মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও খুলছে— এমন আশার কথা শোনা গেলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। বরং কবে নাগাদ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু হবে, নির্বাচিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কীভাবে কাজ করবে, কর্মীদের কত খরচ হবে— এসব মৌলিক প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি।
মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সরাসরি নির্বাচিত করা এবং আরও ৩১২টি এজেন্সিকে অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার কথা জানানো হলেও এ বিষয়ে এখনও কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা বা কর্মপদ্ধতির রূপরেখা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে শ্রমবাজার খোলার নতুন আশার মধ্যেও ঘুরেফিরে হতাশাই বিরাজ করছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গত ২৮ আগস্ট এক বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা জিরো কস্টে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ।
ফ্যাসিবাদী আমলের দুর্নীতি, দুঃশাসন, সিন্ডিকেট ও অনিয়মের কারণে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আবারও উন্মুক্ত হচ্ছে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়। বিমান ভাড়াসহ সব ধরনের অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই এই কর্মীদের প্রথম বহর সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মধ্য দিয়ে শ্রমবাজারটি পুনরায় চালু হবে বলে জানায় মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গত ছয় মাস ধরে বাংলাদেশ সরকারের ধারাবাহিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ বিবেচনায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে এই বিশেষ সুযোগ দিয়েছে। দেশটির মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সরাসরি নির্বাচিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থানকে সম্মান জানিয়ে আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বোয়েসেলও যথারীতি এই প্রক্রিয়ায় কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।
বিদ্যমান নিয়মতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও একযোগে বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সির মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগকে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছে মন্ত্রণালয়। এজেন্সি যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি সম্পন্ন করেছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের যৌথ কমিটি।
অতীতে এ ধরনের স্বচ্ছ ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ের কোনো নজির ছিল না বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এই বাছাই প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের ন্যূনতম কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আগামী ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হলে নতুন সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়।
তবে মন্ত্রণালয়ের এমন আশাবাদের পরও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে স্বস্তি ফিরছে না। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে জিরো কস্টে নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে— এ তথ্য সঠিক। তবে এটি নিয়মিত নিয়োগব্যবস্থা নয়। কারণ, বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ওই কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
অন্যদিকে ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সরাসরি নির্বাচিত এবং আরও ৩১২টি এজেন্সিকে অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি হিসেবে কর্মী পাঠানোর জন্য মালয়েশিয়া সরকার নির্বাচিত করলেও বাংলাদেশে নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ২ হাজার ৫শর বেশি। এত বিপুলসংখ্যক এজেন্সির মধ্য থেকে অল্প কয়েকটি এজেন্সি নির্বাচনের বিষয়টি আবারও সিন্ডিকেটের আশঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তার ওপর নির্বাচিত এজেন্সিগুলো কীভাবে কাজ করবে, কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া কী হবে এবং ব্যয়ের কাঠামো কেমন হবে— সেসবও এখন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়নি। এতে সম্ভাব্য কর্মীদের মধ্যেও আগ্রহের বদলে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
এর মধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বাংলাদেশের একজন প্রতিমন্ত্রী বক্তব্য দেওয়ার পরদিনই মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী তা প্রত্যাখ্যান করার ঘটনাও অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।
জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রার যুগ্ম মহাসচিব ও রিক্রুটিং এজেন্সিজ ঐক্য পরিষদের সভাপতি এম টিপু সুলতান দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, আগেও আমরা ১ হাজার ৪০০ রিক্রুটিং এজেন্সির নাম এফডব্লিউসিএমএসে (মালয়েশিয়া সরকারের একটি অনলাইনভিত্তিক কেন্দ্রীয় বৈদেশিক কর্মী ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা) পেয়েছি। কিন্তু কাজ করেছে মাত্র ২৫ জন। এবারও ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সরাসরি নির্বাচিত এবং আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি হিসেবে কর্মী পাঠানোর জন্য মালয়েশিয়া নির্বাচিত করেছে। ফলে এখানে নতুন কিছু নেই। পুরোনো জিনিসকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে হাজির করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই যে বায়রার সবাই সমানভাবে কাজ করার সুযোগ পাক। এই সুযোগ সীমিত করা হলে রাষ্ট্রেরই ক্ষতি। এজেন্সি নির্বাচিত করা হয়েছে কিন্তু রূপরেখা প্রকাশ করা হয়নি। এখন পর্যন্ত যা হয়েছে তা স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড না। এই বাজার নিয়ে নতুন কোনো বার্তা নেই। এতে সবার মধ্যেই অসন্তোষ বিরাজ করছে। আমরা চাই এই বাজার চালু হোক।’
অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, মূলত দুর্নীতির কারণেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ রয়েছে। দুর্নীতি নির্মূল না করে আবার এই শ্রমবাজার চালু করা হলে তা ফের মুখ থুবড়ে পড়বে।
তিনি বলেন, গত ৬-৭ মাসে বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু এই শ্রমবাজার নিয়ে যে দুর্নীতি রয়েছে, তা সবাই অনেক দিন ধরে জানে এবং এর সঙ্গে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্টতার কথাও জানা। পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং সেখানকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জড়িত। সেই জায়গায় যদি বাংলাদেশ চাপ দিতে না পারে অর্থাৎ দুর্নীতি নির্মূল করতে না পারে, তা হলে অতীতের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
মালয়েশিয়া মূলত বিদেশ থেকে দুই ধরনের কর্মী সংগ্রহ করে। এর একটি হচ্ছে কম দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী, যা কলিং ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট নামে পরিচিত। অন্যটি দক্ষ কর্মী, যার জন্য এমপ্লয়মেন্ট পাস বা ইপি ভিসা দেওয়া হয়। মালয়েশিয়া সরকার তাদের দেশে প্রবাসী কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে, যা গত জুন থেকে কার্যকর হয়েছে।
মালয়েশিয়া মূলত অতীতের মতো বিশাল আকারে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করতে চায় না। দেশটির সরকার স্থানীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দিতে এবং বিদেশি কর্মীর অনুপাত কমাতে চায়। এ জন্য ২০৩৫ সাল নাগাদ বিদেশি কর্মী নিয়োগ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি এবং সে অনুযায়ী কাজ করছে।
মালয়েশিয়া মূলত বিশ্বের প্রায় ১৫টি দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার (২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী) থেকে বেশি কর্মী নিয়োগ করা হয়। দেশটি মূলত প্ল্যানটেশন (পাম অয়েল), উৎপাদন, সার্ভিস ও ট্যুরিজম এবং কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে