বিয়ে অনেকের জীবনেই আসে সুখ নিয়ে। তবে কারও ক্ষেত্রে হয় সেটি ব্যতিক্রম; শুধুই ভুল বোঝাবুঝি বা কথার অসংগতিতেই সম্পর্কে ফাটল ধরে। ফলে কখনো স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্কও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী বৈবাহিক সম্পর্কের ইতি ঘটে তালাকের মাধ্যমে। তবে এর আগে ও পরে কিছু বিষয় রয়েছে— যেগুলোর প্রতিফলন প্রতিটি দাম্পত্যেই জরুরি।
ডিভোর্সের আগে যা জানতে হবে
ক্ষমাশীল ও সহনশীল হওয়া : সংসারে ছোটখাটো ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কখনো অসাবধানতায় কিংবা পরিস্থিতির চাপে— ভুল আমাদের আচরণে, কথায় কিংবা সিদ্ধান্তে চলে আসে। তবে এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও ক্ষমা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নবী (সা.) ক্ষমাশীলতা পছন্দ করতেন এবং বলতেন— ‘যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।’ (মুসলিম : ২৫৮৮)
আলোচনায় সমাধান খোঁজা : কোনো বিষয়ে অসংগতি দেখা দিলে স্বামী-স্ত্রী নিজেরাই আলোচনা বা বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধান করে নেওয়া উচিত। তা সম্ভব না হলে পরিবার বা সমাজের জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ লোকদের দ্বারা মীমাংসায় পৌঁছা ইসলামি শরিয়তের নির্দেশ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনৈক্যের আশঙ্কা করো, তবে স্বামীর পক্ষ থেকে একজন ও স্ত্রীর পক্ষ থেকে একজন সালিশ নিয়োগ করো। তারা যদি মীমাংসা করতে চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি করে দেবেন।’ (সুরা নিসা : ৩৫)
সুন্নাহ অনুযায়ী তালাক প্রদান : ইসলামে তালাককে একান্ত প্রয়োজনে, সুন্নাহ অনুযায়ী দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলামি দৃষ্টিতে সুন্নাহ তালাক হলো— এমন একটি পবিত্রতায় (তুহুর) কেবল একটি তালাক দেওয়া, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর মিলন হয়নি অথবা পরপর এমন তিনটি পবিত্রতায় একটি করে মোট তিন তালাক দেওয়া, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর মিলন পাওয়া যায়নি। (আল-হিদায়া : ৩/১৩৯)
ডিভোর্সের পরে যা জানতে হবে
স্ত্রীর ইদ্দত পালন বাধ্যতামূলক : তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য ইদ্দত পালন শরিয়াহ দৃষ্টিতে ওয়াজিব। অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে সঙ্গম বা একান্ত নির্জনবাস হলে পূর্ণ তিনটি মাসিক ও গর্ভবতী হলে সন্তান ভূমিষ্ঠের পূর্ব পর্যন্ত তারা ইদ্দত পালন করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তালাকপ্রাপ্ত নারীরা নিজেদের চারটি মাসিক পর্যন্ত আটকে রাখবে’ (সুরা বাকারা : ২২৮)। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দত হলো সন্তান ভূমিষ্ঠের পূর্ব পর্যন্ত।’ (সুরা তালাক : ৪)
ইদ্দতের ব্যয়ভার স্বামীর ওপর : স্ত্রীর ইদ্দতকালীন থাকা-খাওয়া ও যাবতীয় ব্যয়ভার স্বামীর ওপর অর্পিত থাকবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সেখানে রাখো, যেখানে তোমরা থাকো এবং তাদের কষ্ট দিয়ে সংকটে ফেলো না। যদি তারা গর্ভবতী হয়, তবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তাদের খরচ বহন করো।’ (সুরা তালাক : ৬)
দেনমোহর পরিশোধ করা : দেনমোহর কোনো দয়া কিংবা দান নয়; বরং স্ত্রীর একান্ত অধিকার। এ জন্য এটি অনাদায়ী থাকলে পরিশোধ করা স্বামীর জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা সন্তুষ্টিচিত্তে স্ত্রীদের দেনমোহর পরিশোধ করো।’ (সুরা নিসা : ৪)।
সদাচরণ বজায় রাখা : তালাকের পর বৈবাহিক সম্পর্কের সমাপ্তি হলেও সদাচরণ বজায় রাখতে ইসলাম শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তাদের উত্তমভাবে রাখো অথবা বিদায় দাও।’ (সুরা বাকারা : ২২৯)
সন্তান প্রতিপালনে যত্নশীল হওয়া : তালাক-পরবর্তী স্বামী-স্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সন্তানদের যথাযথ প্রতিপালন। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, এই দায়িত্ব কেবল পিতার নয় বরং মায়েরও অংশ রয়েছে। ফকিহগণের মতে, পুত্রসন্তান সাত বছর ও কন্যাসন্তান নয় বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের তত্ত্বাবধানে থাকবে। তবে এই সময়ে সন্তানের ব্যয়ভার বহন করবে পিতা। নির্ধারিত সময় অতিক্রম হলে তারা পিতার আশ্রয়ে ফিরে যাবে। (ফাতাওয়ায়ে শামি : ৫/২৫৩)
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি