বাংলাদেশে সরকারি কেনাকাটায় ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বিশেষ করে উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের ক্ষেত্রে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে বলেছে ২৭ দেশের জোটটি।
একই সঙ্গে বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণমূলক জটিলতা এবং অশুল্ক বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ইইউ।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে ২৭ দেশের প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূতরা। বৈঠকে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে ইইউ প্রতিনিধি দল।
যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হওয়ার পরও রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য এয়ারবাসের প্রস্তাবটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন মাইকেল মিলার।
তিনি বলেন, আমাদের দৃষ্টিতে, এয়ারবাসের একটি অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতামূলক অফার রয়েছে। এটিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত। আমরা এয়ারবাস ও বিমানের মধ্যে খুব দ্রুত আলোচনা সমাপ্তির প্রত্যাশা করছি।
সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা না দিয়ে বাণিজ্যিক সক্ষমতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপরও জোর দেন ইইউ রাষ্ট্রদূত। তার ভাষ্য, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো যেন অন্যান্য দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমান শর্তে প্রতিযোগিতা করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিমানের কাছে এয়ারবাসের প্রস্তাব বহাল
বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চুক্তির পর ইইউ রাষ্ট্রদূতের এ বক্তব্য এলো।
গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। চুক্তি অনুযায়ী, ১৪টি উড়োজাহাজ ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহ করার কথা রয়েছে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া আর চূড়ান্ত হয়নি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, মার্কিন শুল্কনীতি এবং বোয়িংয়ের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিমান বোয়িংয়ের সঙ্গে উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে।
তবে এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এখন সেই আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইইউ।
গত জুলাইয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছিলেন, সরকার ১০টি এয়ারবাস কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ৩১ আগস্টের মধ্যে চুক্তি সইয়ের আশা করা হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তিটি সই হয়নি।
বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের বাধ্যবাধকতা নিয়েও আপত্তি
বাংলাদেশের মোট সমুদ্রপথের আমদানি-রপ্তানির ৫০ শতাংশ বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজে পরিবহনের আইনি বাধ্যবাধকতা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে ইইউ।
ইইউর মতে, এই ধরনের বাধ্যবাধকতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
‘বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (স্বার্থরক্ষা) আইন, ২০১৯’ এবং ‘বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ (স্বার্থরক্ষা) বিধিমালা, ২০২৩’-এ এ সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। এতে বাংলাদেশ থেকে আমদানি-রপ্তানি হওয়া পণ্যের ৫০ শতাংশ বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজে পরিবহনের কথা বলা হয়েছে।
তবে পণ্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় বাংলাদেশি জাহাজ পাওয়া না গেলে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অনাপত্তিপত্রের ভিত্তিতে বিদেশি জাহাজ ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা ১২২টি। এর মধ্যে সরকারি ৭টি এবং বেসরকারি ১১৫টি। দেশের বার্ষিক আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার হলেও এই জাহাজ বহরের পক্ষে এর অর্ধেক পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা নেই।
তিনি বলেন, বিদেশি জাহাজকে বাংলাদেশি পণ্য পরিবহনের জন্য শিপিং করপোরেশনের এনওসি নিতে হয়, যা এক ধরনের বাণিজ্যিক বাধা। এ বাধা দূর করতে ‘ফ্ল্যাগ ভেসেল প্রটেকশন অ্যাক্ট’ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ইইউর উদ্বেগ এবং বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের ভূমিকা তুলে ধরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি পর্যালোচনা করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে।
তবে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশি জাহাজ পাওয়া না গেলে আমদানি ও রপ্তানিকারকরা আইন অনুযায়ী বিদেশি জাহাজ ব্যবহারের সুযোগ পান। তাই এই বিধানকে বাণিজ্য বাধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি মনে করেন।
তাঁর মতে, আইনে বিদেশি জাহাজ ব্যবহারের যে সুযোগ রয়েছে, সেটি ইইউ প্রতিনিধিদের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আইনি সুরক্ষা তুলে দিলে দেশের বেসরকারি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
আজম জে চৌধুরী বলেন, তিন-চার বছর আগেও দেশের বেসরকারি খাতে মাত্র ৩৯টি সমুদ্রগামী জাহাজ ছিল। ১৪ জন উদ্যোক্তা এ খাতে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে জাহাজের সংখ্যা ১১৫টিতে উন্নীত করেছেন। তাঁর মতে, আইনি সহায়তার কারণেই এই বিনিয়োগ এসেছে। ফলে সুবিধা তুলে নিলে বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে।
লজিস্টিকস খাতে আরও বিনিয়োগের সুযোগ চায় ইইউ
লজিস্টিকস খাতেও বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে ইইউ। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি কোম্পানির শতভাগ মালিকানায় বিনিয়োগের সুযোগ, সমুদ্রবন্দর থেকে আইসিডিতে পণ্য পরিবহন আরও সহজ ও দ্রুত করতে রেলের লোকোমোটিভ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এসব প্রতিবন্ধকতার কয়েকটি দূর করতে সরকার ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি। বিনিয়োগের ওপর থাকা সীমা সর্বশেষ বাজেটে তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতা কমানো গেলে এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বাড়াতে লজিস্টিকস খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই নিয়মকানুন সহজ করার উদ্যোগ ইতিবাচক।
এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দিতে ইইউর সমর্থন চায় বাংলাদেশ
জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবে ইইউর সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আশা করছে, ইইউ এ প্রস্তাবকে সমর্থন করবে—তা ভোটের মাধ্যমে হোক কিংবা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ইইউ। এ জোটের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি নিয়ে প্রাথমিক ও প্রস্তুতিমূলক আলোচনা শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার জানান, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এফটিএ ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়ার পর ইউরোপীয় কমিশন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইইউর সদস্য দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষ হলে চলতি সপ্তাহেই যৌথ কারিগরি আলোচনা শুরু হতে পারে।
তিনি বলেন, দুই পক্ষের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে স্বচ্ছ, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রয়োজন। সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ও ইইউ, উভয় পক্ষই লাভবান হবে।
ইইউর ৬১ সুপারিশের ১৩টি এখনো বাকি
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইইউ বাংলাদেশে ইউরোপীয় ব্যবসা ও বিনিয়োগের পথে থাকা মোট ৬১টি অশুল্ক বাধা চিহ্নিত করেছিল। এর মধ্যে ৪৮টি বিষয়ে সমাধান হয়েছে, আর ১৩টি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিকস কোম্পানির লাইসেন্সিং জটিলতা, বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ব্যবহারের আইনি বাধ্যবাধকতা, সাময়িক আমদানি ও পুনঃরপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আইআরসি ও আমদানি নিবন্ধন সহজীকরণ।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আমদানি নিবন্ধনের প্রক্রিয়া থেকে ইতোমধ্যে ছয়টি ধাপ কমানো হয়েছে।
এ ছাড়া বাকি সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে রেলের ধীরগতির পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা, নৌবাহিনীর দরপত্র প্রক্রিয়ার সংস্কার, ঋণপত্র বা এলসি সংশোধনের সময় কমানো, লাইসেন্সিং ব্যবস্থা সহজ করা, ইইউর সুপারিশ অনুযায়ী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং গাইডলাইন চালু, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা জোরদার এবং নকল পণ্য প্রতিরোধ।
সরকার প্রস্তাবিত ‘প্রতিরক্ষা ক্রয় আইন ২০২৬’-এর মাধ্যমে নৌবাহিনীর দরপত্রসংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে এলসি সংশোধনের সময় কমাতে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০২৫’ সংশোধনের বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরির কাজ চলছে। মেধাস্বত্ব সুরক্ষা জোরদারে ‘ট্রেডমার্কস আইন ২০০৯’ সংশোধনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে রয়্যালটি, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ও নিবন্ধনের ওপর দ্বৈত করসংক্রান্ত ইইউর সুপারিশগুলো এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ