কুরআনের আলোকে কথার সৌন্দর্য

মোহাম্মদ এনামুল হক

ইসলাম

মানুষের ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা, রুচি ও চরিত্রের অন্যতম প্রকাশ ঘটে তার কথাবার্তায়। মানুষ কী বলছে, কীভাবে বলছে এবং কোন পরিস্থিতিতে কোন

2026-09-16T09:17:20+00:00
2026-09-16T09:19:03+00:00
 
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
কুরআনের আলোকে কথার সৌন্দর্য
মোহাম্মদ এনামুল হক
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:১৭ এএম  আপডেট: ১৬.০৯.২০২৬ ৯:১৯ এএম
কুরআনের আলোকে কথার সৌন্দর্য। গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষের ব্যক্তিত্ব, শিক্ষা, রুচি ও চরিত্রের অন্যতম প্রকাশ ঘটে তার কথাবার্তায়। মানুষ কী বলছে, কীভাবে বলছে এবং কোন পরিস্থিতিতে কোন শব্দ ব্যবহার করছে, তার মধ্যেই ফুটে ওঠে তার মানসিকতা ও মূল্যবোধ। একটি সুন্দর কথা যেমন মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দিতে পারে, তেমনি একটি কটু কথা মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। 

তাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মানুষের কথাবার্তা ও আচরণ সম্পর্কে দিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনা। কুরআন শুধু কী বলতে হবে তা নয়, কীভাবে বলতে হবে এবং কোন কথা থেকে বিরত থাকতে হবে, সে শিক্ষাও দিয়েছে। কথাবার্তার প্রথম শর্ত হলো সত্যবাদিতা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো’ (সূরা আহযাব : ৭০)। 

একজন মুমিনের মুখ থেকে মিথ্যা, প্রতারণা কিংবা বিভ্রান্তিকর কথা বের হওয়া উচিত নয়। সত্য কখনো কঠিন হতে পারে, কিন্তু সত্যের সৌন্দর্য হলো, তা মানুষের বিবেককে শান্ত রাখে এবং সমাজে বিশ্বাস ও আস্থা প্রতিষ্ঠা করে। কথা সত্যের পাশাপাশি বিষয়েও উত্তম হতে হবে। 


আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো’ (সুরা বাকারাহ : ৮৩)। এই সংক্ষিপ্ত আয়াতের মধ্যে মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণের গভীর শিক্ষা রয়েছে। শুধু সত্য কথা বলাই যথেষ্ট নয়, সত্য কথাটিও সুন্দর, মার্জিত ও শালীন ভাষায় বলা উচিত। কারণ সত্যকে এমনভাবে বলা উচিত নয়, যাতে অকারণে কারও সম্মানহানি হয় কিংবা তার হৃদয়ে কষ্ট সৃষ্টি হয়। 

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন এমন কথা বলে যা উত্তম’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৫৩)। অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় কটু কথা, অশালীন ভাষা, বিদ্রুপ ও রূঢ়তা পরিহার করতে হবে।

কথাবার্তায় কোমলতা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আল্লাহ তায়ালা হজরত মুসা (আ.) ও হজরত হারুন (আ.)-কে ফেরাউনের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে কোমল কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে’ (সুরা ত্বহা : ৪৪)। ফেরাউনের মতো একজন উদ্ধত ও অত্যাচারী শাসকের সঙ্গেও কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা হলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের কথাবার্তায় কোমলতা কতটা প্রয়োজন, তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। কোমলতা দুর্বলতার পরিচয় নয়, বরং নিজের রাগ ও আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তির পরিচয়।

প্রতিটি কথার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। মানুষ অনেক সময় না ভেবেই কথা বলে ফেলে। কিন্তু কুরআন আমাদের সতর্ক করেছে, মানুষের প্রতিটি কথাই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে’ (সুরা কাফ : ১৮)। একটি কথা কয়েক মুহূর্তে বলা হয়ে যায়, কিন্তু তার প্রভাব অন্যের মনে দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। 

তাই কথা বলার আগে চিন্তা করা, প্রয়োজনীয় কথা বলা এবং ক্ষতিকর কথা থেকে বিরত থাকা একজন মুমিনের দায়িত্ব। পাশাপাশি আমাদের অনর্থক কথা থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের গুণাবলি বর্ণনা করে বলেন, ‘যারা অনর্থক কথা থেকে বিরত থাকে’ (সুরা মুমিনুন : ৩)। সব কথা বলা জরুরি নয়। অনর্থক ও অর্থহীন কথাবার্তা সময় নষ্ট করে এবং অনেক সময় মানুষকে অনাকাঙ্ক্ষিত গুনাহের দিকে নিয়ে যায়। তাই কথাবার্তায় সংযম থাকা উচিত। কখনো কখনো নীরব থাকাও প্রজ্ঞার পরিচয়।


আজকের যুগে কথাবার্তার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন শুধু মুখের কথাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি মন্তব্য, পোস্ট কিংবা বার্তাও মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে একটি কথার প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। দুঃখজনকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটু মন্তব্য, অপমান, গিবত, বিদ্রুপ, মিথ্যা তথ্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতা বেড়েছে। অনেক সময় মানুষ যাচাই না করেই কোনো তথ্য ছড়িয়ে দেয়। অথচ কুরআনের শিক্ষা আমাদের সতর্ক করে, কথা বলার ক্ষেত্রে যেমন সংযম প্রয়োজন, তেমনি কোনো সংবাদ বা তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। 

তাই কুরআনের কথার আদব শুধু মুখে বলা কথার জন্য নয়, আমাদের লেখা, মন্তব্য, বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিটি প্রকাশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমাদের কণ্ঠ ও কলম উভয়ই যেন সত্য, সৌন্দর্য ও কল্যাণের বাহন হয়। কুরআনের শিক্ষা হলো, সত্য বলতে হবে, উত্তম কথা বলতে হবে, কোমলভাবে কথা বলতে হবে, অনর্থক কথা থেকে বিরত থাকতে হবে, অহংকার ও কটূক্তি পরিহার করতে হবে, কাউকে উপহাস বা অপমান করা যাবে না, গিবত থেকে দূরে থাকতে হবে এবং মতবিরোধের সময়ও প্রজ্ঞা ও সুন্দর পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। কথা মানুষের চরিত্রের আয়না। 

একটি সুন্দর কথা ভেঙে যাওয়া মনকে সান্ত্বনা দিতে পারে, একটি সম্পর্ক রক্ষা করতে পারে এবং একটি সমাজে শান্তির বীজ বপন করতে পারে। বিপরীতে একটি অবিবেচনাপ্রসূত কথা মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। তাই আমাদের প্রতিটি কথা হোক সত্য, সুন্দর, সংযত ও কল্যাণকর। আমাদের জিহ্বা ও কলম যেন কারও অকারণ কষ্টের কারণ না হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এমন কথা বলার তওফিক দান করুন, যে কথায় সত্য থাকবে, প্রজ্ঞা থাকবে, মানবিকতা থাকবে এবং থাকবে তাঁর সন্তুষ্টির প্রত্যাশা।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   কুরআন  কথা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: