মাসের শেষ দিকে হাতে টাকা নেই, অথচ বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানির বিল পরিশোধের সময়সীমা শেষ হয়ে যাচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের জন্য নতুন একটি ডিজিটাল ঋণসুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ানো এবং জরুরি প্রয়োজনে ছোট অঙ্কের ঋণ সহজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন এই ব্যবস্থার নাম ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’। এর আওতায় গ্রাহকরা সর্বনিম্ন ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিতে পারবেন। পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল হওয়ায় ঋণ নিতে ব্যাংকে গিয়ে কাগজপত্র জমা দেওয়া বা কোনো নথিতে স্বাক্ষর করার প্রয়োজন হবে না।
কীভাবে কাজ করবে ই-পেমেন্ট ক্রেডিট?
সহজভাবে বললে, ডিজিটাল ব্যাংকিং বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকরা প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট অঙ্কের এই ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে ঋণের অর্থ নগদে উত্তোলন করা যাবে না। একইভাবে টাকা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব বা বিকাশ-রকেটের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) ওয়ালেটেও জমা হবে না।
অনুমোদিত ঋণের অর্থ সরাসরি ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট বিলদাতা বা সেবাদাতার কাছে পরিশোধ করা হবে।
এই ঋণের অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল দেওয়া যাবে। পাশাপাশি মোবাইল রিচার্জ, স্কুল-কলেজের ফি, চিকিৎসা ব্যয়, বাস-ট্রেন-বিমানের টিকিট কেনা ও ভ্রমণ ব্যয় মেটানো যাবে। এছাড়া কর, সরকারি সেবার ফি এবং বিমার প্রিমিয়াম পরিশোধেও এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে।
ব্যাংকে যেতে হবে না
ই-পেমেন্ট ক্রেডিট নিতে গ্রাহককে ব্যাংকের শাখায় গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে না। পুরো প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হবে ডিজিটাল মাধ্যমে।
ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংক গ্রাহকের বায়োমেট্রিক বা আঙুলের ছাপ যাচাই করবে। এরপর ডিজিটাল সম্মতির মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন দেওয়া হবে। নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হবে ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) ও দুই স্তরের নিরাপত্তা যাচাই।
এই সেবা চালু করতে ব্যাংকগুলো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং ফিনটেক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
সুদ নয়, দিতে হবে সার্ভিস ফি
ই-পেমেন্ট ক্রেডিটে কোনো সুদ বা প্রসেসিং ফি রাখা হয়নি। এমনকি নির্ধারিত সময়ের আগেই ঋণ পরিশোধ করলে অতিরিক্ত প্রসেসিং বা আগাম পরিশোধের ফিও নেওয়া যাবে না।
তবে ঋণের মেয়াদের ওপর নির্ভর করে ব্যাংক নির্ধারিত হারে সার্ভিস ফি নিতে পারবে। ঋণ পরিশোধের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে তিন ধরনের— ৭ দিন, ১৫ দিন ও ৩০ দিন।
৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে ৭ দিনের জন্য সার্ভিস ফি ৩ টাকা, ১৫ দিনের জন্য ৪ টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য ৬ টাকা। ৫০১ থেকে ১ হাজার টাকা ঋণের ক্ষেত্রে ৩০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ সার্ভিস ফি ১৫ টাকা। ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা ঋণের ক্ষেত্রে ৩০ দিনের মেয়াদে ফি ৫০ টাকা।
আর ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে ৭ দিনের জন্য সার্ভিস ফি ৩৫ টাকা, ১৫ দিনের জন্য ৭০ টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করলে সার্ভিস ফি ছাড়া কোনো অতিরিক্ত সুদ বা জরিমানা দিতে হবে না।
সময়মতো পরিশোধ না করলে জরিমানা
নির্ধারিত মেয়াদে ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে গ্রাহকের ওপর জরিমানা আরোপ করতে পারবে ব্যাংক। তবে জরিমানার হার ইচ্ছামতো নির্ধারণ করা যাবে না।
খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, জরিমানার পরিমাণ দৈনিক সার্ভিস ফি-র হারের বেশি হতে পারবে না। ফলে অতিরিক্ত খরচ এড়াতে গ্রাহকদের ৭, ১৫ অথবা ৩০ দিনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে
বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে সর্বসাধারণের মতামত ও পরামর্শের জন্য ই-পেমেন্ট ক্রেডিটের খসড়া নীতিমালা প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন অংশীজনের মতামত পর্যালোচনার পর নীতিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে।
রোববার ই-পেমেন্ট ক্রেডিট সুবিধা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে। তবে শুরুতেই সব গ্রাহক এই সুবিধা পাবেন না। প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাংকগুলো অন্তত ছয় মাস পরীক্ষামূলকভাবে বা পাইলট প্রকল্পের আওতায় এটি পরিচালনা করবে।
পাইলট প্রকল্প সফল হলে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন পাওয়া গেলে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ই-পেমেন্ট ক্রেডিট সুবিধা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ