পুণ্যবান বন্ধুর প্রভাবে জীবন সুন্দর

নিজামুল ইসলাম নিজাম

ইসলাম

মানুষের সামাজিক জীবনে বন্ধুত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। চলার পথে প্রতিনিয়ত নানা মানুষের সঙ্গে আমাদের সখ্য গড়ে ওঠে, যার গভীর প্রভাব পড়ে

2026-08-02T11:33:44+00:00
2026-08-02T12:00:33+00:00
 
  রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬,
১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ২ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম
পুণ্যবান বন্ধুর প্রভাবে জীবন সুন্দর
নিজামুল ইসলাম নিজাম
প্রকাশ: রোববার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৩৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষের সামাজিক জীবনে বন্ধুত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। চলার পথে প্রতিনিয়ত নানা মানুষের সঙ্গে আমাদের সখ্য গড়ে ওঠে, যার গভীর প্রভাব পড়ে আমাদের চিন্তা, আচরণ ও ব্যক্তিত্বের ওপর। তবে বর্তমান সময়ে বন্ধুত্বের নামে অনেকেই বাহ্যিক আকর্ষণ বা দুনিয়াবি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সঙ্গী নির্বাচন করে থাকেন, অথচ ইসলাম এ ক্ষেত্রে দিয়েছে সুনির্দিষ্ট ও পবিত্র দিকনির্দেশনা। 

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একজন মানুষের দ্বীনদারি, সততা এবং চরিত্র যাচাই করেই বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া উচিত। কারণ সুসংবাদ ও সফলতার চাবিকাঠি যেমন সৎসঙ্গের ওপর নির্ভর করে, তেমনি ধ্বংস ও পথভ্রষ্টতার অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে অসৎসঙ্গ। বন্ধু গ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশ হচ্ছে, ‘ঈমানদাররা যেন ঈমানদার ব্যতীত অন্য কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে’ (সুরা নিসা : ১৪৪)। অর্থাৎ বন্ধু নির্বাচনে প্রথমেই গুরুত্ব দিতে হবে ঈমানের বিষয়কে।

সম্পদ ও ক্ষমতার মাধ্যমে বন্ধু নির্বাচন নয়, বরং বন্ধু নির্বাচন করতে হবে ব্যক্তির আমল, আখলাক, ন্যায়নীতি ও সততা দেখে। সুতরাং যাদের আমল-আখলাক ভালো, তাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। রাসুল (সা.)-কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘হে রাসুল! আপনি নিজেকে তাদের সৎ সঙ্গে আবদ্ধ রাখুন, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে’ (সুরা কাহাফ : ২৮)। 

অন্য আয়াতে মুমিনদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তওবা : ১১৯)।

বন্ধু গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই বন্ধুর আমল-আখলাক যাচাই-বাছাই করা উচিত। কেননা সৎ বন্ধু সৎকাজের আদেশ করে আর অসৎ কাজের নিষেধ করে। পক্ষান্তরে অসৎ বন্ধু অসৎ কাজের আদেশ করে আর সৎকাজ হতে বিরত রাখে। সৎ বন্ধু তথা ঈমানদার বন্ধুর প্রতি ঈমানদার বন্ধুর সৎ আচরণ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অন্যের সহায়ক। তারা ভালো কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবনযাপন করে। এদেরই ওপর আল্লাহ তায়ালা দয়া করবেন।’ (সুরা তওবা : ৭১)।

সৎ সঙ্গী আর অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ দিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হচ্ছে, আতর বিক্রেতা ও কর্মকারের হাপরের ন্যায়। আতর বিক্রেতাদের সঙ্গে ওঠাবসা করলে কখনো তাদের থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসবে না। হয় তুমি আতর খরিদ করবে, না হয় তার থেকে সুঘ্রাণ পাবে। আর কর্মকারের হাপর হয়তো তোমার ঘর অথবা তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তুমি তার থেকে দুর্গন্ধ পাবে’ (বুখারি : ২১০)। 

এ হাদিসের মাধ্যমে রাসুল (সা.) বোঝাতে চেয়েছেন, আতর বিক্রেতার সঙ্গে ওঠাবসা করলে যেমন তার থেকে আতরের সুঘ্রাণ পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি সৎ সঙ্গীর সঙ্গে ওঠাবসা করলে তার থেকে সৎ আমলের প্রভাব পাওয়া যায়। অন্যদিকে অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হচ্ছে কামারের ন্যায়, কামারের সঙ্গে ওঠাবসা করলে যেমন কামারের হাপরের ধোঁয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও গায়ে লেগে যায়, তদ্রুপ অসৎ সঙ্গীর সঙ্গে ওঠাবসা-চলাফেরা করলেও তেমন অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার অসৎ আমলের প্রভাব গায়ে লেগে যায়।

সম্পর্ক এমন জিনিস, যার মাধ্যমে সম্মানের দিক থেকে পাতালের মানুষ আকাশে উঠে যায় আবার আকাশের মানুষ পাতালে ডুবে যায়। যেমন আবু বকর (রা.) রাসুল (সা.)-এর বন্ধুত্ব গ্রহণের মাধ্যমে একজন সাধারণ মানুষ থেকে উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। হজরত বেলাল (রা.) রাসুল (সা.)-এর সাহচর্য গ্রহণ করার কারণে হাবসি গোলাম থেকে উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মুয়াজ্জিন খেতাবে ভূষিত হয়েছে। পক্ষান্তরে যারাই আবু জাহেল, উতবা, শায়বার মতো বড় বড় কাফেরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গ্রহণ করেছে, তারাই দুনিয়া ও আখেরাতের মর্যাদাগত দিক থেকে আকাশের মানুষ পাতালে ডুবে গেছে। তাই তো বলা হয়, ‘সঙ্গ দোষ মারাত্মক দোষ।’

এই সঙ্গ দোষের কারণেই সমাজে অধিকাংশ যুবক-যুবতী বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে। তাই সঙ্গ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে অবশ্যই সৎসঙ্গ গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানদার ব্যতীত আর কারও সঙ্গে সৎসঙ্গ রেখো না। তোমার খাদ্যও যেন ঈমানদার ব্যক্তিরা গ্রহণ করে।’ (আবু দাউদ : ৪৮৩২)।

বন্ধুত্বের সম্পর্ক দুনিয়ার সবকিছুকে হার মানায়। তাই বন্ধুত্বের সম্পর্ক দ্বারা মানুষ যতটা প্রভাবিত হয়, অন্য কিছুর দ্বারা মানুষ এতটা প্রভাবিত হয় না। আর বন্ধুত্বের সম্পর্ক নিবিড় করার জন্য সাধারণত মানুষ বন্ধুর মতের অনুসারী হয়ে থাকে। 

এ জন্য অধিকাংশ সময় দেখা যায়, বন্ধু বন্ধুর মতের অনুসারী হয়ে থাকে। হোক সেটা ভালো অথবা খারাপ। এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেকটা ব্যক্তি তার বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়ে থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকেরই চিন্তা-ফিকির করা উচিত সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে’ (আবু দাউদ : ৪৮৩৩)। 


এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, বন্ধু যেহেতু বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়ে থাকে, তাই বন্ধুত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের চিন্তা-ফিকির করা উচিত। আর বর্তমানে আমাদের যুবসমাজ ধ্বংসের অন্যতম কারণ হচ্ছে, অসৎ সঙ্গীর অসৎ প্রভাব। যে কারণে অসৎ সঙ্গীর খপ্পরে পড়ে যুবসমাজ আজ কঠিন ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বন্ধুত্বের সম্পর্কের কারণে কেয়ামতের দিন অনেকেই সম্মানিত হবে আবার অনেকেই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে। অর্থাৎ দুনিয়ায় যার সঙ্গে যার মহব্বত হবে কেয়ামতে দিন তার সঙ্গে তার হাশর হবে। এ সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে যাকে মহব্বত করে, ভালোবাসে, কেয়ামতের দিন সে তার সঙ্গী বলেই সাব্যস্ত হবে’ (বুখারি : ৬১৬৮)। 

সুতরাং বন্ধু গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই সৎ, ন্যায়, নিষ্ঠাবান ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিকে গ্রহণ করতে হবে। নচেৎ অসৎ বন্ধু পথভ্রষ্টতার কারণ হতে পারে। আল্লাহ আমাদের সৎ সঙ্গী গ্রহণের মাধ্যমে কল্যাণ লাভের তওফিক দান করুন।

সময়ের আলো/জেডি 



  বিষয়:   পুণ্যবান  বন্ধু  প্রভাব  জীবন  সুন্দর  ইসলাম 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: