দীর্ঘদিনের স্থবিরতা, নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির খরা এবং কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত— এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে পুঁজিবাজারে একসঙ্গে বেশ কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যাদের পাওনা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত, তাদের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আগামী দুই বছরের মধ্যে অন্তত ১০টি ভালো কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে লেনদেন নিষ্পত্তির সময় কমানো, নতুন আর্থিক পণ্য চালু এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো আধুনিকায়নের পরিকল্পনাও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ডিএসইর এসব উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন। একদিকে দীর্ঘ সময় ধরে নতুন ভালো কোম্পানি বাজারে আসছে না, অন্যদিকে কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতায় হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর অর্থ আটকে আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাজারের নজরদারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন। এই বাস্তবতায় মঙ্গলবার রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসইর কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও একজন পরিচালক বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সামনে নেওয়া উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন।
প্রথম ধাপেই ১৭ হাজারের বেশি বিনিয়োগকারী : ডিএসইর পাঁচটি ব্রোকারেজ হাউজের ব্যর্থতায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ১৭ হাজার ৯২৫ জন। এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওনা রয়েছে এমন ১৭ হাজার ৩৩২ জন বিনিয়োগকারীকে তাদের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএসইর ইনভেস্টরস প্রটেকশন ফান্ড (আইপিএফ)। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে এ অর্থ পরিশোধ শুরু হবে।
ডিএসইর হিসাবে, এতে মোট ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর প্রায় ৯৭ শতাংশই তাদের পাওনা সম্পূর্ণ ফেরত পাবেন। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সর্বোচ্চ দুই মাস সময় লাগতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— মশিউর সিকিউরিটিজ, তামহা সিকিউরিটিজ, বানকো সিকিউরিটিজ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ ও সালতা সিকিউরিটিজ।
ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম জানান, ইতিমধ্যে আইপিএফ থেকে প্রায় ৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এবার ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওনাদারদের পুরো অর্থ পরিশোধ করা হবে। তবে এখানেই সমাধান শেষ হচ্ছে না।
৫ লাখ টাকার বেশি পাওনা রয়েছে এমন ৫৯৩ জন বিনিয়োগকারীর অর্থ আদায়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করার কথা জানিয়েছে ডিএসই। প্রয়োজনে ডিফল্টার প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ও পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করে অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে আইপিএফে জমা হওয়া অর্থ থেকেও এসব বিনিয়োগকারীর পাওনা পরিশোধের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন ডিএসই চেয়ারম্যান।
কেন এতদিন আটকে ছিল বিনিয়োগকারীদের অর্থ : ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকৃত দাবিদার শনাক্ত করা, প্রত্যেকের পাওনা নির্ধারণ এবং পরিশোধযোগ্য অর্থ হিসাব করতে প্রায় ১৭ হাজার হিসাব যাচাই করতে হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ডিএসই শুধু অর্থ ফেরতের উদ্যোগই নেয়নি, বরং অতীতে বাজার তদারকির দুর্বলতাগুলোও সামনে এসেছে। তিনি স্বীকার করেন, পুঁজিবাজারে ডিএসইর কার্যক্রমে অতীতে ঘাটতি ও ভুল ছিল। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব বিষয় প্রকাশ্যে আসার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগটি সেই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার একটি সূচনা।
যেভাবে আসবে আইপিএফে অর্থ : ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতে যে তহবিল ব্যবহার করা হচ্ছে, তার উৎস নিয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে ডিএসই। ডিএসই চেয়ারম্যান জানান, ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ট্রেড কমিশন থেকে প্রতি ছয় মাসে আইপিএফে অর্থ জমা হয়। এ ছাড়া তহবিলের অর্থ থেকে পাওয়া সুদও এর একটি উৎস। ২০২৫ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সুদের ২৫ শতাংশ আইপিএফে জমা দিয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা থাকলেও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন ও এর সদস্যরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে অর্থ ব্যবহারে সমর্থন দিয়েছে বলে জানান তিনি।
একদিকে ক্ষতিপূরণ, অন্যদিকে বাজারে নতুন কোম্পানির সংকট
বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে অর্থ ফেরতের উদ্যোগ যখন গুরুত্বপূর্ণ, তখন বাজারে প্রশ্ন উঠেছে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিয়ে। ডিএসইর চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দুই বছরের বেশি সময় ধরে ভালো কোনো আইপিও বাজারে আসেনি। নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রেও কার্যত স্থবিরতা রয়েছে।
এই পরিস্থিতি কাটাতে সরাসরি তালিকাভুক্তির পথকে গুরুত্ব দিচ্ছে ডিএসই। ২০২৭ সালের মধ্যে অন্তত ১০টি ভালো কোম্পানিকে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে বাজারে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্ভাব্য তালিকায় সরকারি, বহুজাতিক এবং দেশীয় কোম্পানিও থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে নতুন কোম্পানিকে বাজারে আনতে আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। ডিএসই জানিয়েছে, ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ডাইরেক্ট লিস্টিং বা আইপিওর জন্য আবেদন করা হলে লিস্টিং ফিতে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। বন্ড বাজারেও লিস্টিং ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের জন্য নতুন বিধিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করতে নতুন বিধিমালা তৈরির কাজও চলছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সেটি জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রকাশ করা হতে পারে।
বদলাচ্ছে লেনদেনের কাঠামো : শুধু কোম্পানি তালিকাভুক্ত করাই নয়, শেয়ার লেনদেন ও নিষ্পত্তির কাঠামোতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ রয়েছে। ডিএসইর এমডি নুজহাত আনোয়ার জানিয়েছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে টি+১ সেটেলমেন্ট এবং স্ক্রিপ্ট নেটিং চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে।
টি+১ ব্যবস্থা চালু হলে লেনদেন নিষ্পত্তির সময় বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় কমে আসবে। একই সঙ্গে স্ক্রিপ্ট নেটিং চালু হলে একই শেয়ার নিয়ে একই দিনে একাধিক লেনদেনের ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসবে। এ ছাড়া ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে আর্থিক ডেরিভেটিভস চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ডিএসই। তবে এর আগে বাজারসংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ, সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আলাদা প্ল্যাটফর্মে মিউচুয়াল ফান্ড : তালিকাভুক্ত ওপেন অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেনের জন্য পৃথক প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজও এগিয়ে নিচ্ছে ডিএসই। আগামী নভেম্বরের মধ্যে এটি চালুর আশা করা হচ্ছে। ডিএসইর এমডি জানান, বিদ্যমান বিধিবিধানের আওতায় প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে মিউচুয়াল ফান্ডে লেনদেনের জন্য বিনিয়োগকারীদের আলাদা একটি ব্যবস্থা পাওয়া যাবে।
বন্ড বাজারের ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় বাজারে লেনদেন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডিএসই জানিয়েছে, বন্ড লেনদেনের মূল্যসংক্রান্ত কাঠামোর ব্যয় প্রায় ৮০ শতাংশ কমানো হয়েছে। নতুন বন্ডগুলোকে মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত করতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে বাজারের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো আধুনিকায়নেও একাধিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ডিএসই জানিয়েছে, নতুন নাসডাক ট্রেড ম্যাচিং ইঞ্জিন স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ডিজাস্টার রিকভারি সিস্টেম হালনাগাদ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নজরদারি কতটা শক্তিশালী হলো : বাজারে আগের মতো অনিয়মের সুযোগ নেই দাবি করে ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, গত দুই-তিন বছরে সার্ভেইলেন্স সফটওয়্যার এবং ব্যাক-অফিস ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে বাজারে অনিয়ম করে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ আগের তুলনায় কমেছে। তবে একই সঙ্গে অতীতের ঘাটতির কথাও স্বীকার করেছেন তিনি। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাজারের দুর্বল জায়গাগুলো সামনে আসায় ডিএসই ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।
সমেয়র আলো/প্রিন্ট/কেএইচও