অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভিন্ন কৌশলের পরিকল্পনা করেছে সরকার। শুধু গতানুগতিকভাবে অপরাধী গ্রেফতার নয়, তাদের মূল শিকড় কেটে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এজন্য অপরাধীদের ‘লাইফলাইনে’ করা হবে কুঠারাঘাত।
অপরাধ করে অর্জিত সম্পদ যেন কোনোভাবেই ভোগ করতে না পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সেই সম্পদের সুবিধাভোগীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। অপরাধ করে প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ার পথও রুদ্ধ করা হবে।
অপরাধীদের গোপন সংযোগ এবং বিভিন্ন স্তরের অপরাধীদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। এর মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী, সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট পাচারকারী, মাদক কারবারি, হুন্ডি ব্যবসায়ী, মানব পাচারকারী, অস্ত্র কারবারিসহ অর্থ পাচারকারীদেরও তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে।
এসব কাজে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), পাসপোর্ট অধিদফতর ও ইমিগ্রেশনেরও সহযোগিতা নেওয়া হবে।
সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকগুলোতে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। করণীয় নির্ধারণে বিটিআরসি, পাসপোর্ট অধিদফতর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে যৌথ কর্মপরিকল্পনা করার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যেকোনো অপরাধের পেছনেই অবধারিতভাবে আর্থিক সুবিধা অর্জনের সংযোগ থাকে। সেই সঙ্গে অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা এককভাবে কোনো কিছু করতে পারে না।
এ জন্য তারা একটি নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকে। প্রচ্ছন্নভাবে থাকে এক বা একাধিক ‘গডফাদার’ বা আশ্রয়দাতাও। প্রায় সব অপরাধীরই পারিবারিক সংযোগ থাকে। অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ শুধু ব্যক্তি অপরাধীই ভোগ করেন না; অধিকাংশ সম্পদই তারা পরিবারের কারও না কারও নামে গড়ে তোলেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরাধীদের অর্থনৈতিক উৎস ধ্বংস করার জন্য আর্থিক ট্র্যাকিং, আইনি কঠোরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সমন্বিত সাঁড়াশি অভিযান প্রয়োজন।
এসব বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় নিয়ে কর্মপরিকল্পনা করছে সরকার। চিহ্নিত যেকোনো অপরাধীর ক্ষেত্রেই আগে থেকেই তার ব্যক্তিগত তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত থাকে। তবে এবার আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।
পুলিশ সদর দফতরের একাধিক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অপরাধীদের ‘লাইফলাইন’ কেটে দিতে পারলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে।
অপরাধীর আশ্রয়দাতা কিংবা অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের সুবিধাভোগীদেরও যদি আইনের আওতায় আনা যায়, তা হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।
উল্লেখ্য, অপরাধীদের ‘লাইফলাইন’ হলো তাদের অপরাধমূলক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার মূল চালিকাশক্তি, যার ওপর ভিত্তি করে তারা টিকে থাকে এবং কার্যক্রম পরিচালনা করে। যে মাধ্যমগুলো বন্ধ হয়ে গেলে একটি অপরাধী চক্র পুরোপুরি অচল বা পঙ্গু হয়ে পড়ে, সেগুলোই তাদের লাইফলাইন।
জানা যায়, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অপরাধের মূল উৎপাটনের জন্য ইতিমধ্যে বেশ কিছু কাজ শুরু করেছে। কিছু ক্ষেত্রে আইনের সংশোধন করা হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাড়ানো হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) ব্যবহার।
জানা যায়, অবৈধ জুয়া, ড্রাগ ডিলিং এবং হুন্ডির বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (বিকাশ, রকেট, নগদ) লেনদেনে কড়া ফায়ারওয়াল ও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেসিং করতে ডার্ক ওয়েব বা ক্রিপ্টো ওয়ালেটের মাধ্যমে অপরাধীদের আন্তর্জাতিক অর্থ আদান-প্রদান রুখতে সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষায়িত উইং যৌথভাবে কাজ করছে।
মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের মতো অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা জব্দ করতে দেশে নতুন ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ পাস করা হয়েছে, যা অপরাধীদের এই খাতের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অচল করতে সহায়তা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অপরাধীদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ, ব্যাংক হিসাব এবং অবৈধ লেনদেনের চ্যানেলগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ফ্রিজ বা জব্দ করা হবে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ইতিমধ্যে এই কার্যক্রম শুরু করেছে। দুর্নীতি ও অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত বেনামি সম্পত্তি ও জমি অধিগ্রহণ করা হবে।
অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ছিন্ন করতে তাদের ব্যবহৃত সিম, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেট গেটওয়ে ব্লক করে তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। অপরাধীরা ইন্টারনেটে যে গোপন প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে, সেখানে সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সির মাধ্যমে নজরদারি ও ব্লক করার কার্যক্রম চলছে।
ডিজিটাল কারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পাচার রোধে ব্লকচেইন অ্যানালাইসিস টুলস ব্যবহার করে অপরাধীদের ডিজিটাল ওয়ালেট ট্র্যাক ও জব্দ করা হবে। ইতিমধ্যে অনলাইন জুয়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে সরকার।
অপরাধীরা বিদেশে টাকা পাচার করলে তা শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট’ (এমএলএআর) বা পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি (এমএএলটি) অনুযায়ী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
/এসএকে