সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব

মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি

ইসলাম

সন্তান একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় আনন্দ, সবচেয়ে কোমল অনুভূতি এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় আমানত। একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে,

2026-09-19T08:50:22+00:00
2026-09-19T08:50:22+00:00
 
  শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব
মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৫০ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
সন্তান একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় আনন্দ, সবচেয়ে কোমল অনুভূতি এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় আমানত। একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন সে শুধু একটি পরিবারের সদস্য হিসেবে আসে না; সে আসে এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিয়ে। তার হৃদয় থাকে নির্মল, মন থাকে কোমল এবং চরিত্র থাকে গঠনের অপেক্ষায়। 

সে কী হবে— আল্লাহভীরু মানুষ, আদর্শ নাগরিক, মানবতার সেবক, নাকি নৈতিকতাহীন একজন ব্যক্তি? তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে পরিবার ও পারিবারিক পরিবেশ। ইসলামে সন্তান প্রতিপালন শুধু তার ভরণপোষণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ও পার্থিব শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। 

সন্তানের ঈমান-আকিদা, ইবাদত, জ্ঞান, চরিত্র ও নৈতিকতা গড়ে তোলাও পিতা-মাতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এ দায়িত্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো—

ঈমান ও সঠিক আকিদার শিক্ষা : সন্তানের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো ঈমান। তাই শৈশব থেকেই তাকে আল্লাহ তায়ালার পরিচয়, নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা এবং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস শিক্ষা দিতে হবে। নবীজি বলেছেন, ‘প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে; অতঃপর তার পিতা-মাতাই তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানায়’ (বুখারি, হাদিস : ১৩৫৮)। হাদিসটি সন্তানের বিশ্বাস ও জীবনদর্শন গঠনে পারিবারিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রতি ইঙ্গিত করে। তাই ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে শেখাতে হবে।

নামাজের অভ্যাস গড়ে দেওয়া : সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নামাজের প্রতি অভ্যস্ত করা পিতা-মাতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নবীজি বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)। তাই পিতা-মাতার উচিত নিজেরা নামাজের প্রতি যত্নশীল হওয়ার পাশাপাশি সন্তানকে নিয়মিত নামাজ আদায়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে সহযোগিতা করা। নামাজের পাশাপাশি ওজু, পবিত্রতা ও নামাজের প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েলও তাকে শেখাতে হবে।


কুরআন ও দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা : সন্তানকে কুরআন তেলাওয়াত, প্রয়োজনীয় দোয়া-দরুদ, নামাজের মাসআলা-মাসায়েল, নবীজির জীবনাদর্শ এবং ইসলামের মৌলিক আকিদা ও বিধান শিক্ষা দেওয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দ্বীনি জ্ঞানই সন্তানকে সঠিক পথের সন্ধান দেয় এবং তার জীবনকে আল্লাহমুখী করে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমার পরিবারকে নামাজের নির্দেশ দাও এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকো। আমি তোমার কাছে কোনো রিজিক চাই না; আমিই তোমাকে রিজিক দিই। আর শুভ পরিণাম তাকওয়ার জন্য’ (সুরা ত্বহা, আয়াত : ১৩২)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, পরিবারকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করা এবং ইবাদতের পরিবেশ সৃষ্টি করা পিতা-মাতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা : সন্তানদের মধ্যে ভালোবাসা, উপহার ও আচরণে অন্যায় বৈষম্য সৃষ্টি করা উচিত নয়। হজরত নুমান ইবনে বশির (রা.)-এর পিতা তাঁকে একটি উপহার দিয়েছিলেন। নবীজি জিগ্যেস করলেন, অন্য সন্তানদেরও কি একই রকম দিয়েছেন? তিনি বললেন, না। তখন নবীজি বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো’ (বুখারি, হাদিস : ২৫৮৭)। তাই পিতা-মাতার উচিত সন্তানদের মধ্যে অযথা বৈষম্য সৃষ্টি না করা। অন্যায় পক্ষপাতিত্ব সন্তানের মনে ক্ষোভ, হিংসা ও দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে।

সৎসঙ্গ ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা : সন্তানের বন্ধু, পরিবেশ ও চলাফেরার ব্যাপারে পিতা-মাতাকে সচেতন থাকতে হবে। কারণ মানুষের চরিত্র গঠনে সঙ্গীর প্রভাব গভীর। নবীজি বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম ও চরিত্রের অনুসরণ করে থাকে। অতএব তোমাদের প্রত্যেকের দেখা উচিত সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৩৩)। বর্তমান সময়ে মোবাইল, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সন্তানের পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এগুলোর ব্যবহারেও পিতা-মাতাকে দায়িত্বশীল নজরদারি ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে হবে। নিষেধের পাশাপাশি সন্তানকে ভালো ও কল্যাণকর বিকল্পের সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি।

সন্তানের জন্য দোয়া করা : সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া করা পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব। হজরত ইবরাহিম (আ.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একজন সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন’ (সুরা সাফফাত, আয়াত : ১০০)। আর মুমিনদের জন্য আল্লাহ তায়ালা শিক্ষা দিয়েছেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৭৪)। তাই সন্তানের জন্য শুধু দুনিয়াবি সফলতা নয়; ঈমান, তাকওয়া, নেক আমল ও উত্তম চরিত্রের জন্যও দোয়া করা উচিত। 

সন্তান আল্লাহ তায়ালার দেওয়া আমানত। তাকে শুধু ভালো স্কুল-মাদরাসায় পড়ানো, খাবার-পোশাকের ব্যবস্থা করা কিংবা ভবিষ্যতের জন্য অর্থ সঞ্চয় করাই পিতা-মাতার দায়িত্বের পূর্ণতা নয়। প্রকৃত দায়িত্ব হলো— সন্তানের ঈমান-আকিদা, নামাজ, দ্বীনি জ্ঞান, উত্তম চরিত্র, সৎসঙ্গ, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ নিশ্চিত করা। পিতা-মাতা যদি নিজেদের জীবনকে সন্তানের জন্য আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে তাকে ভালোবাসা, শাসন ও দিকনির্দেশনা দিতে পারেন, তা হলে সেই সন্তান পরিবার ও সমাজের জন্য কল্যাণের কারণ হবে। আজকের সন্তানই আগামী দিনের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তাই তাদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সন্তানদের নেক, সৎ, দ্বীনদার ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং পিতা-মাতার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার তওফিক দান করুন।

লেখক : এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   সন্তান  পিতা  মাতা  দায়িত্ব 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: