এমন শিরোনামে শুক্রবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিউজ হওয়ার পর তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কেউ কেউ সরকারের প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। 

বিএনপির সমর্থক ও অনুসারীরা সরাসরি পুলিশ প্রশাসনকে দায়ী করছেন। বিষয়টি নজরে আসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। এ ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া দেখান সংশ্লিষ্টদের প্রতি। দ্রুত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। এরপর থেকে নড়েচড়ে বসেছে নোয়াখালী পুলিশ প্রশাসন ও ওই অঞ্চলের পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। গতকাল এ নিয়ে তারা দফায় দফায় নিজেদের মধ্যে মিটিং করেছেন।

জানা যায়, নোয়াখালী সদর উপজেলায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিলের শুরুতে পুলিশ বাধা দিলেও এক পর্যায়ে মিছিলকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি বিবেচনা করে পিছু হটে। ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। 

শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে উপজেলার নোয়ান্নই ইউনিয়নের বাঁধের হাট বাজারে ইউনিয়ন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচির আয়োজন করে। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করেই নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে অগ্রসর হয় এবং বাজারের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। 

জানতে চাইলে সুধারাম মডেল থানার ওসি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আগে থেকেই টের পেয়ে পুলিশের একাধিক দল সেখানে উপস্থিত ছিল। কিন্তু পুলিশের বাধা উপেক্ষা করেই মিছিলটি সামনে এগিয়ে যায়। কোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে এক পর্যায়ে পুলিশ সেখান থেকে সরে যায়।

এ ঘটনায় সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দুজন নেতা সময়ের আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পুলিশের গাফিলতি ছিল কি না তা দেখার নির্দেশনা দিয়েছেন। নোয়াখালীর ঘটনায় কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি পুলিশ। এমনকি তারা নাকি জানতোই না এত বড় মিছিলের খবর। সরকারের গোয়ান্দো সংস্থা এখানে ফাংশন করেনি। 

এ ঘটনায় পুলিশ বেশ চাপে আছে। স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনও ঢিলেঢালাভাবে ছিল। এর কারণ কী জানতে চাইলে বিএনপির নেতা বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সমীকরণ এখানে বড় প্রভাব ফেলেছে। সম্ভাব্য প্রার্থী ও অনুসারীরা এই মুহূর্তে নতুন করে আঞ্চলিক বিবাদের জড়াতে চান না। 

এতে তাদের ভোটের ক্ষতি হতে পারে এমন আশঙ্কা আছে। এমনিতেই নোয়াখালী সদরের কিছু অংশ আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকা। বড় একটা ভোট ব্যাংক আছে আওয়ামী লীগের। তাদের ভোট তো সব প্রার্থীই টানতে চাইবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা এই প্রতিবেদককে বলেন, আপনার কাছে আমার প্রশ্ন বিএনপি ও সরকারের রাজনীতি এখন কীসে বন্দি? জামায়াতে ইসলামী ছাড়া আলোচনায় অন্য কিছু নেই। সুতরাং আওয়ামী লীগ তো সুযোগ নেবেই। মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে গোনাই ধরা হচ্ছে না। 

আওয়ামী লীগ ঠেকানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। কোনো কোনো সিনিয়র নেতা তো আওয়ামী লীগকে পরোক্ষভাবে রাজনীতি করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছেন। শুধু নোয়াখালী নয়, বিভিন্ন জায়গায় এমন ঘটনা ঘটেছে। আর পুলিশ নাকি এখনই পিছু হটে!

শুধু তাই নয়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ জড়ো হয়ে আকস্মিক বা ‘ঝটিকা মিছিল’ করছেন। মূলত শেখ হাসিনার সমর্থন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূসের বিচার দাবি, বর্তমান সরকারের বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে এই মিছিলগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। 

ঈদের আগে চট্টগ্রাম মহানগরের আগ্রাবাদ, ষোলশহর, মুরাদপুর ও আউটার রিং রোড এলাকায় নিষিদ্ধ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ব্যানারসহ ঝটিকা মিছিল বের করেন। শহরের জিইসি মোড় এলাকায় ওমরাগনি এমইএস কলেজ ইউনিটের শতাধিক ছাত্রলীগে কর্মী মিছিল করেন, যেখান থেকে পরবর্তী সময়ে পুলিশের অভিযানে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া ফটিকছড়ির নাজিরহাট এবং আনোয়ারা উপজেলার চাতরী চৌমুহনী এলাকায় মশাল ও ব্যানার নিয়ে ঝটিকা মিছিলের খবর পাওয়া যায়।

লালমনিরহাট জেলা শহরের রেলওয়ে কর্মকর্তাদের আবাসন এলাকা এবং বুড়িমারী-পাটগ্রাম মহাসড়কে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর প্রথমবারের মতো ব্যানারসহ ঝটিকা মিছিল করেছে ছাত্রলীগ। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার তিনটি ভিন্ন স্থানে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের দাবি ও অন্যান্য উপলক্ষকে কেন্দ্র করে ঝটিকা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। গোপালগঞ্জ ও পটুয়াখালী এই দুই জেলাতেও নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সম্প্রতি ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করেছে বলে জানা গেছে।

গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই মিছিলগুলো সাধারণত খুব ভোরে বা জুমার নামাজের পরপরই হঠাৎ শুরু হয় এবং পুলিশ আসার আগেই ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব মিছিলের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও পুলিশ ভিডিও ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স সময়ের আলোকে বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত যেকোনো সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। সরকার ব্যবস্থা নেবে। দল হিসেবে বিএনপিও প্রতিরোধ করবে। 

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে তারা মাঠে নামছে তার কারণ খোঁজা হবে। কারও দুর্বলতা কিংবা শিথিলতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিএনপি নেতাকর্মীদের সতর্ক ও সজাগ থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কেন্দ্র থেকে।

এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এবার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় থাকার এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তবে জাতীয় সংসদের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রার্থী হওয়ার পথ বন্ধ হতে যাচ্ছে। কারণ কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ দলগুলোর নেতাকর্মীরা যাতে প্রার্থী হতে না পারেন সেজন্য নির্বাচনি আচরণ বিধিমালাগুলোতে নতুন বিধি যুক্তের প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়। 

প্রস্তাবিত ওই বিধি হচ্ছে, নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিষিদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই, এই মর্মে ইসির তৈরি করা অঙ্গীকারনামায় সই দিতে হবে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, অঙ্গীকারনামায় সঠিক তথ্য না দিলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে ইসির। এর ফলে পদধারী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ রয়েছে।

/এসএকে



  বিষয়:   ঝটিকা মিছিল  সরকার  অস্বস্তি  নেতা  রাজনীতি 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: