বিপদাপদে আতঙ্ক নয়, তাওয়াক্কুল

আমীনুর রহমান নড়াইলী

ইসলাম

মানুষের জীবন কখনোই এক রকম থাকে না। কখনো আনন্দ, কখনো দুঃখ, কখনো স্বস্তি, কখনো সংকট। হঠাৎ অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ,

2026-09-27T15:03:05+00:00
2026-09-27T15:03:05+00:00
 
  রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১২ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
বিপদাপদে আতঙ্ক নয়, তাওয়াক্কুল
আমীনুর রহমান নড়াইলী
প্রকাশ: রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:০৩ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষের জীবন কখনোই এক রকম থাকে না। কখনো আনন্দ, কখনো দুঃখ, কখনো স্বস্তি, কখনো সংকট। হঠাৎ অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আর্থিক ক্ষতি, প্রিয়জন হারানো কিংবা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদ— জীবনের পথে নানা ধরনের বিপদ আসতে পারে। বিপদ এলে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো ভয় পাওয়া, দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়া কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়ে যাওয়া। 

কিন্তু একজন মুমিনের জীবনদর্শন এখানে ভিন্ন। সে বিপদে চেষ্টা করবে, সতর্কতা অবলম্বন করবে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে; কিন্তু অন্তরকে আতঙ্কের কাছে সমর্পণ করবে না। তার অন্তরের আশ্রয় হবে আল্লাহ। এটাই তাওয়াক্কুল। তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়। তাওয়াক্কুল মানে নিজের সাধ্য অনুযায়ী যথাসাধ্য চেষ্টা করার পর ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করা। মানুষ পরিকল্পনা করবে, চিকিৎসা নেবে, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে, পরামর্শ করবে, পরিশ্রম করবে।

তারপর মনে বিশ্বাস রাখবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর। কারণ মানুষের জ্ঞান সীমিত, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান সর্বব্যাপী। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট। এই বিশ্বাস একজন মুমিনের হৃদয়ে এমন শক্তি তৈরি করে, যা বিপদের মুহূর্তেও তাকে স্থির থাকতে সাহায্য করে।

বিপদ মানেই সব শেষ নয় : বিপদে পড়লে অনেকেই মনে করেন, আমার সব শেষ হয়ে গেল। একটি ব্যর্থতা যেন পুরো জীবনকে ব্যর্থ করে দেয়, একটি আর্থিক ক্ষতি যেন ভবিষ্যতের সব দরজা বন্ধ করে দেয়, একটি অসুস্থতা যেন জীবনের সব সম্ভাবনা নিঃশেষ করে দেয়। অথচ বাস্তবতা হলো— একটি বিপদ কখনোই পুরো জীবনের শেষ কথা নয়। আজ যে পরিস্থিতিকে আমরা অন্ধকার মনে করছি, আগামীকাল হয়তো সেখান থেকেই নতুন কোনো পথ খুলে যাবে। 

অনেক সময় মানুষ যে বিষয়টিকে নিজের জন্য ক্ষতি মনে করে, পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, তার মধ্যেই কল্যাণ লুকিয়ে ছিল। তাই বিপদের মুহূর্তে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা ঠিক নয়। মুমিন জানে, সে পুরো চিত্রটি দেখতে পাচ্ছে না। সে শুধু বর্তমান পরিস্থিতি দেখছে; কিন্তু আল্লাহ জানেন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। তাই বিপদের সময় মুমিনের মুখে অভিযোগের পরিবর্তে ভরসার ভাষা থাকা উচিত।

নবীদের জীবনেও ছিল বিপদ : তাওয়াক্কুলের শিক্ষা শুধু কথার বিষয় নয়; নবী-রাসুলদের জীবনেই এর অসংখ্য বাস্তব দৃষ্টান্ত রয়েছে। হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হলো, তখন বাহ্যিক পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। কিন্তু আল্লাহর ওপর তাঁর ভরসা অটুট ছিল। আল্লাহ সেই আগুনকেই তাঁর জন্য নিরাপদ করে দিলেন। 

হজরত মুসা (আ.)-এর সামনে ছিল সমুদ্র, পেছনে ফেরাউনের বাহিনী। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যেন কোনো পথই খোলা ছিল না। তখন তাঁর সঙ্গীরা আতঙ্কিত হয়ে বলেছিল, আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম। কিন্তু মুসা (আ.) বলেছিলেন, কখনোই নয়, আমার সঙ্গে আমার রব আছেন; তিনি আমাকে পথ দেখাবেন। 

এরপর আল্লাহর নির্দেশে সমুদ্র বিভক্ত হলো। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও হজরত আবু বকর (রা.) যখন হিজরতের পথে সওর গুহায় অবস্থান করছিলেন, শত্রুরা যখন গুহার মুখের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, তখনও রাসুল (সা.) সঙ্গীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, চিন্তা করো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন। এই ঘটনাগুলো আমাদের শেখায়— বিপদের উপস্থিতি তাওয়াক্কুলের বিপরীত নয়; বরং বিপদের মধ্যেই তাওয়াক্কুলের সত্যিকারের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।

তাওয়াক্কুলের সঙ্গে চেষ্টা জরুরি : কেউ যদি বলে, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করি, অথচ বিপদ থেকে বাঁচার জন্য কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তা হলে সেটি তাওয়াক্কুল নয়। ইসলাম আমাদের চেষ্টা করতে শেখায়। অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হলে পড়াশোনা করতে হবে। ব্যবসায় ক্ষতি হলে কারণ খুঁজে পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হবে। বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। 

কোনো সংকট এলে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ নিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষায়ও আমরা দেখি— উট বেঁধে তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ দায়িত্বশীল চেষ্টা এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতা— দুটিই পাশাপাশি চলবে। তাই তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ হলো, আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করব, কিন্তু ফলাফল আমার হাতে নয়, আমার রবের হাতে।

বিপদে মুমিনের ভাষা যেমন হবে : বিপদের সময় কথাবার্তাও গুরুত্বপূর্ণ। আমার সব শেষ, আল্লাহ আমাকে কেন এমন করলেন, আর কোনো পথ নেই, এ ধরনের হতাশার কথা না বলে মুমিনের উচিত ধৈর্য ও আশার ভাষা ব্যবহার করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। অর্থাৎ কষ্টের মধ্যেও আল্লাহ স্বস্তির পথ রাখেন। তাই বিপদে পড়ে সন্তানদের সামনে অভিভাবকের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবা যদি সামান্য বিপদেই ভেঙে পড়েন, সন্তানও ভয় পেতে শেখে। আর যদি তারা শান্ত থেকে বলেন, আমরা চেষ্টা করছি, আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন, তা হলে সন্তানও কঠিন পরিস্থিতিতে স্থির থাকতে শেখে।


তাওয়াক্কুল মানুষকে শক্তিশালী করে : যে ব্যক্তি মানুষের ওপর নির্ভর করে, মানুষের সাহায্য না পেলে ভেঙে পড়তে পারে। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, সে মানুষের সহযোগিতা গ্রহণ করেও তার হৃদয়ের মূল নির্ভরতা আল্লাহর ওপর রাখে। তাওয়াক্কুল মানুষকে অলস করে না; বরং সাহসী করে। কারণ সে জানে— আমি একা নই। আমার রব আমাকে দেখছেন, আমার অবস্থা জানেন এবং আমার জন্য যা কল্যাণকর, তা তাঁর জ্ঞানের বাইরে নয়। বিপদ তাই মুমিনের জন্য শুধু পরীক্ষা নয়; এটি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করারও একটি সুযোগ। দুঃসময়ে যে হাত মানুষের কাছে না গিয়ে প্রথমে আল্লাহর দিকে ওঠে, যে হৃদয় আতঙ্কের মধ্যেও আল্লাহর ওপর আস্থা রাখে, সেই হৃদয়ই প্রকৃত অর্থে তাওয়াক্কুলের স্বাদ পায়। জীবনে বিপদ আসবেই। সব বিপদ আমরা ঠেকাতে পারব না, সব পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণেও থাকবে না। 

কিন্তু বিপদের সময় আমরা কেমন থাকব, সেটি অনেকাংশেই আমাদের ঈমান ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। তাই বিপদ এলে আতঙ্কিত না হয়ে থামুন, পরিস্থিতি বুঝুন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন, বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ নিন এবং সর্বোপরি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। মনে রাখুন, চেষ্টা মানুষের দায়িত্ব, ফলাফল আল্লাহর হাতে। বিপদের অন্ধকার যত গভীরই হোক, মুমিনের অন্তরে আশার আলো নিভে যায় না। কারণ সে জানে— যে রব স্বস্তির দিনে সঙ্গে ছিলেন, তিনি দুঃখের দিনেও সঙ্গে আছেন।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   বিপদাপদ  আতঙ্ক  তাওয়াক্কুল 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: