রাশিয়ার বৃহত্তম ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘এসবার’ ব্যাংকের শাখা ঢাকায় চালুর সব প্রক্রিয়া চার-পাঁচ বছর আগে শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এবার আবারও ঢাকায় এসবার ব্যাংকের শাখা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে রাশিয়া সফরে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান মস্কোতে এসবার ব্যাংকের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন।
মস্কোতে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, সফরকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসবার ব্যাংকের প্রথম ডেপুটি চেয়ারম্যান আলেকজান্ডার ভেদিয়াখিন এবং রাশিয়ার ফেডারেশন কাউন্সিলের ডেপুটি চেয়ারম্যান কনস্টানটিন কোসাচভের সঙ্গে বৈঠক করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উভয় পক্ষ একমত হয়েছে যে বাংলাদেশ-রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বর্তমান পরিমাণ সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম। রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও ওষুধ রফতানি বাড়ানোর সম্ভাবনার ওপর জোর দেন ড. খলিলুর রহমান। এ সময় আগামী সপ্তাহগুলোতে বাংলাদেশ থেকে একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলকে আতিথেয়তা দেওয়ার প্রস্তাবকে রুশ পক্ষ স্বাগত জানায়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের পেছনে ব্যক্তিগত পরিচয় ও দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কও ভূমিকা রেখেছে। প্রায় চার দশক আগে জাতিসংঘে কর্মরত অবস্থায় ড. খলিলুর রহমান ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের মধ্যে পরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। গত ৭ থেকে ৯ জুনের সফরে সে সম্পর্কের প্রতিফলন দেখা যায়। সফরকালে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
সদ্যসমাপ্ত এ সফরে জ্বালানি সহযোগিতা, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বাস্তবায়ন, জনশক্তি রফতানি এবং রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে জ্বালানি কিনতে আগ্রহী, আর রাশিয়াও বাংলাদেশে জ্বালানি রফতানিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে প্রধান বাধা অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা সুইফটের ওপর রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে অর্থ লেনদেন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিকল্প অর্থপ্রদানের পথ খুঁজছে উভয় দেশ।
এ প্রেক্ষাপটে আবারও এসবার ব্যাংকের শাখা ঢাকায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে সব প্রস্তুতি শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে উদ্যোগটি থেমে যায়। এবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। এসবার ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংকটির পক্ষ থেকেও নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এসবার ব্যাংকের শাখা চালু হলে ঢাকা-মস্কো অর্থনৈতিক সম্পর্কের গতি বাড়বে এবং রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি সহজ হতে পারে।
বেসরকারি ও স্বাধীন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী প্ল্যাটফর্ম ‘রাশিয়া পিভট টু এশিয়া’-তে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ’স গ্রোয়িং রোল ইন রাশিয়া’স পিভট টু এশিয়া স্ট্র্যাটেজি’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মস্কো সফর প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্কের কাঠামোগত ভিত্তি আরও শক্তিশালী হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন জ্বালানি, খাদ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, সংযোগ ও বহুমুখী কূটনৈতিক বিকল্প; অন্যদিকে রাশিয়ার প্রয়োজন ক্রমবর্ধমান বাজার, নির্ভরযোগ্য অংশীদার, বিকল্প আর্থিক পথ এবং এশিয়ার সঙ্গে গভীরতর সংযোগ। ফলে উভয় দেশের স্বার্থ ক্রমেই অভিন্ন হয়ে উঠছে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় কূটনৈতিক দক্ষতা প্রয়োজন। তবে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একক জোটের বদলে কৌশলগত ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করেছে এবং ভবিষ্যতেও সেই ধারা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে খলিলুর রহমানের মস্কো সফর কেবল একটি কূটনৈতিক সফর নয়; বরং রাশিয়ার এশিয়ামুখী কৌশল এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গতিশীল অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের উত্থানের বাস্তব প্রতিফলন। ফলে ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক ইতিহাসের পাশাপাশি অর্থনীতি, জ্বালানি, সংযোগ এবং বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার যৌক্তিক প্রয়োজন দ্বারা পরিচালিত হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি রাশিয়া। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় নতুন সভাপতিকে অভিনন্দন ও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। এ ছাড়া ওই নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রতি রাশিয়ার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিষয়টিও ছিল।
তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থিক লেনদেন সহজ নয়। এর আগে চীনের ব্যাংকের মাধ্যমে বিষয়টি সহজ করার চেষ্টা হলেও নানা কারণে তা সফল হয়নি। একইভাবে এসবার ব্যাংকের শাখা ঢাকায় স্থাপনের উদ্যোগও অনেক দূর এগিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। সে সময় ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন পিটার হাস এবং তিনি বিষয়টির অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন।
সময়ের আলো/জেডআই