মানবসভ্যতার ইতিহাসে ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা শুধু মানুষের অধিকার নিয়েই আলোচনা করেনি; বরং পশুপাখি, পরিবেশ এবং সব সৃষ্টিজগতের প্রতিও মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি এবং প্রত্যেকেরই নিজস্ব মর্যাদা ও উদ্দেশ্য রয়েছে। তাই প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা, অযথা কষ্ট দেওয়া কিংবা তাদের অধিকার উপেক্ষা করা ইসলাম সমর্থন করে না। বর্তমান সময়ে প্রাণীর প্রতি আচরণ নিয়ে দুই ধরনের চরমপন্থা দেখা যায়। একদল মানুষ প্রাণীদের প্রতি নির্মম আচরণ করে, তাদের কষ্টকে গুরুত্ব দেয় না। অপরদিকে আরেক দল প্রাণীর অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে এমন অবস্থানে পৌঁছে যায়, যেখানে মানুষের মর্যাদা, প্রয়োজন এবং ধর্মীয় বিধানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। ইসলাম এ দুই চরমতার মাঝখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইসলাম যেমন প্রাণীর প্রতি দয়া ও সহানুভূতির শিক্ষা দেয়, তেমনি এর কিছু সীমারেখাও নির্ধারণ করে দিয়েছে।
প্রাণিকুলের প্রতি সম্মান প্রদর্শন
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই এবং ডানা দিয়ে ওড়ে এমন কোনো পাখি নেই, যারা তোমাদের মতোই একেকটি সম্প্রদায় নয়’ (সুরা আনআম, আয়াত :৩৮)। এই আয়াত আমাদের শেখায় যে, প্রাণিকুলও আল্লাহর সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা অর্থহীনভাবে সৃষ্টি হয়নি; বরং আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তারা জীবনযাপন করে। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে এবং সারিবদ্ধভাবে উড়ন্ত পাখিরাও আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে’ (সুরা নূর, আয়াত : ৪১)। অতএব, প্রাণীর প্রতি দয়া ও সদাচরণ মূলত আল্লাহর সৃষ্টির প্রতিই সম্মান প্রদর্শনের অংশ।
কুকুরকে পানি পান করানোর পুরস্কার
প্রাণীর প্রতি দয়ার গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি শিক্ষণীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি তীব্র পিপাসায় কাতর একটি কুকুরকে দেখতে পেল। সে কূপে নেমে নিজের জুতা ভরে পানি তুলে কুকুরটিকে পান করাল। এর ফলে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন (বুখারি, হাদিস : ২৩৬৩)। এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, একটি প্রাণীর প্রতি আন্তরিক দয়াও আল্লাহর কাছে মহৎ আমল হিসেবে গণ্য হতে পারে।
প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার শাস্তি
প্রাণীর প্রতি দয়ার জন্য যেমন পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে, তেমনি নিষ্ঠুরতার জন্য সতর্কবার্তাও রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক নারী একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল। না তাকে খাবার দিয়েছিল, না ছেড়ে দিয়েছিল যাতে সে নিজে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে। ফলে বিড়ালটি মারা যায়। এ জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত হয় (বুখারি, হাদিস: ৩৩১৮০। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রাণীর প্রতি অন্যায় আচরণও আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়।
জবাইয়ের ক্ষেত্রেও দয়ার নির্দেশ
কিছু মানুষ মনে করেন, প্রাণীর প্রতি দয়া মানেই কোনো প্রাণীকে জবাই করা যাবে না। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি এমন নয়। ইসলাম মানুষের খাদ্য ও প্রয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট প্রাণী জবাই করার অনুমতি দিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ মানবিকতা ও দয়ার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে উৎকর্ষ ও সৌন্দর্য অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। তোমরা যখন জবাই করবে, উত্তম পদ্ধতিতে জবাই করবে (মুসলিম, হাদিস : ১৯৫৫)। অতএব, প্রাণী জবাই বৈধ হলেও তাকে কষ্ট দেওয়া, ধারহীন ছুরি ব্যবহার করা কিংবা এক প্রাণীর সামনে অন্য প্রাণী জবাই করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী।
প্রাণীর প্রতি দয়ার সীমারেখা
ইসলাম প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ দিলেও মানুষের মর্যাদা ও স্বার্থকে উপেক্ষা করার শিক্ষা দেয় না। এখানেই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান। বর্তমান সময়ে কখনো কখনো দেখা যায়, প্রাণীর প্রতি মমতার নামে মানুষের প্রয়োজন, নিরাপত্তা কিংবা ধর্মীয় বিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। কেউ কেউ কুরবানি বা হালাল জবাইয়ের বিরোধিতা করেন, আবার কেউ প্রাণীর জীবনকে মানুষের জীবনের সমান বা তার চেয়েও বেশি মূল্যবান বলে দাবি করেন। ইসলাম এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করে না। মানুষের জন্য আল্লাহ তায়ালা বহু প্রাণীকে উপকারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন। এতে তোমাদের জন্য রয়েছে উষ্ণ বস্ত্র, নানা উপকারিতা এবং তা থেকে তোমরা আহারও করো’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৫)। অতএব, প্রাণীর প্রতি দয়া মানে এই নয় যে মানুষের বৈধ প্রয়োজনের জন্য প্রাণী ব্যবহার করা যাবে না। বরং নীতি হলো, প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু নিষ্ঠুরতা করা যাবে না।
মানুষ ও প্রাণীর অধিকারে ভারসাম্য
ইসলাম মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। তাই মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও কল্যাণ সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করে। যদি কোনো প্রাণী মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তা হলে শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী তা প্রতিরোধ করার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে রোগবাহক, ক্ষতিকর বা আক্রমণাত্মক প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাও বৈধ। অর্থাৎ ইসলাম প্রাণীর অধিকার স্বীকার করে, কিন্তু তা মানুষের বৈধ অধিকার ও প্রয়োজনের বিপরীতে দাঁড় করায় না।
প্রাণীর প্রতি দয়া ইসলামের একটি উজ্জ্বল শিক্ষা। কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের শেখায়, প্রাণিকুলও আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাদের প্রতিও মানুষের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। তাদের খাদ্য, যত্ন, নিরাপত্তা এবং কষ্টমুক্ত জীবন নিশ্চিত করা একজন মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। তবে একই সঙ্গে ইসলাম এ বিষয়েও ভারসাম্য রক্ষা করেছে। প্রাণীর প্রতি দয়া মানে মানুষের বৈধ অধিকার, নিরাপত্তা বা ধর্মীয় বিধানকে অস্বীকার করা নয়। বরং ইসলাম শিক্ষা দেয়, প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রাণী ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু নিষ্ঠুরতা করা যাবে না; জবাই করা যাবে, কিন্তু কষ্ট দেওয়া যাবে না; উপকার নেওয়া যাবে, কিন্তু নির্যাতন করা যাবে না।
এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই ইসলামের সৌন্দর্য। কারণ ইসলাম শুধু মানুষের প্রতি নয়, বরং সব সৃষ্টিজগতের প্রতি দয়া, ন্যায় ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়।
শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ
আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ
/মহু