মানুষের জীবনের প্রতিটি দিকের দিকনির্দেশনা ইসলাম প্রদান করেছে। কোন প্রাণী খাওয়া বৈধ এবং কোনটি অবৈধ— এ বিষয়েও ইসলামে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। ইসলাম হালাল খাদ্য গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে এবং হারাম খাদ্য থেকে বিরত থাকতে বলেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, আপনি বলে দিন, আমার প্রতি যে ওহি বা প্রত্যাদেশ করা হয়েছে, তাতে মানুষ যা আহার করে তার কিছুই নিষিদ্ধ পাই না মৃত, প্রবহমান রক্ত ও শূকরের মাংস ছাড়া। কারণ তা অপবিত্র। (সুরা আনআম, আয়াত: ১৪৫)
ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবরা নিজেদের রীতি অনুযায়ী অনেক কিছু খেত এবং অনেক কিছু কেবল ঘৃণার কারণে বর্জন করত। পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে হজরত মুহাম্মদ (সা.) হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম হিসেবে ঘোষণা করেন। তাই আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তা-ই হালাল এবং যা হারাম করেছেন, তা-ই হারাম। আল্লাহ বলেন, আর তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেছেন এবং অপবিত্র ও নোংরা বস্তসমূহ হারাম করেছেন। (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৫৭)
প্রাণী সাধারণভাবে দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমত, স্থলজ বা মাটিতে বসবাসকারী প্রাণী এবং দ্বিতীয়ত, জলজ বা পানিতে বসবাসকারী প্রাণী। জলজ প্রাণীর মধ্যে মাছ ছাড়া অন্যান্য প্রাণী খাওয়া হারাম।
স্থলজ প্রাণী আবার তিন ধরনের। প্রথম শ্রেণির প্রাণীর শরীরে কোনো রক্ত নেই, যেমন— মশা, মাছি, মাকড়সা ও পিঁপড়া। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে এমন প্রাণী, যাদের প্রবাহিত রক্ত নেই, যেমন— সাপ ও ইঁদুর। এ দুই শ্রেণির প্রাণীর মধ্যে টিড্ডি ব্যতীত অন্য সব প্রাণী ঘৃণিত ও নিকৃষ্ট হওয়ায় সেগুলো খাওয়া হারাম। তৃতীয় শ্রেণির প্রাণী হলো প্রবাহিত রক্তবিশিষ্ট প্রাণী, যেমন— পাখি এবং বিভিন্ন চতুষ্পদ জন্তু।
পাখিদের মধ্যেও দুই ধরনের বিধান রয়েছে। যেসব পাখি থাবা ও নখরের সাহায্যে শিকার করে, যেমন—চিল, শকুন, বাজ ও ঈগল, সেগুলো খাওয়া মাকরুহে তাহরিমি বা নিষিদ্ধ।
আবু সালাবা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক শিকারি দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র প্রাণী ও প্রত্যেক শিকারি নখবিশিষ্ট পাখি খেতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৩০)
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে যেসব পাখি ঠোঁটের সাহায্যে খাদ্য গ্রহণ করে, সেগুলো খাওয়া হালাল। তবে এদের মধ্যে যেসব পাখি নাপাক বস্তু খায়, সেগুলো মাকরুহ। অবশ্য যদি তাদের অধিকাংশ খাদ্য হালাল হয়, তাহলে সেগুলোও হালাল হিসেবে গণ্য হবে।
এ ছাড়া যেসব পশু থাবা মেরে বা আক্রমণ করে শিকার করে, সেগুলো খাওয়া হারাম। যেমন—সিংহ, বাঘ, কুকুর, শিয়াল, বিড়াল, বানর ও হাতি।
অহিংস্র প্রাণীর মধ্যে যাদের পুরো শরীর পবিত্র, সেগুলো খাওয়া বৈধ। যেমন—গৃহপালিত গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া, উট ও দুম্বা। একইভাবে বন্য প্রাণীর মধ্যে বন্য গরু, হরিণ, খরগোশ এবং বন্য গাধা খাওয়া বৈধ। তবে যেসব প্রাণীর পুরো শরীর অপবিত্র, যেমন শূকর, সেগুলো খাওয়া হারাম।
সব ধরনের ঘোড়া ও গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া মাকরুহ। এছাড়া হালাল প্রাণীদের মধ্যে যেসব প্রাণী নিয়মিত অপবিত্র বস্তু খায়, সেগুলোর গোশত খাওয়াও মাকরুহ। সাহাবি জাবের (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) খায়বার যুদ্ধের দিন গৃহপালিত গাধা খেতে নিষেধ করেছেন এবং ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪২১৬)
যেসব প্রাণী আল্লাহর নাম উচ্চারণ না করে জবাই করা হয়, সেগুলোর গোশত খাওয়া বৈধ নয়। কারণ, তা হারাম। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তা থেকে আহার করো না, যার ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১২১)
স্বাভাবিক অবস্থায় হারাম প্রাণী খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে যদি জীবন রক্ষার প্রয়োজন দেখা দেয়, চরম খাদ্যসংকট তৈরি হয় অথবা চিকিৎসার বিশেষ প্রয়োজনে বাধ্য হতে হয়, তাহলে নিরুপায় অবস্থায় নিষিদ্ধ প্রাণীও ব্যবহার করা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের কী হয়েছে যে, যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়েছে তা তোমরা খাবে না? তোমাদের জন্য যা হারাম করা হয়েছে তা তোমাদের জন্য বিশদভাবে বাতলে দেওয়া হয়েছে, তবে যদি তোমরা নিরুপায় হও, (তবে ততটুকু নিষিদ্ধ বস্তু খেতে পার যাতে প্রাণে বাঁচতে পার)।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১১৯)
সময়ের আলো/ইউএমএইচ