বৈশ্বিক বাণিজ্যে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্থান মূলত রফতানি আয়ের ওপর ভিত্তি করে। দেশের প্রধান রফতানি খাত পোশাক, টেক্সটাইল, ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে নেপথ্যের চালিকাশক্তি রাসায়নিক বা কেমিক্যাল খাত।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, রফতানিমুখী শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হওয়ার পরও অভ্যন্তরীণ কেমিক্যাল বা রাসায়নিক পণ্য খাতটি আজ নানা জটিল সংকট ও সীমাবদ্ধতার জালে আটকে পড়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকরী পথনকশা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। শনিবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মিলনায়তনে এই সংকট ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে ‘রাসায়নিক নির্ভর রফতানিমুখী শিল্পে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক এক সেমিনারে এই দাবি জানান তারা।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদের সভাপতিত্বে সেমিনারের নির্ধারিত বক্তৃতায় পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউল হক, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি এম. মোসাদ্দেক হোসেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের (ডিজিডিএ) পরিচালক ড. মো. আক্তার হোসেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের পরিচালক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ইয়াসমিন নাহার জলি, বাংলাদেশ এগ্রো-কেমিক্যাল ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দ্বিতীয় সচিব (শুল্ক, রফতানি ও বন্ড) সুরাইয়া সুলতানা, বিজিএমইএর পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ, বিকেএমইএর পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান এবং ডাইস্টার সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেডের কান্ট্রি ম্যানেজার মো. মাজাহারুল ইসলাম সুমন প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ উল্লেখ করেন, দেশের রফতানিখাতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় রাসায়নিক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে সক্ষমতা বাড়াতে একটি কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়ন কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত বাধ্যবাধকতা।
রাসায়নিক শিল্পের মূল ভিত্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও সুসংগঠিত লজিস্টিক অবকাঠামো। কিন্তু দেশের বর্তমান বাস্তবতায় শিল্পকারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে কেমিক্যাল কারখানাগুলোর উৎপাদন প্রায়শই ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি লজিস্টিক অবকাঠামোর দুর্বলতা, যেমন- বন্দরগুলোতে কনটেইনার জট, দক্ষ পরিবহনের অভাব এবং বিশেষায়িত রাসায়নিক সংরক্ষণের জন্য আধুনিক ওয়্যারহাউস বা ডিপো না থাকা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
সেমিনারে ব্যবসায়ী নেতা, নীতি নির্ধারক ও খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা একত্রিত হয়ে রাসায়নিক পণ্যের বিদ্যমান সমস্যা ও তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সেমিনারে বক্তারা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক খাতের বাজারের আকার প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার এবং এটি প্রতি বছর গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজারে এই বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনও বহুলাংশে পিছিয়ে। ফলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিমাত্রায় আমদানি নির্ভরতার ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালেই বাংলাদেশ প্রায় ৬২০ কোটি ডলারের রাসায়নিক পণ্য আমদানি করেছে, যার বড় একটি অংশ ব্যবহৃত হয়েছে পোশাক, চামড়া ও ওষুধ শিল্পে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এস আর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ রাব্বানী। ঢাকা চেম্বারের সেমিনারে আলোচনায় উঠে আসে যে, খাতটির ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ থমকে থাকার পেছনে অন্যতম প্রধান বাধা হলো আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর চড়া ও জটিল শুল্ক কাঠামো। স্থানীয়ভাবে কেমিক্যাল বা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সামগ্রী তৈরি করতে যে মূল বা প্রাথমিক উপাদানগুলো আমদানি করতে হয়, সেগুলোর ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করা থাকে।
এর ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা বিদেশি তৈরি কেমিক্যালের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না। সরকারি সেবা ও লাইসেন্সপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা এই খাতের অগ্রযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
সেমিনারে বিএপিআই ও ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা জানান, পরিবেশ অধিদফতর, বিস্ফোরক পরিদফতর ও এনবিআর থেকে অনুমোদন ও লাইসেন্স সংগ্রহ করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। বিশেষ করে ওষুধ খাতের এপিআই (অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) পার্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে সরকারি অবকাঠামোগত সহায়তার
শিথিলতার কারণে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
এ ছাড়া শিল্প খাত ও দেশের শিক্ষা বা গবেষণা খাতের মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব রয়েছে। রাসায়নিক শিল্প একটি অত্যন্ত প্রযুক্তি ও বিজ্ঞাননির্ভর খাত। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) প্রতিনিধিরা সেমিনারে জোর দিয়ে বলেন, গবেষণা খাতের উদ্ভাবন ও কেমিক্যাল ফর্মুলা ইন্ডাস্ট্রি পর্যায়ে ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে রাসায়নিক পণ্যের আন্তর্জাতিক মান বা স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার ক্ষেত্রেও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। ডিসিসিআইর সেমিনারে উঠে আসা সুপারিশ অনুযায়ী, এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে সর্বাগ্রে সরকারের একটি স্পষ্ট ও কার্যকর ‘জাতীয় কেমিক্যাল রোডম্যাপ’ প্রণয়ন করা অপরিহার্য।
একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কহার সহজীকরণ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, বন্ড সুবিধা জোরদার এবং অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে সব অনুমোদন দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে। সেমিনারে এনবিআর ও পরিবেশ অধিদফতরের প্রতিনিধিরা শুল্ক ছাড় ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল বর্জনের বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস প্রদান করেন। রাসায়নিক খাতের এই সংকট দূর করা সম্ভব হলে তা কেবল এই খাতকেই সমৃদ্ধ করবে না, বরং সামগ্রিক রফতানি খাতকে বৈশ্বিক বাজারে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও স্বাবলম্বী করে তুলবে।
সময়ের আলো/এসএকে