কাগজের হিসাবের বাইরে ছিল সিগারেট বিক্রির বড় একটি অংশ। আর সেই গোপন লেনদেনের তথ্য মিলেছে মোবাইল ফোনের চ্যাট ও হিসাবের ছবিতে। গাজীপুরের ভার্গো টোব্যাকো লিমিটেডে অভিযান চালিয়ে জব্দ করা তিনটি মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রায় সাড়ে ৭২ কোটি টাকার ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকির প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় অভিযান চালায় অধিদফতরের ঢাকার প্রিভেন্টিভ টিম। একই সঙ্গে কারখানার কাছাকাছি একটি গুদামেও তল্লাশি চালানো হয়। অভিযানে বিভিন্ন নথিপত্র, ব্যবহৃত স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল, সিগারেট উৎপাদনের কাঁচামাল এবং তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অভিযানের এসব তথ্য প্রকাশ করে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।
অধিদফতর জানায়, অভিযানের সময় কারখানার প্রধান ফটক বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। তবে ভেতরে উৎপাদন কার্যক্রম চলছিল। কর্মকর্তারা গেট খোলার জন্য একাধিকবার আহ্বান জানালেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে দেয়াল টপকে গোয়েন্দা দলের সদস্যরা কারখানার ভেতরে প্রবেশ করেন।
ভেতরে গিয়ে কর্মকর্তারা সিগারেট উৎপাদনের কার্যক্রম দেখতে পান। একপর্যায়ে কারখানা চত্বরে ধোঁয়া দেখতে পেয়ে সেখানে গেলে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল এবং নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট পোড়ানোর বিষয়টি নজরে আসে।
এসব সিগারেট ও ব্যান্ডরোল পোড়ানোর অনুমোদন-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা তা দেখাতে পারেননি। বিভাগীয় কর্মকর্তার অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে তারা জানান।
পরে প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার লিখিত বক্তব্যে আনুমানিক ৫০ লাখ শলাকা নকল ব্যান্ডরোলযুক্ত সিগারেট পোড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পোড়া ব্যান্ডরোলের অবশিষ্টাংশও জব্দ করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
অভিযানে কারখানা, সংলগ্ন গুদাম ও আবাসিক ভবনে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় ব্যবহৃত স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল, সিগারেট তৈরির বিভিন্ন কাঁচামাল এবং তিনটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। বিদেশি কয়েকটি ব্র্যান্ডের সিগারেটের নমুনা ও খালি প্যাকেটও পাওয়া যায়। এসব বিষয়েও তদন্ত চলছে।
ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে জব্দ করা মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে। আইটি ও সাইবার ফরেনসিক টিম মোবাইলগুলোর চ্যাট হিস্ট্রি, বিক্রয়-সংক্রান্ত গোপন বার্তা এবং হিসাবের ছবি পরীক্ষা করে।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি বৈধ স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যবহৃত স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল দিয়েও সিগারেট উৎপাদন ও বাজারজাত করছিল— এমন প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
অধিদফতরের ভাষ্য, উৎপাদিত সিগারেটের একটি বড় অংশ ভ্যাট চালান ছাড়াই বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে। এসব বিক্রির তথ্য মূল হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছিল বলেও প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
জব্দ করা পণ্য, নথি ও ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতে করা প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সরকারের প্রাপ্য ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাবদ প্রায় সাড়ে ৭২ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা