কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকজন প্রধান। প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে তাদের সতর্কবার্তার পর সোমবার বিশ্বজুড়ে এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সম্প্রতি এক দীর্ঘ প্রবন্ধে এআই মডেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি কমানোর আহ্বান জানান। এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি এ আহ্বান জানান। এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানও আমোদেইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন।
অল্টম্যান জানিয়েছেন, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে এ বছর ওপেনএআই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছে না।
এই সতর্কবার্তার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে। যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক-১০০ সূচক দিনের শুরুতে ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে ছয় সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। পরে দরপতন কিছুটা কমলেও সূচকটি ০ দশমিক ৪ শতাংশ নিচে ছিল।
এআই খাতের উত্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে। ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক কমেছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। এনভিডিয়ার শেয়ার ৩ শতাংশ, এএমডি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মাইক্রনের শেয়ার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে।
চিপ সরঞ্জাম নির্মাতা ল্যাম রিসার্চ ও অ্যাপ্লায়েড ম্যাটেরিয়ালস এবং প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান ব্লুম এনার্জির শেয়ারও ৬ শতাংশের বেশি কমেছে।
ইউরোপেও প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের পতন হয়েছে। সেখানে প্রযুক্তি সূচক ২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। চিপ নির্মাতা এএসএমএলের শেয়ার ৬ শতাংশ কমার পাশাপাশি ইনফিনিয়ন ও সিমেন্স এনার্জির শেয়ারেও বড় দরপতন হয়েছে। এশিয়ায় সফটব্যাংকের শেয়ার ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি) ও এসকে হাইনিক্সের শেয়ারও কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে বিনিয়োগের গতি কমে গেলে এর প্রভাব অর্থনীতির পাশাপাশি শেয়ারবাজারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতেও পড়তে পারে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের উত্থানের পেছনে এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। অ্যানথ্রপিকের এক গবেষক এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পদত্যাগ করেন। এরপর প্রতিষ্ঠানটি একটি প্রতিবেদনে জানায়, তাদের ক্লড এআই মডেল অস্ত্র তৈরি, সাইবার হামলা, নজরদারি ও প্রতারণাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
আমোদেই সতর্ক করে বলেছেন, আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে এআই এজেন্ট পুরো ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারে এবং এর ফলে শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। অল্টম্যানও এআইয়ের কারণে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ার ঝুঁকিকে গুরুতর বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে সবাই এ সতর্কবার্তাকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের আগে মার্কিন আবাসনবাজারের পতনের পূর্বাভাস দিয়ে পরিচিত বিনিয়োগকারী মাইকেল বারি এ সতর্কবার্তাকে ‘অতিরঞ্জিত প্রচারণা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি থাকায় উন্নয়নের গতি কমার সম্ভাবনা কম। ডয়চে ব্যাংকের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কোম্পানি ও দেশগুলোর মধ্যে এআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এগিয়ে যাওয়ার সময় কোনো প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় পিছিয়ে যাবে— এমনটা কল্পনা করা কঠিন।
এদিকে এআই খাতে প্রতিযোগিতা আরও বাড়ছে। তুলনামূলক কম খরচের চীনা এআই মডেল কিমি কে৩, আলিবাবার কুয়েন ও ডিপসিকের মতো প্রযুক্তি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের ওপর চাপ তৈরি করছে। এর মধ্যেই অ্যানথ্রপিক আগামী মাসে শেয়ারবাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এনভিডিয়া প্রতিষ্ঠানটির বড় বিনিয়োগকারী হওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছে।
সময়ের আলো/কেএইচ