বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ইলিশ বাণিজ্যের চিরচেনা চিত্র এবার যেন পুরোপুরি উল্টে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের অন্যতম বড় বিদেশি বাজার ছিল ভারত। বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলিশ রফতানি করা হতো। তবে, এবার দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে উল্টো ভারত থেকেই বাংলাদেশে ইলিশ আসছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির মৎস্য ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুমাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ রফতানি হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তুতিও রয়েছে।
চলতি বছর বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দামের ওপরও। বর্তমানে এক কেজি বা তার বেশি ওজনের পদ্মার ইলিশ বাংলাদেশে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। এই সংকটের কারণে কিছু বাংলাদেশি ব্যবসায়ী প্রচলিত বাণিজ্যপথের বাইরে গিয়ে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করছেন।
ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা ইলিশের বড় একটি অংশ সংগ্রহ করা হয়েছে গুজরাট থেকে এবং ভরুচ বন্দর দিয়ে পাঠানো হয়েছে। কিছু চালান পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া পাইকারি মাছবাজার হয়েও বাংলাদেশে এসেছে। হাওড়া হোলসেল ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ জানিয়েছেন, এবারই প্রথম বাংলাদেশ ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করছে। সাধারণত পশ্চিমবঙ্গ থেকে বোয়াল, রুই, পারসে ও ট্যাংরা মাছ বাংলাদেশে রফতানি করা হয়।
গুজরাটের ইলিশে প্রচুর ডিম বা রো থাকায় ভারতের বাজারে এসব মাছের চাহিদা তুলনামূলক কম। বিপরীতে বাংলাদেশে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ডিমভরা ইলিশের চাহিদা অনেক বেশি। এ কারণে গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। মাকসুদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ইলিশের ডিম আলাদাভাবেও বিক্রি করা হচ্ছে। পরে তা প্রক্রিয়াজাত করে অন্য দেশেও পুনরায় রফতানি করা হচ্ছে।
তবে শুধু গুজরাট থেকেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের ডায়মন্ড হারবার ও কোলাঘাট থেকেও মাঝারি আকারের ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া, গুজরাট ও মুম্বাই থেকেও কিছু চালান এসেছে।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে গত দুমাসে অন্তত ৪৫০ টন ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। রোববারও প্রায় ১০ টন ইলিশ নিয়ে দুটি চালান এই স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। শুরুতে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এসব চালানের বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করতে কিছুটা অনিচ্ছুক ছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ রফতানির খবর প্রকাশ্যে এলে বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রফতানির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
কিছু রফতানিকারক প্রথমদিকে দাবি করেছিলেন, ইলিশ রফতানির কোড ব্যবহার করে পাঠানো চালানে সামুদ্রিক মাছ থাকতে পারে। পরে পেট্রাপোলের ল্যান্ড পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং কাস্টমসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, ভারত থেকে বাংলাদেশে সত্যিই ইলিশ রফতানি হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মৎস্য আমদানিকারক সমিতির সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদও।
মৎস্য ব্যবসায়ীদের মতে, সীমান্তের দুপাশেই ইলিশের সংকট এই অস্বাভাবিক বাণিজ্যের অন্যতম কারণ। অনিয়মিত বাতাস ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মাছ ধরায় ব্যাঘাত ঘটেছে। ফলে, ইলিশের আহরণ কমার পাশাপাশি জেলেদেরও লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে।
এক ভারতীয় রফতানিকারকের দাবি, বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা আরব সাগর ও নর্মদা নদীর মোহনা থেকে পাওয়া ইলিশ সংগ্রহ করছেন। এসব মাছ দেখতে ভালো হলেও মিঠাপানির ইলিশের মতো স্বাদ নয়। তবে, পদ্মার ইলিশের তুলনায় দাম কম এবং বাংলাদেশের বাজারে সরবরাহ সংকট থাকায় ব্যবসায়ীরা এসব মাছ আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ যাওয়ার এই উল্টো স্রোত এবার দুর্গাপূজাকে ঘিরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রফতানি হবে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। গত বছর বাংলাদেশ ভারতকে ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতে পৌঁছায় মাত্র ১৪৩ দশমিক ৮০ টন। এর আগের দুবছরেও ভারতে ইলিশ আমদানির পরিমাণ ৬০০ টনের নিচে ছিল। মূলত বেশি দামের কারণে ভারতীয় আমদানিকারকেরা অনেক চালান নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন।
এবার কলকাতার মাছ আমদানিকারকেরা বাংলাদেশকে আবার ইলিশ রফতানি শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। শহরভিত্তিক একটি সংগঠন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে আবেদন করেছে। বাংলাদেশি মাছ ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের অনুরোধ জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে, তারেক রহমানের সরকার এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি।
সময়ের আলো/মহু