একজন মুমিন সবসময় চেষ্টা করেন সেসব কাজ করার যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) পছন্দ করেন। পাশাপাশি সেসব কাজ থেকে বিরত থাকেন যেসব কাজ আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসুল (সা.) অপছন্দ করেন। আর এই কাজ করলে দুটি লাভ হবে— এক. আল্লাহ তায়ালার ভালোবাসা পাওয়া যায়। দুই. আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘হে রাসুল, বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো; তা হলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সুরা আলে ইমরান : ৩১)।
আবার আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের রঙে রঙিন হতে বলেছেন। সুতরাং একজন মুমিন হিসেবে অবশ্যই গ্রহণীয় হলো আল্লাহর রং ও নবীজি (সা.)-এর অনুসরণ। আল্লাহ তায়ালা যেসব গুণ ও বৈশিষ্ট্য ভালোবাসেন এবং নবীজি (সা.) পছন্দ করতেন—তাকওয়া বা আল্লাহভীতি : আল্লাহভীতি হলো সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করা ও তাঁর নিষেধ থেকে দূরে থাকা এবং কুরআন যা কিছুর আদেশ দিয়েছে তা পালন করা।
একজন মুমিন বান্দার জন্য আবশ্যক হলো আল্লাহভীতি অর্জন করা। কেননা আল্লাহ ও রাসুল (সা.) এই গুণকে পছন্দ করেন এবং মুমিনদের তিনি তাকওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাকো, তবে আমাকে ভয় করো’ (সুরা আলে ইমরান : ১৭৫)। এ ছাড়া তিনি অন্যত্র বলেন, ‘আমি তোমাদের পূর্ববর্তী গ্রন্থের অধিকারীদের এবং তোমাদের নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা সবাই আল্লাহকে ভয় করতে থাকো’ (সুরা নিসা : ১৩১)। নবীজি (সা.) এ বিষয়ে বলেন, ‘তোমাদের প্রভু আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করো। রমজানের রোজা রাখো। তোমাদের সম্পদের জাকাত আদায় করো। তোমাদের নেতৃস্থানীয়দের আনুগত্য করো। আর তোমাদের প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ করো।’ (তিরমিজি : ৬১৬)
ধৈর্যধারণ করা : যুগে যুগে যত নবী, রাসুল, খলিফা ছিলেন তাদের অন্যতম গুণ ছিল ধৈর্যধারণ করা ও সহনশীল হওয়া। বর্তমান সময়ে এই গুণে গুণান্বিত হওয়া খুবই জরুরি, কেননা বর্তমান সময়ের মানুষের মাঝে এই গুণের অভাব বিরাজমান। এই গুণের মর্যাদা, গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে পবিত্র আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ধৈর্যধারণের কারণে তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আর তোমাদের এই শেষ ঠিকানা কতই না চমৎকার’ (সুরা রাদ : ২৪)। তিনি এ বিষয়ে আরও ইরশাদ করেন, ‘ধৈর্যধারণের প্রতিদানস্বরূপ জান্নাতে তাদের কক্ষ দেওয়া হবে এবং সেখানে তারা অভ্যর্থনা ও সালাম পাবে।’ (সুরা ফুরকান : ৭৫)
ধীরস্থিরতা অবলম্বন করা : ধীরস্থিরতা মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পালনীয় গুণ। কেননা নবীজি (সা.) বলেছেন ধীরস্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, আর তাড়াহুড়ো শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। এ ছাড়া নবীজি (সা.) এই বিষয়ে আরও বলেন, ‘নিশ্চয় তোমার ভেতর এমন দুটি অভ্যাস রয়েছে, যে দুটি আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন। প্রজ্ঞা ও ধীরস্থিরতা’ (মুসলিম : ১৭)। যেকোনো কাজে তাড়াহুড়ো করলে সে কাজে বরকত থাকে না। দেখা যায় যে, দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তাড়াহুড়ো করলেও বারবার ভুলের কারণে সেই কাজ শেষ হতে আরও বেশি সময় লেগে যায়।
মানুষের প্রতি অনুগ্রহ : মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করা একটি মহৎ কাজ। কেননা এই গুণকে আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন। যেমন এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র আল কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর পথে ব্যয় করো, তবে নিজের জীবনকে ধ্বংসের সম্মুখীন করো না। আর মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করো। নিশ্চয় আল্লাহ অনুগ্রহকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা : ১৯৫)
বেশি বেশি তওবা করা : আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বহু জায়গায় তওবা করার কথা বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা তওবাকারীকে ভালোবাসেন। যেমন পবিত্র আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীকে ভালোবাসেন’ (সুরা বাকারা : ২২২)। এ ছাড়া হাদিসে তওবাকারীকে উত্তম বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মাত্রই গুনাহগার। আর গুনাহগারদের মধ্যে তওবাকারীরাই উত্তম।’ (ইবনে মাজাহ : ৪২৫১)
আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা : সব কাজে, কষ্টে-আনন্দে, সুখে-দুঃখে, সচ্ছলতা-অসচ্ছলতা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তায়ালার ওপর পরিপূর্ণ ভরসা রাখতে হবে। কোনো কাজে হতাশ হওয়া যাবে না। আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকরীদের পছন্দ করেন। কুরআনে তিনি ইরশাদ করেন, ‘হে রাসুল, আপনি যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, তখন আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করুন; নিশ্চয় আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৫৯)
সর্বদা ন্যায়বিচার করা : ন্যায়বিচার করা সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) বারবার ন্যায়বিচার করার জন্য বলেছেন। এ ছাড়া নবীজি (সা.) আজীবন ন্যায়বিচার করে গেছেন। আর আল্লাহ তায়ালা ন্যায়বিচারকারীকে ভালোবাসেন। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘যদি বিচার করেন, তবে ন্যায়ভাবে ফয়সালা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা মায়েদা : ৪২)
যেহেতু আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের রঙে আমাদের রঙিন হতে বলেছেন, সেহেতু তিনি যেসব গুণাবলি পছন্দ করেন সেগুলো অর্জন করতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর পছন্দনীয় গুণাবলি জীবনের সর্বাবস্থায় মেনে চলতে হবে। এসব গুণ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) ভালোবাসেন। সুতরাং আমাদের সবার উচিত এসব গুণ অর্জন করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলা।
লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/কেএইচও