দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আবারও মন্থরতার আভাস মিলেছে। আগস্টে বাংলাদেশের সামগ্রিক পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) জুলাইয়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ৪৯ দশমিক ৯ পয়েন্টে নেমেছে। ৫০ পয়েন্টের নিচে নেমে যাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংকোচনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে উৎপাদন ও সেবা খাতে কার্যক্রম কমে যাওয়ায় সামগ্রিক সূচকে বড় ধরনের পতন হয়েছে। তবে কৃষি খাতের সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকার পাশাপাশি নির্মাণ খাতও আগস্টে আবার প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) যৌথভাবে তৈরি করা পিএমআই সূচকে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার আগস্ট মাসের পিএমআই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টে কৃষি খাতের পিএমআই জুলাইয়ের তুলনায় ১ দশমিক ৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫৬ দশমিক ৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে টানা ১২ মাস সম্প্রসারণের ধারায় রয়েছে কৃষি খাত। নতুন ব্যবসা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও কর্মসংস্থান— তিনটি সূচকেই সম্প্রসারণ দেখা গেছে। তবে উপকরণ ব্যয় বাড়লেও এর বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
এর বিপরীতে উৎপাদন খাতে আগস্টে বড় ধরনের পতন হয়েছে। জুলাইয়ের তুলনায় ১৮ পয়েন্ট কমে এ খাতের পিএমআই ৪৭ দশমিক ৪ পয়েন্টে নেমে এসেছে। নতুন অর্ডার, নতুন রফতানি অর্ডার, উৎপাদন, উপকরণ ক্রয়, আমদানি ও কর্মসংস্থান— সবগুলো সূচকই সংকোচনের পর্যায়ে চলে গেছে। একই সময়ে উৎপাদনের উপকরণের দাম দ্রুত বাড়তে দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, উৎপাদন খাতের মন্থরতার পেছনে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থপ্রাপ্তিতে জটিলতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি এবং তৈরি পোশাক খাতে অর্ডার কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর দাবিও জানিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে আগস্টে নির্মাণ খাত আবার সম্প্রসারণের পর্যায়ে ফিরেছে। এ খাতের পিএমআই ৫২ দশমিক ৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। নির্মাণ কার্যক্রম ও কর্মসংস্থান— দুই ক্ষেত্রেই বৃদ্ধি হয়েছে। তবে উপকরণ ব্যয় দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি অসম্পন্ন অর্ডারের সূচক সংকোচনের পর্যায়ে রয়েছে।
সেবা খাতের পরিস্থিতিও আগস্টে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জুলাইয়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমে আগস্টে সেবা খাতের পিএমআই ৪৯ দশমিক ২ পয়েন্টে নেমেছে। এর মধ্য দিয়ে ২২ মাস পর প্রথমবারের মতো সেবা খাত সংকোচনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। নতুন ব্যবসা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়লেও সম্প্রসারণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সংকোচন হয়েছে।
সেবা খাতের ব্যবসায়ীরা আর্থিক সহায়তা বাড়ানো, বিদ্যুৎ বিল ও পরিচালন ব্যয় কমানো এবং আয়করসহ অন্যান্য করের চাপ কমানোর দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে কৃষি খাতের ব্যবসায়ীরা কৃষি উপকরণের দাম কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে কীটনাশকের দাম কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন তারা।
তবে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা এখনও ইতিবাচক রয়েছে। যদিও আগের তুলনায় আশার মাত্রা কিছুটা কমেছে। ব্যবসায়ীরা ব্যয় কমানো, আর্থিক সহায়তা বাড়ানো এবং আরও সহায়ক নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, আগস্টে পিএমআই ৪৯ দশমিক ৯ পয়েন্টে নেমে আসায় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সামগ্রিকভাবে নিরপেক্ষ সীমার কাছাকাছি ছিল। তবে উৎপাদন ও সেবা খাতে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষি খাতের সম্প্রসারণ এবং নির্মাণ খাতের পুনরায় প্রবৃদ্ধিতে ফিরে আসা অর্থনীতির অন্তর্নিহিত স্থিতিস্থাপকতার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে উৎপাদন খাতের মন্থরতার পেছনে আংশিকভাবে মাসিক রফতানি কমে যাওয়া এবং এলএনজি অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সাময়িক জ্বালানি বিঘ্নতা কাজ করছে।
ড. এম. মাসরুর রিয়াজ বলেন, সামনে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি, রফতানি চাহিদা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দেশের অর্থনীতি আবারও গতি ফিরে পেতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি