প্রাণীর প্রতি নবীজি (সা.)-এর মমতা

ইফতেখারুল হক হাসনাইন

ইসলাম

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত এক অনুপম মহামানব। তাঁর দয়া ও মমতার পরিধি মানুষের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ

2026-09-18T11:26:53+00:00
2026-09-18T11:26:53+00:00
 
  শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
প্রাণীর প্রতি নবীজি (সা.)-এর মমতা
ইফতেখারুল হক হাসনাইন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২৬ এএম 
সময়ের আলো গ্রাফিক
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত এক অনুপম মহামানব। তাঁর দয়া ও মমতার পরিধি মানুষের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বিস্তৃত ছিল জীব-জগতের প্রতিটি প্রাণীর প্রতিও। ক্ষুদ্র একটি প্রাণীর কষ্টও তাঁর কোমল হৃদয়কে ব্যথিত করত। পশু-পাখির প্রতি সদাচরণ, এদের প্রতি দয়া এবং অযথা কষ্ট না দেওয়ার শিক্ষা তিনি তাঁর সাহাবায়ে কেরামকে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে ঘোষণা করেছেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭)

প্রাণীর সেবাতেও রয়েছে সওয়াব

প্রাণীর প্রতি দয়া ইসলামে মানবিক সৌজন্যের পাশাপাশি ঈমান ও আল্লাহভীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীর সেবায় সওয়াব রয়েছে’ (সহিহ বুখারি : ২৩৬৩)।

অর্থাৎ মানুষের উপকারের মতো প্রাণীর প্রতি কল্যাণকর আচরণও আল্লাহর কাছে মূল্যবান। একটি প্রাণীকে খাদ্য দেওয়া, তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি পান করানো কিংবা তার কষ্ট লাঘব করা— এসব কাজও মানুষের জন্য সওয়াবের কারণ হতে পারে। একবার এক ব্যক্তি পথ চলতে চলতে প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ল। সে একটি কূপে নেমে পানি পান করে ওপরে উঠে দেখতে পেল, একটি কুকুর তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ভেজা মাটি চাটছে। লোকটি ভাবল, একটু আগে যে তৃষ্ণা তাকে কষ্ট দিয়েছে, কুকুরটিও সেই তৃষ্ণাতেই কষ্ট পাচ্ছে। সে আবার কূপে নেমে নিজের জুতায় পানি ভরে কুকুরটিকে পান করাল। এই কাজের কারণে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন।

সাহাবিরা জিগ্যেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, পশু-পাখির প্রতিও কি আমাদের জন্য সওয়াব রয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীর সেবায় সওয়াব রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি : ২৩৬৩)

একটি বিড়ালের জন্য শাস্তি

অন্যদিকে একটি বিড়ালকে আটকে রেখে অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার কারণে এক নারী শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিল। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘এক নারী একটি বিড়ালের কারণে শাস্তি পেয়েছে। সে বিড়ালটিকে আটকে রেখেছিল; তাকে খাবার দেয়নি, আবার ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে জমিনের পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে’ (সহিহ বুখারি : ২৩৬৫)। এখানে লক্ষ করার বিষয় হলো, প্রাণীটির ওপর সরাসরি কোনো আঘাত করা হয়নি; তাকে খাবার ও স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করাই শাস্তির কারণ হয়েছিল। অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রাণীর অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিও নৈতিক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

মায়ের কাছ থেকে ছানা কেড়ে নেওয়া

মহানবী (সা.) প্রাণীকে বিনোদনের উপকরণ বানানো কিংবা অকারণে কষ্ট দেওয়াকেও নিষেধ করেছেন। একবার সাহাবিরা একটি পাখির ছানা ধরে ফেললে মা পাখিটি অস্থির হয়ে তাদের মাথার ওপর উড়তে থাকে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘কে এই পাখিটিকে তার ছানা নিয়ে কষ্ট দিয়েছে? তার ছানাটি তার কাছে ফিরিয়ে দাও’ (সুনানে আবু দাউদ : ২৬৭৫)। একটি পাখির মাতৃত্বের অনুভূতিকেও তিনি উপেক্ষা করেননি। মানুষের মতো প্রাণীরও আপনজনের প্রতি টান আছে— এই বাস্তবতাকে তিনি সাহাবিদের সামনে অত্যন্ত কোমলভাবে তুলে ধরেছেন।

উটের অভিযোগ ও মালিকের দায়িত্ব

একবার তিনি একটি উটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। উটটি তাঁকে দেখে এমনভাবে শব্দ করতে লাগল, যেন তার কোনো অভিযোগ আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার কাছে গিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। এরপর তিনি উটটির মালিককে ডেকে বললেন, ‘তুমি কি এই প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো না? সে আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে তুমি তাকে ক্ষুধার্ত রাখো এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম করাও’ (সুনানে আবু দাউদ : ২৫৪৯)। এই ঘটনা ইসলামের প্রাণী কল্যাণের দর্শনের একটি গভীর দিক উন্মোচন করে। মানুষের মালিকানাধীন কোনো প্রাণী তার মালিকের সম্পদ হলেও তার প্রতি মালিকের আচরণ সীমাহীন নয়। মালিকানা দায়িত্বহীনতার অনুমতি দেয় না। প্রাণীকে খাদ্য দিতে হবে, বিশ্রাম দিতে হবে, তার সামর্থ্যরে বাইরে বোঝা চাপানো যাবে না এবং অকারণে নির্যাতন করা যাবে না। মানুষের হাতে থাকা দুর্বল প্রাণীর অধিকার রক্ষার দায়িত্বও মানুষেরই।

বিনোদনের নামে প্রাণী নির্যাতন নয়

রাসুলুল্লাহ (সা.) পশুকে জীবন্ত অবস্থায় লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তীর ছোড়ারও নিষেধ করেছেন। তিনি এমন ব্যক্তির ওপর লানত করেছেন যে জীবন্ত কোনো প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু বানায় (সহিহ বুখারি : ৫৫১৫)। কারণ প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে নিছক খেলাধুলা বা বিনোদন করা মানবিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে প্রাণীর মুখে আঘাত করা ও দাগ দেওয়া থেকেও তিনি নিষেধ করেছেন। (সহিহ মুসলিম : ২১১৬)

জবাইয়েও ইহসানের শিক্ষা

কুরবানির পশুর ক্ষেত্রেও মহানবী (সা.) প্রাণীর প্রতি মমতা ও সৌজন্যের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে ইহসান বা উৎকর্ষ নির্ধারণ করেছেন। তোমরা যখন হত্যা করবে, সুন্দরভাবে হত্যা করবে; যখন জবাই করবে, সুন্দরভাবে জবাই করবে। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধারালো করে নেয় এবং জবাই করা প্রাণীকে যেন কষ্ট থেকে রেহাই দেয়’ (সহিহ মুসলিম : ১৯৫৫)। এই নির্দেশের মধ্যে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দর্শন নিহিত রয়েছে। কোনো প্রাণী মানুষের খাদ্য হিসেবে বৈধ হলেও তাকে কষ্ট দেওয়ার অধিকার মানুষ পায় না। প্রয়োজনের কারণে যে কাজটি বৈধ, সেটিও মানবিকতা ও দয়ার সীমারেখার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। ইসলামে বৈধতা এবং নিষ্ঠুরতা এক বিষয় নয়। বৈধ প্রাণী ভক্ষণও প্রাণীর প্রতি নির্মমতার অনুমতি দেয় না।

আরোহণেও প্রাণীর অধিকার

মহানবী (সা.)-এর প্রাণীর প্রতি মমতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও প্রকাশ পেয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কোমলতা ও স্নেহের নানা দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি পশুর ওপর অযথা ভার চাপানো, ক্ষুধার্ত রাখা, অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো কিংবা তাদের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করাকে অপছন্দ করতেন। এমনকি সফরের সময়ও তিনি প্রাণীর প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা যখন এই নির্বাক প্রাণীদের ওপর ভ্রমণ করো, তখন তাদের উপযুক্ত স্থানে নামিয়ে দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ : ২৫৬৭)

প্রাণীও আল্লাহর সৃষ্টি

প্রাণীর প্রতি এই মমতা মূলত ইসলামের বৃহত্তর রহমতের দর্শনেরই অংশ। ইসলাম মানুষের জীবনকে আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখেছে; একইভাবে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতিও মানুষের দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল কোনো প্রাণী এবং ডানা দিয়ে উড়ে এমন কোনো পাখি নেই, তারা তোমাদের মতোই একেকটি সম্প্রদায়’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৩৮)। প্রাণীরা মানুষের মতো শরিয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত না হলেও তারা আল্লাহর সৃষ্টি, তাঁর তসবিকারী এবং পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আজকের পৃথিবীতে প্রাণীর প্রতি আমাদের আচরণ

আজকের পৃথিবীতে প্রাণীর প্রতি মানুষের আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নের মুখোমুখি। বিনোদনের নামে প্রাণী নির্যাতন, অযথা পেটানো, ক্ষুধার্ত রাখা, অবৈধভাবে আটকে রাখা কিংবা প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনধারা নষ্ট করার ঘটনা কম নয়। শহরের রাস্তায় আহত কুকুর-বিড়াল পড়ে থাকলেও অনেক সময় মানুষ পাশ কাটিয়ে চলে যায়। খামারে কিংবা পরিবহনের সময় পশুর প্রতি অমানবিক আচরণও দেখা যায়। অথচ একজন মুসলমানের কাছে প্রাণীর প্রতিও দায়িত্ববোধ ঈমানি নৈতিকতারই অংশ। প্রাণীর প্রতি দয়া কোনো অতিরিক্ত মানবিকতা নয়, এটি নববী আদর্শেরই অংশ। মহানবী (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, দয়া মানুষের সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো সৌজন্য নয়; দয়া একটি জীবনদর্শন।

যে হৃদয় আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি কোমল, সেই হৃদয়ই প্রকৃত অর্থে রহমতের পরিচয় বহন করে। একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানো যদি আল্লাহর ক্ষমা লাভের কারণ হতে পারে, আর একটি বিড়ালকে অনাহারে রাখা যদি শাস্তির কারণ হয়, তা হলে প্রাণীর প্রতি আমাদের প্রতিটি আচরণের নৈতিক মূল্য কত গভীর— তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে
  বিষয়:   প্রাণীর  নবীজি (সা.)  মমতা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: