ব্যাংক খাতের আস্থা সংকট, পুঁজিবাজারের মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও নিরাপদ বিনিয়োগের সন্ধানে সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন মানুষ। এরই প্রতিফলন ঘটেছে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিতে। জুলাইয়ে ২ হাজার ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের পুরো সময়ের বিক্রির প্রায় চারগুণ।
চার বছরের মধ্যে একক মাসে সর্বোচ্চ এই বিক্রির বিপরীতে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ক্রমেই কমছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আগ্রহের পাশাপাশি সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায়ও তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ।
একক মাস হিসাবে গত চার বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ নিট বিক্রি। এর আগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২ হাজার ৫২৩ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল; পরের মাস মার্চে তা ছিল ১ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা। এরপর আর কোনো মাসেই সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ২ হাজার কোটি টাকার ঘর ছাড়ায়নি; উল্টো বেশিরভাগ মাসেই তা ঋণাত্মক ছিল। জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর রোববার জুলাই মাসের বিক্রির এই হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে।
নিট বিক্রি বলতে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের সুদ-আসল পরিশোধের পর অবশিষ্ট যে টাকা সরকারের কোষাগারে জমা থাকে, তাকে বোঝায়। সরকার এ অর্থ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের জুলাইয়ে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৯৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আর সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১২ মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর আগের টানা তিন অর্থবছরে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক। অর্থাৎ ওই তিন বছরে যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি টাকা সরকারের খরচ হয়েছে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল মেটাতে।
সঞ্চয় অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ জুলাই শেষে সঞ্চয়পত্র বাবদ সরকারের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এক মাস আগে জুন শেষে এই স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
অর্থবছরের শুরুতে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে এই উল্লম্ফনের কারণ জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমে বলেন, ‘ব্যাংক খাতের বর্তমান বিশৃঙ্খল অবস্থার কারণে মানুষ আস্থা সংকটে ভুগছে। শেয়ারবাজারেও মন্দা কাটছে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয় কমলেও যাদের কাছে যেটুকু থাকছে তারা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রকেই বেছে নিচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রে কোনো ঝুঁকি নেই, টাকা মার যাওয়ার শঙ্কা নেই এবং জরুরি প্রয়োজনে ভাঙানো যায়। মুনাফার হারও তুলনামূলকভাবে এখনও ভালো। সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্রের দিকেই ঝুঁকছে মানুষ।’ বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার সাধারণত ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।
পরে বিএনপি সরকার সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনে। ওই অর্থবছরে মোট ৯২ হাজার ৬১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। এর বিপরীতে সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয় ৯২ হাজার ৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা (যার মধ্যে কেবল মুনাফাই ছিল ৪৭ হাজার ৫১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা)।
গত ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে