ছবি : সংগৃহীতদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা কিছুটা বাড়লেও কাটছে না অনিশ্চয়তা। একদিকে বাড়ছে শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ, অন্যদিকে কমছে বাজার মূলধন ও মূল্যসূচক। গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) দৈনিক গড় লেনদেন বেড়েছে ১৭ শতাংশের বেশি। অথচ একই সময়ে বাজার মূলধন কমেছে ৯২৩ কোটি টাকা। প্রধান মূল্যসূচকসহ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সূচকও ছিল নিম্নমুখী।
বাজারের এই বিপরীতমুখী প্রবণতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল আর্থিক হিসাব, জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ইতিবাচক বিনিয়োগ-উদ্দীপনার অভাব। ফলে দরপতনের সুযোগে কিছু শেয়ারে কেনার আগ্রহ তৈরি হলেও সামগ্রিক বাজারে আস্থার সংকট কাটছে না।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখন ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। বিশেষ করে কোম্পানির আর্থিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে তারা শেয়ার ধরে রাখার পরিবর্তে বিক্রি করে অপেক্ষার কৌশল নিচ্ছেন। তবে বাজারে দরপতনের মধ্যে কম দামে শেয়ার কেনার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এ দুই বিপরীতমুখী আচরণের কারণে লেনদেন বাড়লেও সূচক ও বাজার মূলধনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে না।
দুর্বল আর্থিক ফলাফল বাড়াচ্ছে বিক্রির চাপ
বাজারে নেতিবাচক মনোভাব তৈরির অন্যতম কারণ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক হিসাব। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত অনেক কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে প্রত্যাশা অনুযায়ী আয় ও মুনাফার চিত্র পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির কারণে উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিগুলোর মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। কোনো কোম্পানির আয় ও মুনাফা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই সেই কোম্পানির ভবিষ্যৎ লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা এবং শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়। ফলে দুর্বল আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করা কোম্পানির শেয়ারে বিক্রির চাপ বাড়ে।
সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণেও কোম্পানিগুলোর প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল আর্থিক ফলাফলকে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে বাজারে বিক্রির চাপ বাড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহ
বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত শুধু কোম্পানির আর্থিক ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয়ের চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতাও বিনিয়োগকারীদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে বাজারে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোর প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
বড় মূলধনি শেয়ারে দরপতনের প্রভাব
গত সপ্তাহে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স কমেছে ৪ দশমিক ৪০ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। আগের সপ্তাহেও সূচকটি কমেছিল ৩৩ দশমিক ১৯ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ।
অন্যদিকে বাছাই করা ভালো কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক কমেছে ১৮ দশমিক ২৩ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ। আগের সপ্তাহে সূচকটি কমেছিল ১৬ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৭৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রধান সূচকের তুলনায় ডিএসই-৩০ সূচকের পতন বেশি। এটি বড় ও নির্বাচিত কোম্পানির শেয়ারে দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, ইসলামী ব্যাংক, গ্রামীণফোন, ব্র্যাক ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মতো বড় কোম্পানির শেয়ারের দরপতন ডিএসইএক্সের নিম্নমুখী অবস্থানে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩০ পয়েন্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিপরীতে মতিন স্পিনিং, এনভয় টেক্সটাইল, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, বিএসআরএম স্টিলস ও পূবালী ব্যাংকের শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি সূচকের পতন কিছুটা ঠেকিয়েছে।
দরপতনের সুযোগে বেড়েছে লেনদেন
গত সপ্তাহে ডিএসইতে প্রতিদিন গড়ে ৫২৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহে প্রতিদিন গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪৫০ কোটি ৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ দৈনিক গড় লেনদেন বেড়েছে ৭৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা বা ১৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
বাজারের এই লেনদেন বৃদ্ধির পেছনে দরপতনের সুযোগে কিছু শেয়ার কেনার প্রবণতা ভূমিকা রেখেছে বলে বাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে দরপতনের কারণে অনেক শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় কিছু বিনিয়োগকারী তুলনামূলক কম দামে শেয়ার কেনার সুযোগ নিয়েছেন। তবে এই কেনাকাটা বাজারের সামগ্রিক প্রবণতা পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয়।
তা ছাড়া দৈনিক গড় লেনদেন ৫২৬ কোটি টাকায় উন্নীত হলেও দেশের অর্থনীতির আকার ও শেয়ারবাজারের সক্ষমতার তুলনায় তা এখনও সীমিত। ফলে একটি গতিশীল ও টেকসই শেয়ারবাজারের জন্য লেনদেনের পরিমাণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
দাম বাড়া কোম্পানি বেশি, তবু কমেছে বাজার মূলধন
গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৭৮টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে ১৬৩টির। অপরিবর্তিত ছিল ৪৪টির দাম। অর্থাৎ দাম কমার তুলনায় বাড়ার তালিকায় প্রতিষ্ঠান ছিল ১৫টি বেশি। তারপরও ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৯২৩ কোটি টাকা।
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে যা ছিল ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা।
বাজার মূলধন কমার পেছনে বড় মূলধনি কোম্পানির শেয়ারের মূল্য পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ বাজার মূলধন হিসাব করা হয় কোম্পানির শেয়ারের বাজারদর ও মোট শেয়ারের সংখ্যার ভিত্তিতে। ফলে অল্প কয়েকটি বড় কোম্পানির শেয়ারের দরপতনও সামগ্রিক বাজার মূলধনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি