তৃতীয় বিশ্বের শাসক সংকট ও সুশাসনের অন্তরায়

সাইফুল ইসলাম

বিজনেস

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় সংকট বিশ্লেষণ করলে একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে আসে— এখানে দারিদ্র্য কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; বরং এটি

2026-11-06T15:43:43+00:00
2026-11-06T15:43:43+00:00
 
  শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
বিজনেস
দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ও বিপুল জনসংখ্যা
তৃতীয় বিশ্বের শাসক সংকট ও সুশাসনের অন্তরায়
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৩:৪৩ পিএম 
দারিদ্র্য কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিফলন। সংগৃহীত ছবি
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় সংকট বিশ্লেষণ করলে একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে আসে— এখানে দারিদ্র্য কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; বরং এটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিফলন। বিপুল জনসংখ্যা, সীমিত সম্পদ, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বেকারত্ব, বৈষম্য এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন মিলে এমন এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যেখানে রাষ্ট্রের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা প্রায়ই বাস্তবতার কাছে বাধাগ্রস্ত হয়। শাসকেরা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন, নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং অবকাঠামো নির্মাণ করেন। কিন্তু এসব উদ্যোগের সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনে কতটা পৌঁছায়, সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র অর্থনীতির একটি বহুল আলোচিত ধারণা। অর্থনীতিবিদ রাগনার নার্কসে দেখিয়েছেন, দরিদ্র দেশগুলোতে নিম্ন আয়, কম সঞ্চয়, স্বল্প বিনিয়োগ ও কম উৎপাদনশীলতা পরস্পরকে প্রভাবিত করে দারিদ্র্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। একজন মানুষের আয় কম হলে তার সঞ্চয়ের পরিমাণও কম থাকে। সঞ্চয় কম হওয়ায় বিনিয়োগের সক্ষমতা তৈরি হয় না। বিনিয়োগের অভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়ে না, আর উৎপাদনশীলতা না বাড়ায় আয়ও বৃদ্ধি পায় না। এভাবে দারিদ্র্য নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার উপাদান নিজেই তৈরি করে। ব্যক্তিপর্যায়ে কার্যকর এই চক্র জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও অনেকাংশে প্রযোজ্য।

তবে তৃতীয় বিশ্বের সংকটকে শুধু অর্থনীতির এই তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। কারণ, এসব দেশে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, অসম ভূমিব্যবস্থা, সম্পদের বৈষম্যমূলক বণ্টন, দুর্বল শিল্পভিত্তি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। অনেক দেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও তাদের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। ফলে রাষ্ট্রের প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকের সেবক না হয়ে ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে ওঠার পরিবর্তে তৈরি হয়েছে দূরত্ব।

তৃতীয় বিশ্বের শাসকদের জন্য বিপুল জনসংখ্যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে জনসংখ্যা নিজে কোনো দেশের জন্য অভিশাপ নয়। বরং একটি দক্ষ, শিক্ষিত, সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হতে পারে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু জনসংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, খাদ্যনিরাপত্তা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার সক্ষমতা অপর্যাপ্ত হলে এই জনসংখ্যাই রাষ্ট্রের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

মূল সমস্যা জনসংখ্যার আকারে যতটা, তার চেয়ে বেশি রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায়। একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু নাগরিকের সংখ্যা গণনা করা নয়; বরং প্রত্যেকের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের ন্যূনতম সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেও কাজ পান না। বাড়তে থাকে শিক্ষিত বেকারত্ব, সম্প্রসারিত হয় অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার, কমে যায় মজুরি এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নেয় সামাজিক অসন্তোষ। একপর্যায়ে রাষ্ট্র উন্নয়নের ধারক না হয়ে সংকট মোকাবিলার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

এখানেই তৃতীয় বিশ্বের শাসক সংকটের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্র পরিচালনাকে জনকল্যাণের দায়িত্ব হিসেবে না দেখে ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল হিসেবে বিবেচনা করে। জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা আয়বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রকল্প, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ক্ষমতার বলয় সম্প্রসারণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ফলে রাষ্ট্রের সম্পদ নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার উপকরণ না হয়ে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এই প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয় পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতি। যখন যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয়, দক্ষতার চেয়ে আনুগত্য এবং জনস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থ বেশি গুরুত্ব পায়, তখন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি নিয়োগ, উন্নয়ন বরাদ্দ, ব্যবসায়িক সুযোগ এমনকি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক না থেকে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়। এভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে সুশাসনের ভিত্তি।

সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান শর্ত হলো আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, জনগণের অংশগ্রহণ, ন্যায়বিচার এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টন। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে এসব শর্ত বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।

দুর্নীতি কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির ওপরও আঘাত হানে। যখন একজন নাগরিক সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরিপ্রার্থী বঞ্চিত হন কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে আইনের প্রয়োগ অসহায় হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। আর রাষ্ট্রের প্রতি এই আস্থাহীনতাই সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক।

দারিদ্র্য ও দুর্নীতির মধ্যকার সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি উন্নয়নের অর্থনৈতিক সুফলকে একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে। সরকারি প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়, কাজের মান কমে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়ম ঘটে এবং দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য সুবিধা মাঝপথেই হারিয়ে যায়। ফলে দারিদ্র্য দূরীকরণে বরাদ্দ করা অর্থের পুরোটা সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায় না।

অন্যদিকে দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষকে অনেক সময় দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার কাছে অসহায় করে তোলে। এভাবে দারিদ্র্য দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় এবং দুর্নীতি আবার দারিদ্র্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

তৃতীয় বিশ্বের আরেকটি বড় সংকট হলো রাষ্ট্রীয় সম্পদের অসম বণ্টন। জাতীয় আয় বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধির সুফল যদি সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে না পৌঁছায়, তাহলে তা মানুষের জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে পারে না।

একদিকে অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, অন্যদিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, চিকিৎসার ব্যয়, আবাসন সংকট ও শিক্ষার খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই বৈপরীত্য সমাজে অর্থনৈতিক অসন্তোষের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতাও তৈরি করে। ফলে উন্নয়নের পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার ব্যবধান বাড়তে থাকে।

বিশ্বায়নের যুগে তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রীয় সংকট আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ঋণ, বৈদেশিক বাণিজ্যের অসম শর্ত, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা দরিদ্র দেশগুলোর নীতিনির্ধারণের সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে।

ঋণের সুদ পরিশোধ, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সামাল দিতে গিয়ে অনেক দেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারে না। তবে বৈশ্বিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, অপচয় ও নীতিগত ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা শাসকগোষ্ঠীরই দায়িত্ব।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব বিষয় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিপুল জনসংখ্যা ও সীমিত ভূখণ্ড নিয়েও দেশটি খাদ্য উৎপাদন, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার এবং দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয়, কৃষির উৎপাদনশীলতা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অবদান দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি রয়েছে কর্মসংস্থানের গুণগত সংকট, শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্য, আয়বৈষম্য, নগরায়ণের চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ঘাটতি।

শহরগুলোতে জনসংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে নাগরিক সেবা সম্প্রসারিত হচ্ছে না। শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু তাঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে জনসংখ্যাগত সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রে জনসংখ্যাগত চাপে রূপ নিচ্ছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শন কী? উন্নয়ন কি শুধু সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, উড়ালসড়ক কিংবা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের নাম, নাকি এর প্রকৃত অর্থ মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন?

একজন নাগরিকের আয় বাড়ছে কি না, তার সন্তান মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন কি না, চাকরি কিংবা ব্যবসার ক্ষেত্রে ন্যায্য সুযোগ পাচ্ছেন কি না এবং অধিকার রক্ষায় আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন নিহিত।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। তবে মানবিক উন্নয়ন ছাড়া তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নে পরিণত হতে পারে না।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন জনসংখ্যাকে বোঝা হিসেবে নয়, উৎপাদনশীল সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। এ জন্য মানসম্মত ও কর্মমুখী শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া, নারীর কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং তরুণদের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভরশীল কর্মসংস্থান নীতির মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংসদ, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে সরকারি অর্থের ব্যবহার ও ব্যয়ের প্রতিটি পর্যায় জনগণের কাছে ব্যাখ্যাযোগ্য হয়।

তৃতীয়ত, উন্নয়নের সুফল ন্যায্যভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। কার্যকর করব্যবস্থা, সম্পদের ওপর ন্যায়সংগত কর আরোপ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

পাশাপাশি গ্রাম ও শহরের উন্নয়নবৈষম্য কমাতে হবে। রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ননীতি অব্যাহত থাকলে একদিকে মহানগরগুলো জনসংখ্যার চাপে বিপর্যস্ত হবে, অন্যদিকে প্রান্তিক অঞ্চলগুলো উন্নয়নের সুযোগ ও সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত থাকবে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, আর শাসকেরা জনগণের অর্পিত দায়িত্ব পালনকারী মাত্র।

এই উপলব্ধি প্রতিষ্ঠিত না হলে উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সংস্কার কিংবা দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনতে পারবে না।

গণতন্ত্রের শক্তি কেবল নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত ভিত্তি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, বিরোধী পক্ষের অধিকার নিশ্চিত করা, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পরিবর্তনের ব্যবস্থা বজায় রাখা।

পরিশেষে বলা যায়, তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য ও জনসংখ্যার সংকট মূলত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সুশাসনের সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিপুল জনসংখ্যা কোনো রাষ্ট্রের অনিবার্য দুর্ভাগ্য নয়, একইভাবে দারিদ্র্যও কোনো জাতির চিরস্থায়ী নিয়তি হতে পারে না। সঠিক পরিকল্পনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকলে জনসংখ্যাই হয়ে উঠতে পারে উন্নয়নের প্রধান শক্তি।

কিন্তু শাসকেরা যদি জনগণকে নাগরিকের পরিবর্তে কেবল ভোটার, করদাতা কিংবা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র আরও শক্তিশালী হবে।

একটি রাষ্ট্র কত বড় সেতু নির্মাণ করল, কত কিলোমিটার সড়ক তৈরি করল কিংবা জাতীয় আয় কত শতাংশ বাড়ল—শুধু এসব সূচক দিয়ে তার সাফল্যের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দরিদ্র নাগরিকের জীবনে কতটা নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে পেরেছে তার ওপর।

কারণ রাষ্ট্রের উন্নয়ন মানে কেবল কিছু মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি নয়; বরং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনকে অর্থবহ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা। যে রাষ্ট্র তার জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারে না, সে রাষ্ট্র জনসংখ্যার চাপে নুয়ে পড়ে। আর যে শাসক জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে শেখেন না, তার হাতে সুশাসন কখনোই প্রতিষ্ঠিত হয় না।

সময়ের আলো/ইউএমএইচ



  বিষয়:   তৃতীয় বিশ্ব  সুশাসন  শাসক সংকট 


Advertisement
Loading...
Loading...
বিজনেস- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: