একটি বাড়ি ইট-পাথর ও রঙে নির্মিত হতে পারে; কিন্তু একটি আদর্শ পরিবার গড়ে ওঠে ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ, ত্যাগ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। বড় বাড়ি থাকা আর সুখী পরিবার থাকা এক কথা নয়। পরিবারের প্রকৃত সৌন্দর্য তার বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়, বরং সদস্যদের হৃদয়ের বন্ধনে। দিনভর কর্মব্যস্ততার পর মানুষ যখন ঘরে ফেরে, তখন সে শুধু একটি ছাদের নিচে ফিরতে চায় না; ফিরে পেতে চায় আপনজনের ভালোবাসা, সন্তানের হাসি ও জীবনসঙ্গীর আন্তরিকতা। যে ঘরে দুঃখে সান্ত্বনা, বিপদে সহযোগিতা এবং ভুলে সংশোধনের সুযোগ থাকে- সেই ঘরই প্রকৃত অর্থে পরিবার। কিন্তু বর্তমান সময়ে পারিবারিক জীবনে নানা সংকট দেখা দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব, সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের যোগাযোগের ঘাটতি, পিতা-মাতার প্রতি অবহেলা, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংকট অনেক পরিবারকে অশান্ত করে তুলছে। এমন বাস্তবতায় ইসলামের পারিবারিক জীবনব্যবস্থা আমাদের জন্য হতে পারে একটি সুদৃঢ় পথনির্দেশনা।
পরিবার এক মহান আমানত : পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো’ (সুরা তাহরিম, আয়াত : ৬)। পরিবারের দায়িত্ব শুধু খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা নয়; বরং পরিবারের সদস্যদের ঈমান, ইবাদত, চরিত্র ও নৈতিকতার প্রতিও যত্নবান হওয়া। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা যেমন চিন্তা করি, তেমনি সে কেমন মানুষ হবে- সেই বিষয়েও ভাবতে হবে।
দাম্পত্যজীবন হোক ভালোবাসা ও প্রশান্তির : একটি পরিবারের শান্তি অনেকাংশেই নির্ভর করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ওপর। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন’ (সুরা রুম, আয়াত : ২১)। সংসারে মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু তা যেন মনপার্থক্যে পরিণত না হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম; আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সর্বাধিক উত্তম’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)। তাই মানুষের প্রকৃত চরিত্রের অন্যতম প্রকাশ ঘটে তার পরিবারের সঙ্গে আচরণের মাধ্যমে।
সন্তান- আনন্দের পাশাপাশি দায়িত্ব : সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া অমূল্য নেয়ামত ও আমানত। তার প্রথম বিদ্যালয় পরিবার এবং প্রথম শিক্ষক বাবা-মা। হজরত লোকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে সর্বপ্রথম তাওহিদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহর সঙ্গে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৩)। এরপর তিনি নামাজ, সৎকাজ, অসৎকাজ থেকে বিরত থাকা ও উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দেন। নবীজি বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিগ্যেস করা হবে’ (বুখারি, হাদিস : ৮৯৩)। অতএব, সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়, সৎ, নীতিবান ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
ঘরের ভাষা হোক কোমল : পারিবারিক সম্পর্ক অনেক সময় বড় কোনো ঘটনায় নয়, বরং প্রতিদিনের কটুকথা, অপমান, অবহেলা ও সন্দেহে দুর্বল হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৮৩)। একটি কোমল কথা ক্লান্ত হৃদয়ে প্রশান্তি আনতে পারে, আবার একটি কটু বাক্য দীর্ঘদিনের সম্পর্কেও ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। তাই ঘরের মানুষদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও ইসলামের আদব ও সৌন্দর্য বজায় রাখতে হবে।
হালাল রিজিক ও পারিবারিক বরকত : পরিবারের প্রয়োজন পূরণে অর্থ প্রয়োজন; তবে অর্থের উৎসও গুরুত্বপূর্ণ। হারাম উপার্জনে বাহ্যিক স্বাচ্ছন্দ্য এলেও প্রকৃত বরকত আসে না। তাই হালাল উপার্জনের পাশাপাশি অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ভোগবিলাস থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তুমি অপচয় করো না।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৬)
সন্তানকে সময় দিন : সন্তানের জন্য অর্থ, পোশাক ও শিক্ষা প্রয়োজন; কিন্তু বাবা-মায়ের সময় ও ভালোবাসার বিকল্প কোনো বস্তু নেই। তার কথা শুনুন, অনুভূতি বুঝুন, প্রশ্নের উত্তর দিন এবং ভুল হলে ভালোবাসার সঙ্গে সংশোধন করুন। যে সন্তান ঘরে নিজের কথা বলার মতো আপন মানুষ খুঁজে পায়, সে বাইরের অনিরাপদ আশ্রয়ের প্রতি তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল হয়।
প্রযুক্তি যেন দূরত্ব না বাড়ায় : মোবাইল ও ইন্টারনেট আধুনিক জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহার পরিবারে মানসিক দূরত্ব তৈরি করতে পারে। একই ঘরে থেকেও সবাই যদি নিজ নিজ পর্দায় ব্যস্ত থাকে, তা হলে পারিবারিক যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই সন্তান কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কত সময় অনলাইনে থাকছে- অভিভাবকদের সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
মতপার্থক্য থাকবে, সম্পর্ক যেন না ভাঙে : সংসারে মতপার্থক্য স্বাভাবিক। কিন্তু তা যেন সম্পর্ক নষ্ট না করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মীমাংসাই উত্তম’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১২৮)। তাই রাগের সময় কঠিন সিদ্ধান্ত না নেওয়া, পরস্পরের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া এবং অন্যের ভুল ক্ষমা করে দেওয়া- এসব অভ্যাস পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করে।
আদর্শ পরিবার মানে এমন একটি ঘর, যেখানে অর্থের চেয়ে ভালোবাসা বড়, অধিকারের চেয়ে দায়িত্ববোধ গভীর, শাসনের চেয়ে মমতা প্রবল এবং দুনিয়ার সাফল্যের পাশাপাশি আখেরাতের সফলতার চিন্তাও থাকে। সুখী পরিবার মানে সমস্যা থাকবে না- এমন নয়; বরং সমস্যা এলেও সবাই মিলে সমাধানের চেষ্টা করবে, ভুল হলে ক্ষমা করবে, বিপদে পাশে দাঁড়াবে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে- এটাই আদর্শ পরিবারের পরিচয়। তাই আসুন, আমাদের ঘরকে শুধু বসবাসের স্থান না বানিয়ে ঈমানের আলো, ভালোবাসার বন্ধন, আদব-আখলাক ও মানবিকতার শান্তিময় নীড় হিসেবে গড়ে তুলি।
এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/মহু