বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে পোশাক খাতে বাড়ছে ব্যয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন সচল রাখতে বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে পোশাক কারখানাগুলো। এতে এক দিকে উৎপাদন

2026-09-16T03:27:12+00:00
2026-09-16T03:27:12+00:00
 
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি
বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে পোশাক খাতে বাড়ছে ব্যয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:২৭ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন সচল রাখতে বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে পোশাক কারখানাগুলো। এতে এক দিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ছে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে করা জরিপে প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে অতিরিক্ত খরচের কথা জানিয়েছে। ফলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি পোশাক খাতের পরিচালন ব্যয় ও আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। 

মঙ্গলবার বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) মোট সক্রিয় সদস্য কারখানার প্রায় ২০ শতাংশের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি একটি প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে পোশাকশিল্পের এই সংকটচিত্র উঠে এসেছে। 

তথ্যানুযায়ী উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলো। এ সংকটের প্রভাব পড়ছে নিট, ডাইং ও গার্মেন্টস— তিন ধরনের উৎপাদন কার্যক্রমেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণ হিসেবে প্রায় ৯০ শতাংশ কারখানা মালিক বিদ্যুৎ সংকটের কথা জানিয়েছেন। গ্যাস সংকটের কথা বলেছেন প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং অন্যান্য সংকটের কথা জানিয়েছেন প্রায় ১৪ শতাংশ।  এদিকে গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। 

গ্যাসের চাপ সংক্রান্ত (পিএসআই) তথ্য দেওয়া কারখানাগুলোর হিসাবে, স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় বর্তমানে গড়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। লোডশেডিংয়ের তথ্য দেওয়া কারখানাগুলো জানিয়েছে, আগের তুলনায় বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় গড়ে প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় বিভ্রাটের সময় প্রায় তিনগুণ হয়েছে। এতে উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্যাস-বিদ্যুতের এই সংকট উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে। ফলে নিট উৎপাদন গড়ে প্রায় ৩৭—৩৮ শতাংশ, ডাইং উৎপাদনে প্রায় ৫১ শতাংশ আর গার্মেন্টস উৎপাদনে প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এতে ক্রেতার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য তৈরি ও সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় চাপ তৈরি হয়েছে।

বিকল্প জ্বালানিতে বাড়ছে ব্যয় : 

সংকট মোকাবিলায় কারখানাগুলোকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের দিকে যেতে হচ্ছে। কিন্তু এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ। প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানা জানিয়েছে, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে তাদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে। শ্রমিক ও মেশিন অলস থাকায় বাড়ছে ক্ষতির পরিমাণ। বিদ্যুৎ বা গ্যাস না থাকায় শ্রমিকরা কাজে উপস্থিত থাকলেও উৎপাদন চালু রাখতে না পারলে শ্রম ব্যয় বহাল থাকে। মেশিন বন্ধ থাকলেও কারখানার অনেক স্থায়ী ব্যয় কমে না। ফলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়ছে। অর্থাৎ জ্বালানি সরবরাহ কমলেও রফতানি আদেশ, শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকঋণ এবং কারখানার অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহনের পরেও সচল রাখতে হচ্ছে উৎপাদন। এতে বাড়তি ব্যয়ের ফলে কারখানার মুনাফার অংশ বহুলাংশে কমিয়ে দিচ্ছে।

শিপমেন্ট বিপর্যয়ে বাড়ছে ক্রেতা হারানোর শঙ্কা : 

গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অন্যতম বড় সমস্যা হলো সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারা। প্রায় ৮৭ শতাংশ কারখানা মালিক পণ্য সরবরাহে বিলম্বের কথা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক পোশাকবাজারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উৎপাদন ব্যাহত হলে কারখানার পক্ষে ক্রেতার নির্ধারিত সময়সূচি বজায় রাখা কঠিন হয়। এতে ক্রেতার আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর প্রভাব শুধু একটি চালান বা একটি ক্রয়াদেশে সীমাবদ্ধ থাকে না। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতা ভবিষ্যতে অন্য সরবরাহকারীর দিকে যেতে পারেন। ফলে উৎপাদন সংকট দীর্ঘায়িত হলে রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

আংশিক বন্ধ হচ্ছে উৎপাদন, কোথাও পুরোপুরি : 

প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ৭৮ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন আংশিক বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কারখানাগুলো কিছু ইউনিট চালু রাখছে, কিছু শিফট কমিয়ে দিচ্ছে বা সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। অন্যদিকে প্রায় ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হলে কারখানার আয় বন্ধ হয়ে যায় অথচ শ্রমিকের মজুরি, ঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের মতো অনেক দায় বহাল থাকে।


এই সংকটের কারণে প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানাকে ক্রেতাদের মূল্যছাড় দিতে বাধ্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সরবরাহে বিলম্ব এবং ক্রেতার সময়সূচি রক্ষা করতে না পারার পরিস্থিতিতে মূল্যছাড় দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া প্রায় ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা রফতানি আদেশ বাতিল বা কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। 

ব্যাংকঋণ পরিশোধেও তৈরি হচ্ছে ঝুঁকি : 

কারখানাগুলো সাধারণত উৎপাদন, কাঁচামাল সংগ্রহ, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের জন্য ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে। উৎপাদন কমে গেলে এবং রফতানি আদেশে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে নগদ অর্থপ্রবাহ দুর্বল হতে পারে। তখন ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য আর্থিক দায় পরিশোধে চাপ বাড়ে। প্রতিবেদনে প্রায় ৫৯ শতাংশ কারখানা ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকির কথা জানিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু উৎপাদন শিল্পের সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং ব্যাংক খাতের ঋণমাণের ওপর এর প্রভাব ফেলবে।

সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি : 

জ্বালানির সংকটের এমন পরিস্থিতিতে একমাত্র নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহই পারে শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল রাখার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি অব্যহত রাখতে। এ ক্ষেত্রে লোডশেডিংয়ের সময়সূচি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, গ্যাসচাপের ঘাটতি কমানো এবং শিল্পাঞ্চলভিত্তিক সংকটের দ্রুত সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। 

তাদের মতে, ব্যবসায়িক ক্ষতি কমাতে কারখানাগুলোর উৎপাদন পরিকল্পনা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক দায় পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখাও জরুরি। একই সঙ্গে রফতানি আদেশ ও ক্রেতার আস্থা বজায় রাখতে সময়মতো পণ্য সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতির উন্নতি না হলে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া, ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং রফতানি প্রতিযোগিতায় চাপ আরও বাড়তে পারে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   বিকল্প জ্বালানি  ব্যবহার  পোশাক খাত  ব্যয় 


Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: