প্রযুক্তির যুগে শিশুর মনন গঠনে নবীজির শিক্ষা

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

ইসলাম

বর্তমানে প্রায় ঘরের দৃশ্যই এমন— ছোট একটি শিশু মেঝেতে বসে আছে। সামনে খেলনা পড়ে আছে, রঙিন বইও আছে। কিন্তু তার

2026-09-18T11:16:32+00:00
2026-09-18T11:24:34+00:00
 
  শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
প্রযুক্তির যুগে শিশুর মনন গঠনে নবীজির শিক্ষা
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৬ এএম  আপডেট: ১৮.০৯.২০২৬ ১১:২৪ এএম
সময়ের আলো গ্রাফিক
বর্তমানে প্রায় ঘরের দৃশ্যই এমন— ছোট একটি শিশু মেঝেতে বসে আছে। সামনে খেলনা পড়ে আছে, রঙিন বইও আছে। কিন্তু তার চোখ দুটো আটকে আছে একটি মোবাইল ফোনের পর্দায়। পাশে বসে থাকা দাদি ডাকেন, তবু শিশুটি তাকায় না। মা এসে ফোনটি সরিয়ে নিতেই কান্না শুরু। এখন প্রায় প্রতিটি মহল্লা, প্রতিটি পরিবারেই এমন দৃশ্য দেখা যায়। আমরা প্রায়ই বলি, সময় বদলেছে। কথাটি সত্য। কিন্তু এই বদলে যাওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়তো শিশুদের ভেতরেই ঘটছে।

তাদের হাতে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি পৌঁছে গেছে, অথচ সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হওয়ার আগেই। আজকাল শিশুরা অনেক কিছু জানে, কিন্তু অনেক কিছু অনুভব করার সুযোগ কমে যাচ্ছে। তারা পর্দায় হাজার মানুষের মুখ দেখে, কিন্তু নিজের পরিবারের মানুষের সঙ্গে বসে গল্প করার সময় পায় না। বন্ধু আছে অনেক, কিন্তু বিকালে মাঠে একসঙ্গে দৌড়ে ক্লান্ত হওয়ার স্মৃতি নেই। জ্ঞানের দরজা খুলেছে, কিন্তু শৈশবের জানালাগুলোর কিছু কিছু যেন অজান্তেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

অভিভাবকদের দোষ দিয়েও সমস্যার সমাধান হবে না। শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, ছোট পরিবার, নিরাপদ খেলার মাঠের সংকট, লেখাপড়ার বাড়তি চাপ— সব মিলিয়ে অনেক বাবা-মা সন্তানকে সময় দিতে চাইলেও পারেন না। তখন মোবাইল ফোনটি নীরব একজন সঙ্গীর ভূমিকা নেয়। সাময়িকভাবে শিশুকে ব্যস্ত রাখে, কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সঙ্গীই শিশুর সবচেয়ে কাছের সঙ্গী হয়ে ওঠে। 

সাম্প্রতিক গবেষণায়ও উঠে এসেছে, ঢাকার অধিকাংশ স্কুলপড়ুয়া শিশু আন্তর্জাতিকভাবে সুপারিশকৃত সীমার চেয়ে অনেক বেশি সময় স্ক্রিনে কাটায়, যা তাদের ঘুম, মনোযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে। আমরা সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে ব্যস্ত থাকি, ভালো ফলের জন্য উদ্বিগ্ন থাকি, নতুন প্রযুক্তি কিনে দিতে পারলেই দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করি। 

কিন্তু একটি শিশু সবচেয়ে বেশি কী চায়— এই প্রশ্নটি সবসময় করি না। শিশুর প্রয়োজন শুধু খেলনা নয়, একজন মনোযোগী শ্রোতা। শুধু দামি বই নয়, একজন গল্প বলার মানুষ। শুধু ইন্টারনেট নয়, একজন আপন মানুষ, যার কাছে সে নির্ভয়ে নিজের আনন্দ, ভয় কিংবা অভিমান বলতে পারে। ইসলাম এই জায়গাটিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। শিশু কেবল ভবিষ্যতের নাগরিক নয়; সে বর্তমানের একজন মানুষ। তারও অনুভূতি আছে, সম্মান আছে, অধিকার আছে।

তাই ইসলাম শিশুকে বড় করার আগে তার মনকে বড় করার কথা বলেছে। নবীজির জীবনী পড়লে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শিশুদের কখনো ছোট মানুষ হিসেবে দেখেননি; মানুষ হিসেবেই দেখেছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের কথা শুনেছেন, তাদের হাসির মূল্য দিয়েছেন। শিশুরা তাঁর কাছে বিরক্তির কারণ ছিল না; ছিল আল্লাহর রহমতের একটি প্রকাশ।

আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত প্রযুক্তি নয়; সম্পর্কের দূরত্ব। একটি শিশু যখন নিজের ঘরের মানুষদের চেয়ে একটি পর্দার সঙ্গে বেশি সময় কাটায়, তখন শুধু তার অভ্যাস বদলায় না, ধীরে ধীরে তার মানসিক জগৎও বদলে যেতে থাকে।

এই পরিবর্তনের সময়েই নবীজির জীবনী নতুন করে পড়া প্রয়োজন। কারণ চৌদ্দশ বছর আগে তিনি যে শিশুবান্ধব সমাজের শিক্ষা দিয়েছিলেন, সেখানে স্নেহ ছিল শাসনের আগে, সম্পর্ক ছিল নির্দেশের আগে, আর চরিত্র গঠনের শুরু হয়েছিল ভালোবাসা দিয়ে— ভয় দিয়ে নয়। নবীজির জীবনের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে— তিনি শিশুদের সংশোধনের আগে তাদের হৃদয় জয় করেছেন।

আজ আমরা অনেক সময় সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, কিন্তু তার মন বোঝার চেষ্টা করি না। অথচ যে হৃদয়ে ভালোবাসা পৌঁছায় না, সেখানে উপদেশও খুব বেশি দিন টেকে না। হজরত আনাস (রা.) দীর্ঘদিন নবীজির সেবায় ছিলেন। তিনি পরে বলেছেন, এত বছর একসঙ্গে থাকার পরও নবীজি কোনো ভুলের জন্য তাঁকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করেননি। কোথাও ভুল হলে তিনি অপমানের পরিবর্তে সংশোধনের পথ বেছে নিয়েছেন। এই শিক্ষাটি আজকের পরিবারের জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক শিশুই এখন ভয় পেয়ে সত্য কথা বলতে শেখে না। পরীক্ষায় নম্বর কম এলে, কোনো জিনিস ভেঙে ফেললে কিংবা ছোট কোনো ভুল করলেও তারা প্রথমে ভাবে—‘বাবা-মা বকবেন কি না’। অথচ শিশুর চরিত্র গঠনের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হওয়া উচিত তার নিজের ঘর।


একটি শিশু যদি প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্দার সামনে কাটায়, অথচ পরিবারের সঙ্গে একবেলা বসে গল্প করার সময় না পায়, তা হলে সে তথ্য পাবে ঠিকই, কিন্তু জীবনের শিক্ষা পাবে না। তথ্য মানুষকে দক্ষ করে, কিন্তু চরিত্র গড়ে সম্পর্ক। আর সেই সম্পর্কের প্রথম বিদ্যালয় পরিবার। নবীজির ঘরে শিশুদের জন্য আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিক পাঠশালা ছিল না।

কিন্তু তাঁর প্রতিটি আচরণই ছিল শিক্ষা। তিনি শিশুদের সালাম দিতেন, তাদের সঙ্গে কথা বলতেন, কোলে তুলে নিতেন, খেলতেন, তাদের অনুভূতির মূল্য দিতেন। শিশুরা তাঁর কাছে ভয় নিয়ে নয়, ভালোবাসা নিয়েই আসত। এই একটি পরিবেশই একজন শিশুর মানসিক বিকাশের সবচেয়ে বড় শক্তি। আজ আমাদের ঘরে হয়তো আগের মতো বড় উঠান নেই, বিকালের মাঠও কমে গেছে। কিন্তু পরিবারের মানুষগুলো তো এখনও আছে। প্রতিদিন কিছু সময় যদি মোবাইলের পর্দা নিভিয়ে বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে বসেন, তার দিনের গল্প শোনেন, একসঙ্গে খাবার খান, একটি বই পড়েন বা শুধু হাঁটতে বের হন, তা হলেও শিশুর মানসিক জগতে তার গভীর প্রভাব পড়ে। শিশু দামি উপহার কত দিন মনে রাখে, তা বলা কঠিন; কিন্তু বাবা-মায়ের দেওয়া সময় সে অনেক বছর মনে রাখে।

একটি কথা আমাদের মনে রাখা দরকার— শিশুরা আমাদের সম্পত্তি নয়; তারা আমাদের কাছে অর্পিত আমানত। আজ আমরা তাদের সঙ্গে যেমন আচরণ করব, আগামী দিনের সমাজও তেমনই হবে। যে ঘরে শিশুকে সম্মান দেওয়া হয়, সে ঘর থেকেই সম্মান করতে শেখা মানুষ বেরিয়ে আসে। যে পরিবারে শিশুর কথা ধৈর্য নিয়ে শোনা হয়, সেই শিশুই বড় হয়ে অন্যের কথা শুনতে শেখে। আর যে সন্তান ছোটবেলা থেকেই মমতা পায়, সেই একদিন অন্য মানুষের প্রতি মমতাশীল হয়।

হজরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, সন্তানের যেমন পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি পিতা-মাতারও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। এই ভারসাম্যই ইসলামের সৌন্দর্য। এখানে অধিকার যেমন আছে, তেমনি দায়িত্বও আছে। আজ আমরা কেমন প্রজন্ম রেখে যেতে চাই— এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বিদ্যালয় দেবে না, শুধু রাষ্ট্রও দেবে না। এর উত্তর লেখা হবে আমাদের প্রতিদিনের পারিবারিক আচরণে, আমাদের কথাবার্তায়, আমাদের সময় দেওয়ার অভ্যাসে এবং আমাদের সন্তানদের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশে।

সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি আরও বদলাবে। নতুন নতুন যন্ত্র আসবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও বিস্তৃত হবে, পৃথিবী আরও দ্রুত চলবে। কিন্তু একটি শিশুর হৃদয়ের চাহিদা বদলাবে না। সে তখনও ভালোবাসা খুঁজবে, নিরাপত্তা খুঁজবে, একজন বিশ্বস্ত মানুষ খুঁজবে, যে তাকে বুঝবে। এই কারণেই চৌদ্দশ বছর আগের শিক্ষা আজও পুরোনো হয়নি। বরং প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে তা আরও বেশি প্রয়োজন। কারণ সুস্থ সমাজ গড়ার কাজ কোনো যন্ত্র করে না; সেই কাজ করে সুস্থ পরিবার। আর সুস্থ পরিবারের শুরু হয় একটি শিশুর হাসি, একটি স্নেহময় স্পর্শ এবং একজন দায়িত্বশীল অভিভাবকের হাত ধরে।

লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে
  বিষয়:   প্রযুক্তি  যুগ  শিশু  মনন  গঠন  নবীজি (সা.)  শিক্ষা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: