২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) তাদের নিজস্ব পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।
শুক্রবার (১২ জুন) সকাল ১১টায় রাজধানীর গুলশানের একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এই পর্যালোচনা প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন এবং মূল বাজেট পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমানসহ গবেষণা সেলের সব সদস্য।
সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়, এবারের বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দেশের সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১৩ থেকে ২৬ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধি পাওয়া অত্যন্ত ইতিবাচক। মোট সামাজিক সুরক্ষার ১০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ফ্যামিলি কার্ডে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া বাজেটের মূল ফোকাস রাখা হয়েছে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং করছাড়ের ওপর।
তবে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটলেও, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করে সিপিডি। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এবারের বাজেটে রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৫৪ শতাংশ। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, বরাবরই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ হয় না। ফলে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা বেশ কষ্টকর হবে। এছাড়া সরকারের ঋণের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ ক্রমান্বয়ে বাড়লে বাজারে তারল্য সংকট তৈরি হবে এবং সুদের হার বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে থোক বরাদ্দের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯৯৮.৪ শতাংশ, যা একটি অসম্ভব উল্লম্ফন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে খাদ্য সরবরাহ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে সিপিডি জানায়, এর জন্য বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতি প্রয়োজন। তবে বাজেটে কৃষিখাতে বরাদ্দ আগের তুলনায় ৫ শতাংশ কমেছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে চিন্তার বিষয়। সরকারের লক্ষ্য আগামী ১৮ মাসে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, যার জন্য প্রচুর বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা কতটা আস্থা পাচ্ছেন—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। অন্যদিকে, বাজেটে ডলার রেট বৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ দেওয়া হয়েছে, তার অর্থ হলো আগামীতে টাকার আরও অবমূল্যায়ন ঘটবে।
সিপিডি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, এবারের বাজেটে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর করের ভার বেশি পড়ছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় করমুক্ত আয়সীমা আরেকটু বাড়ানো দরকার ছিল। এছাড়া বাজেটে কালো টাকা ব্যবহারের সুযোগ রাখায় কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হয়নি।
দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ধীরগতি নিয়ে সিপিডি জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে ৯৯৬টি প্রকল্পের বয়স ৫-৭ বছর, ৩৩২টি প্রকল্পের বয়স ৬-১০ বছর এবং ৪৭টি প্রকল্পের বয়স ১০ বছরেরও বেশি হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকল্পগুলোর খরচও অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
পরিশেষে সিপিডি জানায়, বিদেশি ঋণ উদ্বেগজনক নয়, যদি তার সঠিক ব্যবহার করা যায়। বাজেটের আকার যা-ই হোক না কেন, দিনশেষে এটি কীভাবে সুচারুরূপে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে কি না— সেটাই এখন বড় ভাবনার বিষয়।
সময়ের আলো/আআ