সময়ের পরিক্রমায় বিদায় নিচ্ছে ১৪৪৭ হিজরি। দরজায় কড়া নাড়ছে নতুন হিজরি সন। হিজরি বর্ষের সঙ্গে মুসলমানদের বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগির বিষয় জড়িয়ে আছে। নবীজির হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই হিজরি সনের শুভসূচনা হয়। আমরা জানি, হজরত ঈসা (আ.)-এর আসমানে গমনের পর থেকে খ্রিস্টাব্দ সাল গণনা করা হয়ে থাকে। আর শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের দিন অর্থাৎ ৬২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে হিজরি সন গণনা করা হয়। হিজরি সনের ক্যালেন্ডার রাসুল (সা.)-এর সময় থেকে প্রচলিত ছিল না। নবীজির ইন্তিকালের সাত বছর পর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে ১৭ হিজরি থেকে হিজরি সনের প্রচলন করা হয়।
হজরত ওমর (রা.) অর্ধ পৃথিবীর শাসনকর্তা ছিলেন। শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি, শাসনাধীন রাজ্যে চিঠিপত্র প্রেরণসহ নানা ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে তিনি সমসাময়িক সাহাবাদের পরামর্শক্রমে হিজরি সাল প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম অনেক ফজিলত ও মর্যাদার মাস। চার সম্মানিত মাসের প্রথম মাস মহররম। আবহমান কাল থেকেই মহররম মাস এক বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। শরিয়তের দৃষ্টিতে যেমন এ মাসটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি এই মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণও অনেক দীর্ঘ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানগুলো ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অবিচার করো না।’ (সুরা তওবা, আয়াত : ৩৬)
মহররম মাসে রোজা রাখার প্রতি ইসলামে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘রমজানের পর আল্লাহর মাস মহররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ’ (সহিহ মুসলিম ও জামে তিরমিজি)। মহররম মাসের দশম তারিখ তথা আশুরার রোজার ফজিলত আরও বেশি। এ সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রাসুল (সা.)-কে রমজান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোজা রাখতে দেখেছি অন্য সময় তা দেখিনি’ (সহিহ বুখারি)। হজরত আলি (রা.)-কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমজানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোজা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন নবীজির কাছে জনৈক সাহাবি করেছিলেন, তখন আমি তাঁর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে নবীজি বললেন, ‘রমজানের পর যদি তুমি রোজা রাখতে চাও, তবে মহররম মাসে রাখো। কারণ এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তায়ালা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।’ (জামে তিরমিজি)
মনে রাখা জরুরি যে, হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এ মাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস। মহররম মাস শুধু কারবালার ঘটনা স্মরণ করার মাস নয়। কারবালাকে কেন্দ্র করে এ মাস মর্যাদা নয়, বরং এ মাস গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার মাস, ত্যাগের মাস, ভালো কাজ করার মাস, খারাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকার এবং মুসলিম বিশ্বকে নতুন করে গড়ে তোলার দৃঢ়প্রতিজ্ঞার মাস। নতুন বছর মানেই নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনার পথে হাঁটা। হিজরি নববর্ষ হয়ে উঠুক মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণ ও মুক্তির বছর। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে হিজরি বর্ষের মর্যাদা ও কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রেখে আমলি জিন্দেগি যাপন করার তওফিক দান করুন।
সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
মাইলস্টোন কলেজ, উত্তরা, ঢাকা
/মহু