বাজেট বাস্তবায়নের পথে অনেক কাঁটা

এসএম আলমগীর

অর্থনীতি

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছেন। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল এই

2026-06-14T01:50:44+00:00
2026-06-14T01:50:44+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
বাজেট বাস্তবায়নের পথে অনেক কাঁটা
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ১:৫০ এএম   (ভিজিট : ১০)
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছেন। ছবি : সময়ের আলো গ্রাফিক
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছেন। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল এই বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রস্তাবিত বাজেটের যেমন অনেক ভালো দিক রয়েছে, তেমনি ঝুঁকিও কম নয়। 

বাজেটে ৬০টির অধিক পণ্যের শুল্ক-কর কমানোয় সাধারণ মানুষের স্বস্তি মিলবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি বাড়াতে ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষায়ও বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে বাজেটে।

বিপরীতে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলোও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করাই এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, বাজেটের ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণ এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর মতো বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমান বিএনপি সরকার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় এসেছে। 

তাই এ সরকারের প্রতি দেশের মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষের সেই প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সরকার এমন একসময়ে বাজেট দিয়েছে, যখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর এবং অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকই নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে অন্য কোনো সরকার হলে হয়তো এত বড় বাজেট না দিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট বাজেট উপস্থাপন করত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষ স্বস্তি চায়। তাই জনগণকে স্বস্তি দিতে পারে- এমন অনেক বিষয়কে বাজেটে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সেদিক থেকে বললে এটি জনভিত্তি সম্প্রসারণের বাজেট। ভোক্তা, কৃষক, শ্রমিক, ছোট-বড় উদ্যোক্তা এবং নতুন উদ্যোক্তা- সবার জন্যই কিছু না কিছু রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে এই বিশাল বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা। সরকার হয়তো রাজস্ব বাড়ানোর জন্য করভিত্তি সম্প্রসারণ করতে চেয়েছে। কিন্তু নতুন বাজেটে নির্ধারিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা যে সহজে অর্জনযোগ্য নয়, তা যে কেউ বলবে। দেশের অর্থনীতির আকার বিবেচনায় বড় রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা থাকলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সেই সক্ষমতা এখনও দেখাতে পারেনি। 

সুতরাং এই বিশাল রাজস্ব আদায় করাই হবে সরকার ও এনবিআরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা লক্ষ্যমাত্রার কতটা কাছাকাছি যেতে পারে, সেটিই দেখার বিষয়।

মোয়াজ্জেম হোসেন আরও বলেন, এই বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঘাটতি পূরণে বিদেশি অর্থায়ন বেশি পাওয়া যাবে- এমন সম্ভাবনা কম। এ জন্য দেশীয় ঋণ ও সঞ্চয়পত্রের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে। এতে আবার দেশীয় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই এটিও সরকার কীভাবে সামাল দেয়, সেটি দেখার বিষয়। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এটি এ সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যমাত্রা হওয়া উচিত। মূল্যস্ফীতি কমানোও জরুরি, কিন্তু পারিপার্শ্বিক নানা কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে আরও বেড়ে যেতে পারে। আবার সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর ফলেও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সুতরাং বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সামনে পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেগুলো একসঙ্গে চাপ সৃষ্টি করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য পূরণ করা। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। সেখানে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় কীভাবে সম্ভব হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। 

যখন ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব এবং বিনিয়োগ কম, তখন এই বিপুল অর্থ কোথা থেকে আসবে- এটাই বাজেটের বড় ভাবনার বিষয়। এ ছাড়া জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সমপরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি পূরণেও সরকারকে বেগ পেতে হবে।

পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির টানাপোড়েন। বাজেটে সরকারের লক্ষ্য, প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামবে। অথচ বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। 

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি থাকবে ৮ দশমিক ৯ থেকে ৯ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে। তাই ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি একসঙ্গে অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। আবার প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ব্যয় বাড়ালে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কমাতে ব্যয় সংকোচন করলে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপও সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পদ্মা রেল প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধও শুরু হবে। এই চাপ সামাল দিতে আবার নতুন ঋণ নিতে হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের দায় বাজেট বাস্তবায়নে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করাও নতুন বাজেটের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে পোশাক খাত থেকে। কিন্তু গত ১০ মাসে রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ। গত তিন বছরে ৪০০টিরও বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতারা কম দামে পণ্য কিনতে চাইছেন, অথচ উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, ডলার সংকটও রয়েছে। ফলে প্রায় ৪ কোটি মানুষের জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই এবারের বাজেট শুধু বড় অঙ্কের হিসাব নয়, শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখারও লড়াই।

এবারের বাজেটের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এটি একটি ‘স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধিমুখী’ বাজেট। কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহল এর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। কারণ বাজেট বাস্তবায়নে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেবে। এতে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারে। 

আবার জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্প উৎপাদন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি উভয়ই বাড়বে। সরকারের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই, অথচ ব্যয়ের চাপ রয়েছে। ঋণ পরিশোধ করতে হবে, কিন্তু ডলার সংকট রয়েছে। শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হবে, অথচ জ্বালানির দাম বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে, আবার প্রবৃদ্ধিও ধরে রাখতে হবে। সব মিলিয়ে এবারের বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ব্যাংকিং খাত ও খেলাপি ঋণের সংকটও উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল খাতগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং খাত। সরকারি নথি অনুযায়ী খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৬ টাকা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এতে ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় হয়, নতুন ঋণ প্রদানে অনীহা তৈরি হয় এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের হার সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সরকার যখন ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করে, তখন বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যায়। ফলে সুদের হার বৃদ্ধি পায়, নতুন শিল্প বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যায়। বাংলাদেশের মতো বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়।

নতুন বাজেটের মূল্যায়নে আরেক অর্থনীতিবিদ এবং বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে বললে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সংস্কার ও প্রত্যাশার বাজেট বলা যায়। এর মধ্যে কল্যাণমূলক ব্যয়, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ইতিবাচক দিকনির্দেশনা রয়েছে। 

তবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, সীমিত রাজস্ব আয় এবং বড় সামাজিক ব্যয়ের সমন্বয় বাস্তবে অর্জন করা সহজ নয়। এই বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর। 

তবে মাত্র তিন মাসের নতুন সরকার হিসেবে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে ঝুঁকি থাকলেও এটিকে যথেষ্ট সাহসী উদ্যোগ বলতে হবে।’

সময়ের আলো/জেডি 





  বিষয়:   বাজেট  বাস্তবায়ন  কাঁটা  অর্থনীতি 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: