দাম বাড়ানোর পরও বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। রাজধানীর বিভিন্ন মুদি দোকানে চাহিদার তুলনায় কম তেল সরবরাহের অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আটা ও ময়দার বাড়তি দাম। ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বেকারি পণ্যে। একই সময়ে ডিম, মুরগি ও সবজির দামও বাড়তি থাকায় চাপে পড়েছে সাধারণ মানুষের বাজারের বাজেট।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
রাজধানীর মিরপুর সাড়ে ১১ কাঁচাবাজারের মুদি দোকানি হুমায়ুন বলেন, অর্ডার দেওয়ার পরও কোম্পানির কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে তার দোকানে কোনো বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। ফলে তেল কিনতে এসে অনেক ক্রেতাকেই খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে।
আরেক দোকানি বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ না থাকলেও ব্যবসায়ীদের জন্য লাভের পরিমাণও খুব কম। এক লিটার সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকায় কিনে ১৯৯ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে অন্যান্য খরচ বাদ দিলে তেমন লাভ থাকে না। এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী তেল বিক্রি করতেও আগ্রহ হারাচ্ছেন।
দাম বাড়লেও কাটেনি সংকট
সম্প্রতি বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়ানোর অনুমোদন দেয় সরকার। ব্যবসায়ীরা ১০ টাকা বৃদ্ধির দাবি জানালেও সরকার শেষ পর্যন্ত ৫ টাকা দাম বাড়ানোর অনুমতি দেয়।
এরপর গত ২ সেপ্টেম্বর কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৯৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করে। তবে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অর্ডার দেওয়ার পর সরবরাহ পেতে কয়েক দিন সময় লাগছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় কম পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে দোকানিদেরও বিক্রিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
বাড়তি দামে আটা-ময়দা
তেলের সংকটের মধ্যেই বাজারে বেড়েছে আটা ও ময়দার দাম। বিশেষ করে ময়দার দাম বাড়ায় এর প্রভাব পড়ছে বেকারি শিল্পে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির পাউরুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার বিশ্লেষণের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি খোলা আটা ৪৮ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে এর সর্বনিম্ন দাম ছিল ৪৫ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আটার দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ।
খোলা ময়দার দামও আগের তুলনায় বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি খোলা ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। আর প্যাকেটজাত ময়দার দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বিদ্যুতের বাড়তি দাম, গ্যাস সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে আটা-ময়দার দাম বাড়ছে। এসব বাড়তি খরচের প্রভাব পড়ছে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পণ্যের দামেও।
বাড়ছে বেকারি পণ্যের দাম
আটা-ময়দার এই দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেকারি শিল্পে। বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি জানিয়েছে, শনিবার থেকে বিভিন্ন ধরনের বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয় করা হবে। কোনো কোনো পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সংগঠনটির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বেকারি পণ্যের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো পণ্যের দাম বাড়ানো হবে, আবার কোনো ক্ষেত্রে দাম অপরিবর্তিত রেখে ওজন কমিয়ে সমন্বয় করা হবে। তিনি বলেন, একটি রুটির দাম যদি ১০ টাকা থাকে, সেটি হয়তো ১০ টাকাই থাকবে। তবে আগে ৪০০ গ্রাম ওজনের রুটি থাকলে সেটি কমিয়ে ৩৫০ গ্রাম বা ৩২০ গ্রাম করা হতে পারে।
জালাল উদ্দিনের দাবি, তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আগে ২৫ হাজার টাকায় যে পরিমাণ তেল কেনা যেত, এখন সেই পরিমাণ তেল কিনতে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এবং অন্যান্য উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে পণ্যের দাম সমন্বয় করা ছাড়া ব্যবসায়ীদের সামনে আর কোনো পথ নেই।
ডিম-মুরগিতেও স্বস্তি নেই
তেল ও আটা-ময়দার পাশাপাশি ডিম ও মুরগির বাজারেও স্বস্তি ফেরেনি। রাজধানীর শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার ও কাঁঠালবাগান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা দরে।
ব্রয়লার মুরগির দামও রয়েছে বাড়তি। বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতাদের দাবি, অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত গরমের কারণে বিভিন্ন খামারে ডিমপাড়া মুরগি ও ব্রয়লার মুরগি মারা গেছে। পরে অনেক খামারি নতুন করে মুরগি পালন শুরু করেননি। সাম্প্রতিক লোডশেডিং পরিস্থিতির কারণেও অনেক খামারে উৎপাদন কমেছে। এসব কারণে ডিম ও মুরগির সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে এবং দামও কমছে না।
অস্বস্তি সবজির বাজারেও
এদিকে সবজির বাজারেও দাম আগের মতোই চড়া। এদিন বাজারে প্রতি কেজি লম্বা বেগুন ৭০ টাকা এবং গোল বেগুন ১০০ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা যায়। এছাড়া করলা ও বরবটি প্রতি কেজি ৮০ টাকা, হাইব্রিড শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং দেশি শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, শিম প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, টমেটো প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং পটোল, ঢ্যাঁড়স ও কাঁকরোলসহ কয়েক ধরনের সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। সবচেয়ে কম দামি সবজি পেঁপে, যা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা দরে।
মাছ কিনতেও বাড়তি খরচ
নিত্যপণ্যের পাশাপাশি মাছের বাজারেও দাম কমেনি। বর্তমানে তেলাপিয়া প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। রুই ও কাতলার দাম পড়ছে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। চিংড়ি আকার ও মানভেদে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাবদা মাছের দামও ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি।
চাপে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ
শেওড়াপাড়া বাজারে কথা হয় ক্রেতা শরিফুদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষের আমিষের চাহিদা মেটানোর অন্যতম মাধ্যম ডিম ও মুরগি। কিন্তু এই দুই পণ্যের দাম এখনো বাড়তি। এর সঙ্গে তেল, আটা ও ময়দার দামও বেড়েছে।
তার মতে, চাল, ডালসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচও কমছে না। ফলে একই আয় দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজারে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
সব মিলিয়ে, সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পরও সরবরাহ সংকট পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যে আটা-ময়দার বাড়তি দাম এবং বেকারি পণ্যের মূল্য সমন্বয়ের ঘোষণা সাধারণ মানুষের ব্যয়ের চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ডিম, মুরগি, সবজি ও মাছের বাজারেও স্বস্তি না থাকায় নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরার অপেক্ষাই এখন ভোক্তাদের।
সময়ের আলো/এমকে