ছবি : সংগৃহীত ব্যাংকের মতো গ্রাহকদের স্থায়ী আমানত বা এফডিআর জমা রেখে প্রতি তিন মাস পরপর তাদের মুনাফা দিচ্ছে বেসরকারি জীবন বীমা কোম্পানি এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। ‘মাসিক মুনাফাযুক্ত স্বল্পমেয়াদি এককালীন প্রদান প্রিমিয়াম ইসলামিক বীমা পরিকল্প (পরিকল্প-২৫)’ নামে এ পলিসি ২০২৩ সাল থেকে কার্যকর থাকলেও বিষয়টি জানা নেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ)। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের পলিসি বিক্রির নিয়ম না থাকলেও তা থোড়াই কেয়ার করছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পর্ষদ। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত সিইওর বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু করার ক্ষমতা নেই বলেও দাবি করছেন অবলীলায়।
এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলছে, যথাযথ অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর খাত বিশ্লেষকদের মতে, কোম্পানিটির এ ধরনের পদক্ষেপ এখনই বন্ধ না করা গেলে তা বীমা খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।
কোম্পানিটির একজন সাবেক ‘অবলিখন’ কর্মকর্তার দাবি, গ্রাহকদের মাসিক ও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে দেওয়া অর্থ হিসাবের খাতায় সারভাইভাল বেনিফিট (এসবি) হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ অনুমোদিত বীমা পলিসিতে এভাবে প্রতি মাসে কিংবা তিন মাস পরপর এসবি দেওয়ার বিধান নেই। এ ক্ষেত্রে কোম্পানিটির ব্যাংক হিসাব, গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের বিবরণী এবং আইডিআরএর অনুমোদিত পলিসির নথি পরীক্ষা করলেই বিষয়টি বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করেন তিনি।
এনআরবি লাইফের প্রচারপত্র অনুযায়ী, পরিকল্প-২৫-এর আওতায় এককালীন প্রিমিয়াম জমা দিয়ে তিন, চার, পাঁচ ও ছয় বছরমেয়াদি পলিসি নেওয়া যায়। এতে সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত এককালীন প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পলিসি গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রবেশকালীন বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৬৭ বছরের মধ্যে। মেয়াদপূর্তির সময় গ্রাহকের বয়স ৭০ বছরের বেশি হওয়া যাবে না। প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, পরিকল্পটি ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর।
প্রতি লাখ টাকায় ত্রৈমাসিক অর্থ : প্রতিষ্ঠানটি প্রতি লাখ টাকা এককালীন প্রিমিয়ামের বিপরীতে বিভিন্ন মেয়াদে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুনাফা দেয় গ্রাহকদের। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, তিন বছরমেয়াদি পলিসিতে প্রতি তিন বছর পর ১ হাজার ৮০০ টাকা, চার, পাঁচ ও ছয় বছরের পলিসিতে যথাক্রমে ১ হাজার ৮৬০ টাকা, ১ হাজার ৯৫০ টাকা ও ২ হাজার ১০০ টাকা দেয় গ্রাহকদের। অর্থাৎ গ্রাহক এককালীন টাকা জমা দেওয়ার পর পলিসির মেয়াদ অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিরতিতে মুনাফা পাওয়ার সুযোগ পাবেন— প্রচারপত্রে এমন ব্যবস্থার বিবরণ রয়েছে। পলিসিটির নামেই ‘মাসিক মুনাফাযুক্ত’ কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এর সুবিধার তালিকায় ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুনাফা দেওয়ার হিসাব উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে প্রচারপত্রে মেয়াদপূর্তিতে এককালীন অর্থ গ্রহণের হিসাবও দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো গ্রাহক নিয়মিত সুবিধা গ্রহণ না করে মেয়াদ শেষে একসঙ্গে মুনাফাসহ অর্থ নিতে চাইলে প্রতি লাখ টাকা এককালীন প্রিমিয়ামের বিপরীতে তিন বছর মেয়াদে আনুমানিক ১ লাখ ২৩ হাজার, চার বছর মেয়াদে ১ লাখ ৩২ হাজার, পাঁচ বছর মেয়াদে ১ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ এবং ছয় বছর মেয়াদে ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা পেতে পারেন। তবে মুনাফার পরিমাণ লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে কমবেশিও হতে পারে বলে এতে উল্লেখ রয়েছে।
আবার পলিসির সঙ্গে অতিরিক্ত ঝুঁকি সুবিধা দেওয়ার বিপরীতে নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দেওয়ার বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পটিতে এককালীন প্রিমিয়াম, নিয়মিত অর্থপ্রাপ্তি, মেয়াদপূর্তিতে অর্থ গ্রহণ এবং অতিরিক্ত ঝুঁকি সুবিধার বিষয়গুলো একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
এসবির নামে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ : এনআরবি ইসলামিক লাইফের একজন সাবেক অবলিখন কর্মকর্তার অভিযোগ, কোম্পানিটি মাসিক কিংবা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে গ্রাহকদের যে অর্থ দিচ্ছে, তা হিসাবের খাতায় সারভাইভাল বেনিফিট হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তার দাবি, অনুমোদিত বীমা পলিসিতে এসবি দেওয়ার নির্দিষ্ট শর্ত ও সময়সীমা রয়েছে। কিন্তু পরিকল্প-২৫-এর আওতায় গ্রাহকদের নিয়মিত অর্থ দেওয়ার বিষয়টি সেই শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ওই সাবেক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত অনুমোদিত পলিসিতে দুই বা তিন বছর পর এসবি দেওয়ার বিধান থাকে। কিন্তু এনআরবি ইসলামিক লাইফের এই পরিকল্পে গ্রাহকদের প্রতি মাসে অথবা তিন মাস পরপর অর্থ দেওয়া হচ্ছে। তার দাবি, পলিসির আওতায় দেওয়া অর্থের হিসাব এসবি হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে নিয়মিত অর্থ দেওয়ার বিষয়টি হিসাবভুক্ত করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্র এবং কোম্পানির হিসাবের খাতায় অর্থ দেওয়ার বিবরণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সাবেক ওই কর্মকর্তা। একই সঙ্গে গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো অর্থের তারিখ ও পরিমাণের সঙ্গে হিসাবের তথ্য মিলিয়ে দেখার দাবিও তোলেন তিনি।
তার দাবি, কোম্পানিটির ব্যাংক স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করলেই গ্রাহকদের অর্থ দেওয়ার ধরন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। কোন গ্রাহককে কখন অর্থ দেওয়া হয়েছে, কত টাকা দেওয়া হয়েছে এবং সেই অর্থ কোন খাতে দেখানো হয়েছে— এসব তথ্য ব্যাংক লেনদেন ও কোম্পানির হিসাবের মধ্যে মিলিয়ে দেখা সম্ভব।
একাধিক গ্রাহককে অর্থ দেওয়ার দাবি : অডিও কথোপকথনে সাবেক ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, এ ধরনের পলিসির আওতায় এক-দুজন নয়, অনেক গ্রাহক নিয়মিত অর্থ পাচ্ছেন। কয়েকজন গ্রাহকের নামও উল্লেখ করেন তিনি। তাদের মধ্যে আবুল কালাম আজাদ, সৌদি আরবপ্রবাসী ডা. জুবায়ের এবং তাসলিমা আক্তার হ্যাপির নাম রয়েছে। এ ছাড়া মতিঝিলে কোম্পানিটির কার্যালয়-সংলগ্ন একটি ভবনের মালিকেরও এ ধরনের পলিসিতে এক কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে তার এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ দিতে না পারলেও গ্রাহকদের ব্যাংক স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হলে নিয়মিত অর্থ দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে দাবি করেন।
প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামে ১০০ টাকা আনতে ব্যয় ১৪৩ টাকা : এদিকে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম বর্ষের প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০ টাকা আয়ে ১৪৩ টাকা ব্যয় হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কোম্পানির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এনআরবি ইসলামিক লাইফের প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম আয় ছিল ২৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ২ লাখ টাকায়। এক বছরে আয় কমেছে ৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা বা প্রায় ২১ দশমিক ২৭ শতাংশ।
অন্যদিকে একই সময়ে কোম্পানির মোট ব্যবস্থাপনা ব্যয় ৩২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা থেকে কমে ২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। কিন্তু প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম আয় কমেছে তার চেয়ে বেশি হারে। ফলে প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে মোট ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের অনুপাত আরও বেড়েছে।
হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম আয়ের প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে মোট ব্যবস্থাপনা ব্যয় ছিল প্রায় ১৩৬ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪৩ টাকায়।
অনুমোদিত সীমার চেয়ে ৫১.২৯ শতাংশ বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয় : প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম আয়ের তুলনায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের উচ্চ অনুপাতের পাশাপাশি নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রমের বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করেছে। কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ-সংক্রান্ত তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে এনআরবি ইসলামিক লাইফ নির্ধারিত সীমার তুলনায় ৫১ দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৬৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত ব্যয়ের হার কমলেও কোম্পানিটি নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যয় নামিয়ে আনতে পারেনি।
এর আগে ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিন বছরে কোম্পানিটির ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের তথ্যও উঠে এসেছে আইডিআরএর গঠিত কমিটির প্রতিবেদন-সংক্রান্ত বিবরণে।
অনিয়মের বিষয়ে যা বলছেন খাত বিশ্লেষকরা : এনআরবি ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এসব অনিয়ম প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত দুর্বল করার পাশাপাশি, বীমা খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে বলে মনে করছেন দেশের বীমা বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্টের (বিআইপিডি) মহাপরিচালক কাজী মোহাম্মদ মর্তুজা আলীর মতে, অ্যাকচুয়ারিয়াল অনুমোদন ছাড়া কোনো কোম্পানি মনগড়া প্রোডাক্ট বিক্রি করলে সে কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদে টিকতে পারবে না। ফলে অদূর ভবিষ্যতে গ্রাহকের পাওনা দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হবে। এর ফলে পুরো বীমা খাতের ওপর মানুষের আস্থায় দারুণভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বীমা খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে যুক্তরাজ্য চার্টার্ড ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউটের এই সহযোগী সদস্যের মতে, কোনো কোম্পানি অনিয়ম করে বেশি কমিশন বা সাময়িক লাভ দেখালে অন্যান্য কোম্পানিও ভালো চর্চা বাদ দিয়ে মন্দ পথ অনুসরণেই উৎসাহিত হয়। তিনি বলেন, ‘মানুষ ভালোটা ফলো করে না, মন্দটা ফলো করে। এই মন্দ উদাহরণ ইন্ডাস্ট্রির জন্য ক্ষতিকর। অন্যরা উৎসাহিত হবে। কোনো ভেড়ার পালে একটা দুষ্টু ভেড়া থাকলে পুরো পালটাই নষ্ট হবে, খামারকে নষ্ট করে দেবে।’
তোয়াক্কা নেই এনআরবি ইসলামিক লাইফের : এনআরবি ইসলামিক লাইফের বিরুদ্ধে আইন ভেঙে এফডিআর সংগ্রহ ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহজামাল হাওলাদারের কাছে। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ‘এনআরবি লাইফের খবর আইডিআরএ জানে, মিডিয়া জানে, প্রশাসন জানে। এ নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। নিউজ করার অধিকার আপনার আছে। আপনি নিউজ করেন।’
তিনি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার না করলেও বলেন, ‘যদি আমার অনিয়ম থাকত তা হলে কি মিডিয়া, আইডিআরএ ও আইনি লড়াইয়ের পর বাংলাদেশে টিকে থাকতে পারতাম? আমি আদালতে গিয়েছি, হাই কোর্টের অর্ডার পেয়েছি।’
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির এসব অনিয়মের বিষয়ে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর কাছে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র সাদিক আল আরমান সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের অবস্থান পরিষ্কার, আমরা অনিয়মে বিরুদ্ধে। আমরা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। বীমা খাতের জন্য এবং দেশের অর্থনীতির জন্য খারাপ হবে, এমন কিছু যদি এনআরবি ইসলামিক লাইফ করে থাকে, তা হলে যথাযথ যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনিব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে