সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে মূলধন ঘাটতি

জাহিদুল ইসলাম

অর্থনীতি

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণের চাপ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে

2026-09-11T01:22:14+00:00
2026-09-11T01:22:14+00:00
 
  শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি
সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে মূলধন ঘাটতি
জাহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:২২ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণের চাপ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় ব্যাংকগুলোর ঘাটতিও বাড়ছে। খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রয়োজনীয় মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। খেলাপি ঋণের ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং এমন মূলধন ঘাটতি দেশের অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করবে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

শ্রেণিকৃত ঋণ ৬ লাখ ও মূলধন ঘাটতি সোয়া দুই লাখ কোটি ছাড়িয়েছে : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী জুন ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মার্চ ২০২৬ শেষে ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সমস্যাগ্রস্ত। সাধারণত খেলাপি ঋণ যত বাড়ে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ততবেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রভিশন না থাকলে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকগুলো বাস্তবে প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে প্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ফলে প্রয়োজনীয় এবং প্রকৃত প্রভিশনের মধ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

অর্থাৎ প্রয়োজনীয় প্রভিশনের অর্ধেকের কিছু বেশি ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যে সংরক্ষণ করতে পেরেছে। বাকি বিপুল অর্থ সংরক্ষণ করতে হলে ব্যাংকগুলোর মুনাফা থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সরিয়ে রাখতে হবে। যেসব ব্যাংকের আয় কম কিংবা মূলধন ইতিমধ্যে দুর্বল, তাদের জন্য এই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

বড় ঘাটতিতে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক : প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেই প্রভিশন ঘাটতির বড় অংশ কেন্দ্রীভূত। এ শ্রেণির ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশন প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার ২০৪ কোটি টাকা, বিপরীতে প্রকৃত প্রভিশন প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। গত মার্চ শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৩১০ কোটি টাকা।

এটি মোট প্রভিশন ঘাটতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। ফলে বেসরকারি ব্যাংক খাতের ওপর সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি এবং আয় তুলনামূলকভাবে কম, তাদের জন্য ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেও বড় ধাক্কা : অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট শ্রেণিকৃত ঋণ প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকার বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৭৪ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। মার্চ ২০২৬ শেষে এই ঘাটতি ছিল ৭৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এই আর্থিক দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারের কাছ থেকে অর্থ দেওয়ার প্রয়োজন হলে তা রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করবে।

উদ্বেগজনক পরিস্থিতি কয়েকটি ব্যাংকে : প্রতিবেদনের ব্যাংকভিত্তিক তথ্যেও বড় ধরনের বৈষম্য দেখা যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি প্রায় ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের ঘাটতি প্রায় ১০ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা।

বেসরকারি খাতেও কয়েকটি ব্যাংকের ঘাটতি উল্লেখযোগ্য রকমের। প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ঘাটতি প্রায় ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। আর ন্যাশনাল ব্যাংকে ঘাটতির পরিমাণ ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর এই ঘাটতি তাদের ভবিষ্যৎ আয়, মুনাফা, লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা এবং মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

প্রভিশন ঘাটতি কেন উদ্বেগজনক : ব্যাংক যখন কোনো ঋণ দেয়, তখন ধরে নেওয়া হয় যে ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মূল টাকা ও সুদ-মুনাফা পরিশোধ করবেন। কিন্তু কোনো ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় ব্যাংককে আয় থেকে একটি নির্দিষ্ট অর্থ আলাদা করে রাখতে হয়। এটিই প্রভিশন।

ধরা যাক, একটি ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকার ঋণের বড় অংশ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেল। ভবিষ্যতে ওই অর্থ ফেরত না এলে ব্যাংক যাতে হঠাৎ বড় লোকসানে না পড়ে, সে জন্য আগেই হিসাব করে অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। প্রয়োজনীয় প্রভিশন না রাখলে কাগজে ব্যাংকের মুনাফা বেশি দেখা যেতে পারে, কিন্তু প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি আড়ালে থেকে যায়।

বর্তমান প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো— ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন এবং প্রকৃত প্রভিশনের ব্যবধান ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

ঘাটতি পূরণে বাড়বে মুনাফার ওপর চাপ : খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকগুলোকে এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে ভবিষ্যৎ আয় থেকে বড় অঙ্কের অর্থ প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে। এর ফলে নিট মুনাফা কমে যেতে পারে। মুনাফা কমলে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতাও কমবে। একই সঙ্গে মূলধন পর্যাপ্ততার (সিএআর) ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রভিশন ঘাটতি যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তা হলে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। কারণ শ্রেণিকৃত ঋণ যতক্ষণ না আদায় হচ্ছে অথবা যথাযথভাবে ক্ষতি হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে, ততক্ষণ ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে ঝুঁকি থেকেই যায়।

খেলাপি ঋণ কমানো ছাড়া সমাধান কঠিন : নাম গোপন রেখে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের একজন সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার বলেন, প্রভিশন ঘাটতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় শুধু নতুন করে প্রভিশন বাড়ানো নয়; বরং খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণ আদায় করা। ঋণ আদায় বাড়াতে না পারলে ব্যাংকগুলোকে বছরের পর বছর প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। এতে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমতে পারে এবং ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তার মতে, এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে— কোন ব্যাংকের ঘাটতি সাময়িক এবং কোন ব্যাংকের ঘাটতি কাঠামোগত তা আলাদা করা। একই সঙ্গে বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং প্রভিশন ঘাটতি পূরণের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করাও জরুরি।

যা বলছেন অর্থনীতিবিদরা : মূলধন ঘাটতির এই প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, মূলধন ঘাটতির বড় কারণ হলো খেলাপি ঋণ। তবে যে ঘাটতি দেখানো হয়, তাও প্রকৃত নয়। অনেক ব্যাংক দেন-দরবার করে মূলধন ঘাটতি শিথিল করে। তিনি বলেন, আমরা সমস্যা সমাধানের জন্য যে পথে হাঁটা শুরু করেছি তা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। যারা ঋণগ্রহীতা তারা খেলাপি হলে নানা রকম নীতিগত ছাড় দেওয়া হয়। আবার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকও সঠিকভাবে তথ্য যাচাই না করা, সুপারভিশন না করাসহ নানা ছাড় বা শিথিলতা দিচ্ছে। এমন উদারতার পথে আমরা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল তো মেলেনি। বরং সিঙ্গেল ডিজিট খেলাপি ঋণ এখন ৩৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তাও স্বীকৃত এনপিএল, অস্বীকৃতভাবে এই পরিমাণ আরও বেশি।

এর প্রভাবে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে এমন আশঙ্কা জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনাস্থা তৈরি করে। এমনিতেই বাংলাদেশের রিস্ক প্রিমিয়াম চার্জ বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ফলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করতে গেলে ব্যয় কমবে না, বরং বাড়তেই থাকবে। কারণ কাগজে-কলমে আমরা ঋণখেলাপি বা মূলধন ঘাটতি কম দেখাতে পারি, কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় কম দেখাচ্ছি, কি নীতিমালা ব্যবহার করছি সেটি তো আমাদের সঙ্গে বাণিজ্য করা সবারই জানা। এর ফলে ভালো ব্যাংকগুলোর প্রতিও তারা আস্থা রাখবে না। এতে আমাদের সঙ্গে বাণিজ্য করতে চাইবে না অন্যরা, আবার যারা করবে তারাও অত্যধিক পরিমাণে চার্জ আরোপ করবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   মূলধন  ঘাটতি  ব্যাংক  বাংলাদেশ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: