বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আরোপিত শুল্ক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থামছেই না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একেকবার একেক ধরনের শুল্ক চাপিয়ে দিচ্ছে দেশগুলোর ওপর। সবশেষ গত সপ্তাহে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি রোধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে ৮৬টি দেশের পণ্যে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের ওপর আরোপিত এ শুল্ক ১০ শতাংশ।
এ শুল্ক আরোপের পর একটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে- তা হলে কি বাংলাদেশের পণ্য রফতানিতে জটিলতা আরও বাড়ল, শুল্ক হারও কি অনেক বেড়ে গেল। তবে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিযোগী দেশসহ অন্যান্য দেশের তুলনায় শুল্ক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বেশ সুবিধাজনক অবস্থাতেই আছে।
এ ছাড়া জোরপূর্বক শ্রম আদায়ের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা সরাসরি বাংলাদেশের ওপর নেই। তাই দেশের রফতানিকারক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই, বরং অন্যান্য দেশের চেয়ে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে বাংলাদেশ।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজা এক বার্তায় মার্কিন শুল্ক পরিস্থিতি নিয়ে একটি স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন। গতকাল সোমবার বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খানের কাছে পাঠানো এক বার্তায় গোলাম মোর্তোজা জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর প্রথমে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়, তারপর বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলাকালে তা কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করে।
আলোচনার পর সেটি কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। বাণিজ্যচুক্তিতে নির্ধারণ করা হয় ১৯ শতাংশ। এরপর শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালত রায় দেন। তারপর শুল্ক আরোপ করে ১০ শতাংশ। এখন আবার শুল্ক আরোপ করল ১০ শতাংশ।
শুল্কের বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে গোলাম মোর্তোজা বলেন, সবশেষ যুক্তরাষ্ট্র ৮৬টি দেশের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের কারণ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য সংক্রান্ত। বাংলাদেশ পণ্য প্রস্তুতের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে।
এর মধ্যে অনেক দেশে কাঁচামাল উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ আছে। বাংলাদেশের ওপর শুল্ক আরোপ সেই কারণে। সরাসরি জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদনের অভিযোগ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নেই। যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি করবে না বা কমানোর উদ্যোগ বা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তেমন ১৭টি দেশের ওপর শুল্ক হবে ১০ শতাংশ। এ তালিকায় বাংলাদেশ আছে। যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশের ওপর সবচেয়ে কম শুল্ক আরোপ করেছে, বাংলাদেশ তেমন একটি দেশ।
গোলাম মোর্তোজা বলেন, ‘কেউ বুঝে, কেউ না বুঝে এই ১০ শতাংশ শুল্ক নিয়ে অপতথ্য ছড়াচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রফতানির ওপর সব দেশের জন্য ১৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর আছে। বাণিজ্যচুক্তিতে যখন শুল্কহার ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখনও এই ১৫ শতাংশ কার্যকর ছিল। তার মানে, তখন মোট শুল্ক নির্ধারিত হতো ১৫+১৯=৩৪ শতাংশ। এখন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের জন্য মোট শুল্ক ১৫+১০=২৫ শতাংশ।
আরও পরিষ্কার করে বলি, প্রথমে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল ৩৭ শতাংশ। পরে কমিয়ে করে ৩৫ শতাংশ। আলোচনার পর নির্ধারণ করে ২০ শতাংশ। বাড়তি আলোচনার ফলে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় শুল্ক নির্ধারণ করা হয় ১৯ শতাংশ। এগুলোর কোনোটাই কার্যকর হবে না। সুতরাং এটি বলার কোনো সুযোগ নেই যে, বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের আদালত বাণিজ্যচুক্তিতে নির্ধারিত শুল্কহার নির্ধারণের বিরুদ্ধে রায় দেয়। ফলে চুক্তিতে নির্ধারিত শুল্কহার কার্যকর হয়নি। এরপর যুক্তরাষ্ট্র সাময়িক সময়ের (১৫০ দিন) জন্য ১০ শতাংশ শুল্প আরোপ করে। এ মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২৪ জুলাই। এদিন থেকেই আবার ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এখানে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ।
তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। চীন, থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামের জন্য মোট শুল্ক ১৫+১২.৫= ২৭.৫ শতাংশ। বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ কম শুল্কে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে।
গোলাম মোর্তোজা জানান, বাংলাদেশসহ চারটি দেশের জন্য বিশেষ সুবিধার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি থেকে তুলা এবং কাপড় আমদানি করে পোশাক তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করলে এ ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে না। এ সুযোগ পেতে পারে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। অল্প সময়ের মধ্যইে যা চূড়ান্ত হতে পারে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যদি এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ভিন্নমাত্রা পেতে পারে। বাংলাদেশ এ সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনায় ভারতের টেক্সটাইল ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এসবকিছু সম্ভব হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও নানাবিধ উদ্যোগের কারণে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশ দূতাবাস ধারাবাহিকভাবে ট্রাম্প প্রশাসন ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেছে। সর্বনিম্ন শুল্ক ও বিশেষ সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস সবসময় তৎপর ছিল। ফলে বাংলাদেশ এ সুবিধা পেয়েছে।
তুলনামূলক ‘সুবিধাজনক’ অবস্থায় বাংলাদেশ : ‘জোরপূর্বক শ্রমে’ উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পরও তুলনামূলক ‘সুবিধাজনক’ অবস্থানে থাকার কথা বলছে বাংলাদেশ সরকার ও উদ্যোক্তারা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক খাতে প্রধান প্রতিযোগীদের তুলনায় এ শুল্ক আড়াই শতাংশ কম হওয়াকে ‘বড় সুবিধা’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের তরফে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসার পর এক বিবৃতিতে এ প্রতিক্রিয়া দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গত শুক্রবার বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ যখন ১০ শতাংশ শুল্ক মোকাবিলা করছে, তখন চীন, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডের মতো অন্যান্য বৈশ্বিক পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিযোগীদের এই হার হবে সর্বোচ্চ সাড়ে ১২ শতাংশ। সুনির্দিষ্ট এই পার্থক্যের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উচ্চ শুল্ক আরোপিত প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের চলমান তুলনামূলক সুবিধাকে আরও জোরদার করছে।’
সরকার বলছে, ‘বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য মার্কিন তুলা ও বস্ত্র উপকরণ থেকে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে তিন বছর মেয়াদে শুল্ক ছাড়ের বিষয়ে ট্যারিফ-রেট কোটা (টিআরকিউ) প্রতিষ্ঠার বিষয় বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর ইউএসটিআর। এটি যখন বাস্তবায়ন হবে, তখন বাংলাদেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানির প্রসার করবে।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ওয়াশিংটন সময় গত ২৩ জুলাই মধ্যরাতের পর থেকে কার্যকর হওয়া এ শুল্কের হার সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১২ শতাংশ। এটি একই আইনের অধীনে এর আগে বিশ্বব্যাপী সাময়িকভাবে আরোপিত ১০ শতাংশ শুল্ককে প্রতিস্থাপন করছে।
পাল্টা বাণিজ্যচুক্তির অধীনে থাকা ১৮ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে নতুন শুল্ক যোগ হওয়ার কথা তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের উৎপাদিত সব পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হবে এই শুল্ক। সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওপর বর্তমানে আরোপিত শুল্কের সঙ্গে এটি যোগ হবে।
যা বলছেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা :
এদিকে দেশের রফতানিকারক ও ব্যবসায়ীরা জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে পাল্টা শুল্কের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশের পর নতুন এই ১০ শতাংশ শুল্ক বসায় মোট শুল্কহারে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তন আসবে না। বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে পাল্টা শুল্ক থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি ৪ শতাংশ বেড়ে ৯০৪ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছিল। তবে মার্কিন ইউএসটিআরের নতুন আরেকটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের মুখে থাকায় শুল্কের বাড়তি চাপ নিয়ে রফতানিকারকদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে।
এ বিষয়ে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘যেহেতু প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপরও বাড়তি শুল্কহার একইভাবে প্রযোজ্য হচ্ছে, সেহেতু তাৎক্ষণিকভাবে রফতানিতে নতুন প্রভাব পড়ার কারণ দেখছি না। তবে জোরপূর্বক শ্রমের অজুহাতে এই শুল্ক আরোপ করা একেবারেই অন্যায় ও অযৌক্তিক।
কারণ প্রথম কথা হচ্ছে- বাংলাদেশে কোনো জোরপূর্বক শ্রম আদায় করা হয় না। জোরপূর্বক শ্রম আদায় করা হয় এমন দেশ থেকে হয়তো পোশাকের কাঁচামাল আমদানি করা হয়, কিন্তু তার জন্য বাংলাদেশকে কেন শাস্তি পেতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত মার্কিন শুল্ক পরিস্থিতিতে যে অবস্থা তাতে বাংলাদেশ অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় ভালো অবস্থায় আছে। রফতানিকারক হিসাবে আমরা বিষয়টি নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন না।’
এদিকে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শুল্ক যদি বেশি না হয়, তা হলে দুশ্চিন্তার তেমন কিছু নেই। তবে ক্রেতারা ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য শুল্ক হিসাব করেই তৈরি পোশাকের দরকষাকষি করছে।
বিদেশি ক্রেতারা যদি বাংলাদেশের রফতানিকারকদের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে বেশি দরকষাকষি করে তা হলে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হতে পারে। ক্রেতারা পোশাকের দাম কমানোর জন্য চাপ দিতে পারে। এতে বাংলাদেশের পোশাকের রফতানি মূল্য কমে যেতে পারে। আর যদি বাংলাদেশের রফতানিকারকরা দাম না কমায় তা হলে ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যেতে পারে।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি