গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এখন আর শুধু শিল্প-কারখানার উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই, এর আঁচ পড়েছে দেশের পুঁজিবাজারেও। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে ব্যয় বৃদ্ধি এবং আগামীতে কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফা কমে যাওয়ার শঙ্কা— এসব বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এরই প্রতিফলন দেখা গেছে সদ্য শেষ হওয়া সপ্তাহের শেয়ারবাজারে। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার দিনই সূচকের পতনের মধ্য দিয়ে সপ্তাহ শেষ করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এ ছাড়া প্রধান সূচক ডিএসইএক্সও তিন মাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে গেছে।
এক সপ্তাহেই ১৪৭ পয়েন্টের পতন : ৬ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ কার্যদিবসে ডিএসইএক্স কমেছে ১৪৭ পয়েন্ট। শতাংশের হিসাবে পতন ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সপ্তাহ শেষে সূচকটি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫১৫ পয়েন্টে। এর আগে গত ৮ জুন ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৫০০ পয়েন্টের কাছাকাছি ছিল। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সূচকের এই পতনকে শুধু শেয়ারবাজারের অভ্যন্তরীণ কোনো একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের সংকট এবং তার সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব বিনিয়োগকারীদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে।
বিশেষ করে যেসব তালিকাভুক্ত কোম্পানি গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়েও বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়ে পড়েছেন।
উৎপাদন কমলে চাপ পড়বে মুনাফায় : শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও আবার কারখানার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সচল রাখতে তুলনামূলক ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে।
এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারও সম্ভব হচ্ছে না। দুদিকের এই চাপ শেষ পর্যন্ত কোম্পানির আয় ও মুনাফায় প্রভাব ফেলতে পারে— এমন আশঙ্কাই এখন বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক শিল্প-প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখলেও এতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ভবিষ্যৎ আয়ের অনিশ্চয়তায় বিক্রির চাপ ও ডিএসইর জরুরি বৈঠক : কোম্পানিগুলোর সম্ভাব্য আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নতুন করে শেয়ার কেনার বদলে হাতে থাকা শেয়ার বিক্রির দিকে ঝুঁকেছে। দীর্ঘস্থায়ী উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুনাফায় সম্ভাব্য চাপ— এই তিনটি বিষয় বাজারে বিক্রির চাপ বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল ক্রয় চাহিদা এবং স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলির সমন্বয়ও বাজারের পতনকে তীব্র করেছে।
সপ্তাহের শুরুতেই পরিস্থিতির নেতিবাচক চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৬ সেপ্টেম্বর এক কার্যদিবসেই ডিএসইএক্স ১০০ পয়েন্টের বেশি পড়ে যায়। ওই সময় বাজারের ব্রোকাররা আতঙ্কজনিত বিক্রির পাশাপাশি বাজারে বিভিন্ন ধরনের হস্তক্ষেপ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বাজারে বড় ধরনের দরপতনের পর পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গত মঙ্গলবার জরুরি বৈঠকে বসেছিল ডিএসই ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। বৈঠকে সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং বাজারকে স্থিতিশীল করার সম্ভাব্য করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সাপ্তাহিক বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ইবিএল সিকিউরিটিজও জ্বালানি সংকটকে বাজারের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহের সংকটের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর আয় নিয়ে দুর্বল প্রত্যাশা এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান বাজারের গতি কমিয়ে দিয়েছে।
দরপতনের ফলে কিছু ব্লু-চিপ শেয়ারের তুলনামূলক আকর্ষণীয় মূল্যস্তরে চলে আসলেও তা বিনিয়োগকারীদের বড় পরিসরে বাজারমুখী করতে পারেনি। সামগ্রিক অনিশ্চয়তা শেয়ার ক্রয়ের চেয়ে বিক্রির দিকেই বিনিয়োগকারীদের ধাবিত করায় পরবর্তী কার্যদিবসগুলোতেও পতনের ধারা অব্যাহত থাকে।
ব্যতিক্রম মিউচুয়াল ফান্ড : তবে পুরো বাজার যখন বিক্রির চাপে, তখন কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে। সপ্তাহজুড়ে এ খাতে তুলনামূলকভাবে ভালো ক্রয় চাহিদা ছিল। বাজারের দুর্বলতার মধ্যে স্বল্পমেয়াদি লাভের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে কিছু বিনিয়োগকারী মিউচুয়াল ফান্ডের দিকে ঝুঁকেছেন বলে জানিয়েছে ইবিএল সিকিউরিটিজ। ফলে সপ্তাহ শেষে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের সূচক বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। বাজারের প্রায় সব প্রধান খাতের সূচক যেখানে নিম্নমুখী ছিল, সেখানে এই খাতের উত্থান ছিল উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম।
বড় কোম্পানির পতনে সূচকে বড় ধাক্কা : ডিএসইএক্সের পাশাপাশি ডিএসইর অন্য দুই প্রধান সূচকও সপ্তাহে কমেছে।
ডিএস-৩০ সূচক ৪৫ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৯৫ পয়েন্টে নেমেছে। শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানিগুলো নিয়ে গঠিত ডিএসইএস সূচক কমেছে ৩৩ পয়েন্ট, সপ্তাহ শেষে সূচকটির অবস্থান ১ হাজার ১০৫ পয়েন্ট।
বড় মূলধনের কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের দরপতন প্রধান সূচকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ ও ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ারের দাম কমায় ডিএসইএক্সের পতনে সম্মিলিতভাবে ২৫ পয়েন্টের বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
লেনদেনেও গতি কমেছে
শুধু সূচক নয়, লেনদেনের চিত্রেও বাজারের দুর্বলতার প্রতিফলন রয়েছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে মোট ২ হাজার ৭৭১ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আগের সপ্তাহে এর পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৪ কোটি টাকা।
অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোট লেনদেন কমেছে। দৈনিক গড় লেনদেনও প্রায় ৯ শতাংশ কমে ৫৫৪ কোটি টাকায় নেমেছে। আগের সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৬০৯ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছিল।
খাতভিত্তিক লেনদেনে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল বস্ত্র খাত। সপ্তাহের মোট লেনদেনের ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে। এরপর সাধারণ বীমা খাতের অংশ ১৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং ওষুধ ও রসায়ন খাতের অংশ ১০ দশমিক ৪ শতাংশ।
দর কমেছে তিন শতাধিক কোম্পানির
বাজারে বিক্রির চাপ কতটা বিস্তৃত ছিল, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় দর পরিবর্তনের দিকে লক্ষ করলে। সপ্তাহে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩১০টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ারের দাম কমেছে। বিপরীতে দাম বেড়েছে মাত্র ৬০টির। আরও ১৬টি কোম্পানি ও ফান্ডের শেয়ারের দাম অপরিবর্তিত ছিল।
অর্থাৎ বাজারের বড় অংশজুড়েই ছিল নেতিবাচক প্রবণতা। মিউচুয়াল ফান্ড ছাড়া প্রায় সব খাতের সূচক কমেছে।
সবচেয়ে বেশি চাপ ছিল ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই খাতে। সপ্তাহে এ খাতের সূচক কমেছে ৪ শতাংশ। পাশাপাশি প্রকৌশল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, ওষুধ ও রসায়ন, টেলিযোগাযোগ এবং ব্যাংক খাতেও উল্লেখযোগ্য দরপতন হয়েছে।
চট্টগ্রামেও একই চিত্র
শুধু ঢাকার বাজার নয়, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) সপ্তাহজুড়ে ছিল ব্যাপক দরপতন। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৩০৬ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৮৬৬ পয়েন্টে নেমেছে। নির্বাচিত কোম্পানিগুলো নিয়ে গঠিত সিএসসিএক্স সূচকও ১৯১ পয়েন্ট কমে সপ্তাহ শেষে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৭৩ পয়েন্টে।
সব মিলিয়ে গত সপ্তাহের বাজারচিত্র বলছে, পুঁজিবাজারে এখন শুধু শেয়ারদরের ওঠানামাই বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কারণ নয়; অর্থনীতির উৎপাদন খাতে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটও বাজারের প্রত্যাশাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে উৎপাদন ব্যয়, কোম্পানির আয় এবং মুনাফার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে— আর সেই আশঙ্কা অব্যাহত থাকলে পুঁজিবাজারেও অনিশ্চয়তা কাটানো কঠিন হতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে