ইসলামে শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা

ফারদিন মোহাম্মদ

ইসলাম

শিশু একটি পরিবারের আনন্দ, একটি সমাজের ভবিষ্যৎ এবং মানবতার আগামী দিনের প্রতিনিধি। তার নিষ্পাপ হাসি যেমন আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে,

2026-09-26T09:46:32+00:00
2026-09-26T09:46:32+00:00
 
  শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১১ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
ইসলামে শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা
ফারদিন মোহাম্মদ
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৪৬ এএম 
প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ইসলাম শিশুদের জীবন, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে। গ্রাফিক : সময়ের আলো
শিশু একটি পরিবারের আনন্দ, একটি সমাজের ভবিষ্যৎ এবং মানবতার আগামী দিনের প্রতিনিধি। তার নিষ্পাপ হাসি যেমন আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে, তেমনি তার কান্না আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে শিশুরা হত্যা, নির্যাতন, অবহেলা, দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ও নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে। 

অথচ প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ইসলাম শিশুদের জীবন, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু মুখে এসব শিক্ষা দেননি, নিজের জীবন ও আচরণের মাধ্যমে শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্বশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

নিষ্পাপ শিশুর জীবনের অধিকার : ইসলামের আগে আরবের জাহেলি সমাজে কন্যাশিশু জন্মকে অনেক সময় অপমান ও বোঝা হিসেবে দেখা হতো। দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক লজ্জার ভয়ে কেউ কেউ কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দিত। কুরআন এই বর্বরতার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। 

আল্লাহ বলেন, ‘যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিগ্যেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা তাকভির : ৮-৯) আয়াতটির মর্ম অত্যন্ত গভীর। যে শিশুটি কোনো অপরাধই করেনি, তার জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কেয়ামতের দিন সেই নিষ্পাপ শিশুর কাছেই প্রশ্ন করা হবে কেন তাকে হত্যা করা হয়েছিল? এর মাধ্যমে কুরআন মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়েছে, শিশুর জীবন কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়।

দারিদ্র্যের ভয়েও সন্তান হত্যা নয় : আজকের সমাজে অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সন্তানকে বোঝা মনে করে। ইসলাম এই মানসিকতারও কঠোর বিরোধিতা করেছে। 

আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না, আমিই তাদের এবং তোমাদের রিজিক দিই। নিশ্চয়ই তাদের হত্যা মহাপাপ’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৩১)। অন্য আয়াতে আরও এসেছে, ‘দারিদ্র্যের কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না, আমিই তোমাদের এবং তাদের জীবিকা দিয়ে থাকি’ (সুরা আনআম : ১৫১)। 

অর্থাৎ সন্তান পৃথিবীতে আসার পর তার রিজিকের দায়িত্বও আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত। তাই অর্থনৈতিক সংকট কোনো নিষ্পাপ প্রাণের জীবন কেড়ে নেওয়ার অজুহাত হতে পারে না।

শিশুদের প্রতি নবীজি (সা.)-এর ভালোবাসা : শিশুদের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণ ছিল অসাধারণ মমতাপূর্ণ। তিনি শিশুদের শুধু পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, বরং ভালোবাসা ও সম্মানের অধিকারী মানুষ হিসেবে দেখেছেন। হাদিসের কিতাবে একটি বিখ্যাত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নাতি হাসান ইবনে আলি (রা.)-কে চুমু দিচ্ছিলেন। সেখানে আকরা ইবনে হাবিস (রা.) উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমার দশটি সন্তান রয়েছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই চুমু দিইনি।’ 

তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না’ (বুখারি : ৫৯৯৭)। 

এই ছোট্ট ঘটনাটিই শিশু পালনের একটি বড় শিক্ষা দেয়। সন্তানকে শুধু খাওয়ানো, পরানো ও পড়াশোনা করানোই যথেষ্ট নয়; তার প্রয়োজন ভালোবাসা, স্নেহ ও মানসিক নিরাপত্তা। শিশুকে আদর করা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাকে নিরাপদ অনুভব করানোও ইসলামি দায়িত্বের অংশ।


শিশুর কান্নায় নবীজি (সা.)-এর সংবেদনশীলতা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিশুদের প্রতি মমতার আরেকটি অসাধারণ ঘটনা নামাজের সময়। তিনি বলেছেন, তিনি কখনো নামাজ দীর্ঘ করার ইচ্ছা নিয়ে দাঁড়াতেন; কিন্তু কোনো শিশুর কান্না শুনলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন, যাতে শিশুটির মায়ের জন্য কষ্টকর না হয় (সহিহ বুখারি : ৭০৭)। 

একটা বিষয় ভাবা যায় যিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল, যিনি নামাজে দীর্ঘ ক্বেরাত পড়তে চাইতেন, তিনিই একটি শিশুর কান্না এবং মায়ের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি আমাদের শেখায়, শিশুর কান্নাকে বিরক্তির বিষয় হিসেবে না দেখে তার প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা করতে হবে। 

শিশুদের সঙ্গে কোমল আচরণ : রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন, তাদের সালাম দিতেন এবং তাদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শন করতেন। তাঁর আচরণে শিশুরা ভয় নয়, বরং ভালোবাসা ও নিরাপত্তা অনুভব করত। এই নববী আদর্শ আজকের পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

অনেক সময় আমরা শিশুকে শাসনের নামে অতিরিক্ত বকাঝকা, অপমান কিংবা শারীরিক শাস্তি দিই। অথচ নবীজি (সা.)-এর শিক্ষা হলো শিশুর সঙ্গে রহমত ও কোমলতার আচরণ করতে হবে। ইসলাম এতিম শিশুদের অধিকার রক্ষার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।’ (সুরা দোহা : ৯)

শিশুর নিরাপত্তা পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (বুখারি)। 

এই হাদিসের আলোকে বাবা-মা, অভিভাবক, শিক্ষক, সমাজ ও রাষ্ট্র— সবারই শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে দায়িত্ব রয়েছে। শিশুকে নির্যাতন থেকে রক্ষা করা, তার শিক্ষা নিশ্চিত করা, নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া, তার কথা শোনা এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব।

আজ যখন শিশুহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে কিংবা অবহেলার খবর আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, তখন আমাদের ফিরে তাকাতে হবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই মমতাময় আদর্শের দিকে। 

যে নবী (সা.) একটি শিশুর কান্না শুনে নামাজ সংক্ষিপ্ত করেছেন, যে নবী (সা.) শিশুকে চুমু দিয়ে বলেছেন ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না’, তাঁর উম্মত হয়ে আমরা কীভাবে শিশুদের প্রতি নিষ্ঠুর হতে পারি? শিশুরা কারও বোঝা নয়, তারা আল্লাহর দেওয়া আমানত। 

তাদের জীবন রক্ষা করা, ভালোবাসা দেওয়া, মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেওয়া আমাদের ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব। একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব মানেই একটি সুন্দর ভবিষ্যতের ভিত্তি। 

তাই আসুন, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে শিশুদের প্রতি আমাদের আচরণে ভালোবাসা, মমতা, ন্যায় ও নিরাপত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করি। কারণ শিশুর হাসি রক্ষা করা শুধু মানবতার দায়িত্ব নয়, এটি নববী আদর্শেরও দাবি।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া


সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও/এমকে
  বিষয়:   ইসলাম  শিশু  অধিকার  নিরাপত্তা 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: