ঘুরপথ এড়িয়ে বন্দরে আসছে লাখ টন ক্রুডের ট্যাঙ্কার

সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম

অর্থনীতি

ঘুরপথ এড়িয়ে এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড) নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছে বৃহদাকার অয়েল ট্যাঙ্কার ‘এমটি আইসোপোস’।

2026-09-16T02:57:32+00:00
2026-09-16T02:57:32+00:00
 
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অর্থনীতি
ঘুরপথ এড়িয়ে বন্দরে আসছে লাখ টন ক্রুডের ট্যাঙ্কার
সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৫৭ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
ঘুরপথ এড়িয়ে এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড) নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছে বৃহদাকার অয়েল ট্যাঙ্কার ‘এমটি আইসোপোস’। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজায়রা বন্দরে মঙ্গলবার সকাল থেকে ট্যাঙ্কারটিতে ক্রুড লোডিং শুরু হচ্ছে। বুধবার বিকালে এটি চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর ট্যাঙ্কারটি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, ১২ থেকে ১৩ দিনের মধ্যে এটি বহির্নোঙরে পৌঁছাবে।

বৃহদাকার ট্যাঙ্কারটির শিপিং এজেন্ট প্রাইম ওশান ট্রেড লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক পি কে রয় সময়ের আলোকে বলেন, ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামে একটি অয়েল ট্যাঙ্কার ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে। ঘুরপথে আসায় ট্যাঙ্কারটির চট্টগ্রামে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। চলতি মাসে ‘এমটি আইসোপোস’ নামে আরও একটি ট্যাঙ্কার আসছে। তবে এটি ঘুরপথ এড়িয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজায়রা বন্দর থেকে চট্টগ্রামে আসছে।

তিনি বলেন, ট্যাঙ্কারটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে আরব সাগর ও এডেন সাগর পাড়ি দিয়ে বঙ্গোপসাগরে ঢুকবে। এতে এক লাখ টন মার্বান ক্রুড আমদানি করা হচ্ছে।

বিপিসি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এ পথে চলাচল বন্ধ ও সীমিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি সচল থাকার কথা বললেও বাস্তবে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী ট্যাঙ্কারের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি সরবরাহকারী দেশ কাতার। নিজেদের গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে দেশটি এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি কাটবে না। এতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বড় অংশে জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হবে না। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বে এককভাবে অন্তত ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে হরমুজ সচল হওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে আগের পরিস্থিতি ফিরে আসেনি। ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতার কথা শোনা যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা দেখার বিষয়।

১৩ দিনের স্থলে ট্যাঙ্কার এলো ৫০ দিনে : যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক থাকায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি ট্যাঙ্কার পৌঁছতে ১২ থেকে ১৩ দিন সময় লাগত। বাংলাদেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। বিপিসির পক্ষে এসব তেল আমদানি করা হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হরমুজ এড়িয়ে ক্রুডবাহী ট্যাঙ্কার চট্টগ্রামে আসার সুযোগ থাকলেও সৌদি আরব থেকে একইভাবে আসার স্বাভাবিক কোনো পথ নেই। এতদিন সৌদি আরবের ক্রুডবাহী ট্যাঙ্কারগুলো হুথি নিয়ন্ত্রিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচল করত।

সর্বশেষ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো ‘এমটি নিনেমিয়া’ বাব আল মান্দেব এড়িয়ে ঘুরপথে এসেছে। এতে ট্যাঙ্কারটির চট্টগ্রামে পৌঁছতে ৫০ দিন সময় লেগেছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় চারগুণ। এতে এক লাখ টনের বেশি ক্রুড রয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে ট্যাঙ্কার থেকে ক্রুড খালাসও কয়েক দিন বিঘ্নিত হয়। গত রোববার রাত থেকে বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া এলাকায় নোঙর করা ট্যাঙ্কারটি থেকে খালাস শুরু হয়েছে। আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে খালাস শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে শিপিং এজেন্টের ব্যবস্থাপক পি কে রয় বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে স্বাভাবিক সময়ে ১৩ দিনেই ক্রুড নিয়ে চট্টগ্রামে আসতে পারে ট্যাঙ্কার। কিন্তু সৌদি আরব থেকে আসতে বেশি সময় লাগছে। হরমুজ বন্ধ থাকায় ট্যাঙ্কারগুলোকে বিকল্প ও দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও এড়িয়ে চলতে হচ্ছে।


ঘুরপথে প্রতি টনে ৪০ ডলার বেশি ব্যয় : ক্রুডের আমদানিকারক বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) ক্রুডবাহী ট্যাঙ্কার ভাড়া করে থাকে।

বিএসসির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ক্রুডের আমদানি ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয়ও হিসাব করা হয়। ঘুরপথে আমদানি করায় প্রতি মেট্রিক টনে প্রায় ৪০ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। ফলে প্রতি টন ক্রুডের ব্যয় ১২২ থেকে বেড়ে ১৪০ ডলারে পৌঁছেছে।

তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের ক্রুডবাহী ট্যাঙ্কার চট্টগ্রামে আসতে পারলে এই অতিরিক্ত ব্যয় হতো না।

পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে সংকট নেই : বিপিসি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। এর মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ বেশি। এ ছাড়া ফার্নেস অয়েল, অকটেন ও জেট ফুয়েলও আমদানি করা হয়।

তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) থেকে সরবরাহ পাওয়ায় বর্তমানে কেরোসিন আমদানি করতে হয় না। চাহিদা অনুযায়ী ইআরএল ও বেসরকারি রিফাইনারি থেকে পেট্রোলের সরবরাহও পাওয়া যায়।

এশিয়ার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে হরমুজ প্রণালি বা অন্য কোনো দীর্ঘ ঘুরপথ ব্যবহারের প্রয়োজন হচ্ছে না। ফলে এ মুহূর্তে আমদানি ব্যয় বা পরিবহন ভাড়া বাড়ার আশঙ্কা নেই।

বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোর বেশিরভাগের শিপিং এজেন্ট প্রাইড শিপিং লাইনস। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম বলেন, এশিয়ার বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিপিসিকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ করে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার অন্তত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে এসব তেল সরবরাহ করছে। প্রতিষ্ঠানগুলো আবার চীন থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বাংলাদেশে সরবরাহ করে।

তিনি বলেন, ইরানের বড় ক্রুড আমদানিকারক চীন। ইরান থেকে চীনে ক্রুড সরবরাহে বড় ধরনের কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়নি। ফলে বিপিসির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও স্বাভাবিক সময়ের মতো বাংলাদেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে। তবে চীনের ক্রুড আমদানিতে কোনো কারণে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে সমস্যা হতে পারে। আশা করছি, এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না।

বাব আল-মান্দেব নিয়ন্ত্রণ করছে হুথি যোদ্ধারা : হরমুজ প্রণালির বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে বাব আল মান্দেব প্রণালি ব্যবহার করা হতো। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি বন্দর থেকে ‘এমটি নিনেমিয়া’ তিনবার চট্টগ্রামে এসেছে। এর মধ্যে দুবার ট্যাঙ্কারটি বাব আল মান্দেব প্রণালি ব্যবহার করেছে। সর্বশেষবার সেটি প্রণালিটি এড়িয়ে ঘুরপথে এসেছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর সৌদি বন্দর থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ট্যাঙ্কার চলাচলে বাব আল-মান্দেব গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে ওঠে। কিন্তু হুথি যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর ট্যাঙ্কারগুলো এখন এই প্রণালি এড়িয়ে চলছে।
গত রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো ‘এমটি নিনেমিয়া’ও বাব আল মান্দেব এড়িয়ে দীর্ঘ ঘুরপথে এসেছে। এ সময় ট্যাঙ্কারটি সুয়েজ খালও পাড়ি দিয়েছে।

বাব আল-মান্দেব নিয়ন্ত্রণে নিলেও হুথি যোদ্ধারা এখনও প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করেনি। তবে যেকোনো সময় এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল আমদানিতে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি   
  বিষয়:   বন্দর  ক্রুড  ট্যাঙ্কার  জ্বালানি তেল 


Advertisement
Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: