রাগের মুহূর্তেও উত্তম আচরণ

সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান

ইসলাম

মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হলো অন্যের মন্দ আচরণের জবাব কীভাবে দেওয়া হবে। অপমান, বিদ্বেষ, শত্রুতা কিংবা কটু

2026-09-15T09:28:21+00:00
2026-09-15T09:29:01+00:00
 
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
রাগের মুহূর্তেও উত্তম আচরণ
সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:২৮ এএম  আপডেট: ১৫.০৯.২০২৬ ৯:২৯ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হলো অন্যের মন্দ আচরণের জবাব কীভাবে দেওয়া হবে। অপমান, বিদ্বেষ, শত্রুতা কিংবা কটু কথার মুখোমুখি হলে প্রতিশোধ নেওয়া মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু কুরআন মানুষকে এর চেয়ে অনেক উচ্চতর নৈতিকতার শিক্ষা দিয়েছে।

ইসলাম প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা, বিদ্বেষের পরিবর্তে সৌহার্দ এবং মন্দের জবাবে উত্তম আচরণকে ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরেছে, যা কেবল ব্যক্তিগত চরিত্র গঠনের শিক্ষা নয়; বরং একটি শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণময় সমাজ প্রতিষ্ঠারও মৌলিক ভিত্তি।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত করো তা দ্বারা যা উৎকৃষ্টতর, তা হলে তোমার ও যার মধ্যে শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো’ (হা-মীম সাজদাহ : ৩৪)। এই আয়াত পবিত্র কুরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৈতিক নির্দেশনা। 

এখানে আল্লাহ মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে ঈমানের প্রতিক্রিয়া শিক্ষা দিয়েছেন। সাধারণত কেউ কষ্ট দিলে মানুষও তাকে কষ্ট দিতে চায়। কিন্তু একজন মুমিনের পরিচয় হলো সে নিজের নফসের অনুসরণ করে না; বরং আল্লাহর নির্দেশকে প্রাধান্য দেয়। তাই সে মন্দের উত্তরে মন্দ নয়, বরং উত্তম আচরণ বেছে নেয়।

‘উত্তম আচরণ’ বলতে শুধু মুখে কোমল ভাষা ব্যবহার করাই বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষমা করা, ধৈর্য ধারণ করা, ক্রোধ সংবরণ করা, প্রতিশোধের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা পরিহার করা, অপরের ভুল সংশোধনের চেষ্টা করা এবং সম্পর্ক পুনর্গঠনে আন্তরিক হওয়া। কখনো একটি হাসিমুখ, কখনো একটি সুন্দর বাক্য, কখনো আন্তরিক সালাম কিংবা প্রয়োজনের সময় সাহায্যের হাত বাড়ানো— এসবও মন্দকে উত্তম দ্বারা প্রতিহত করার বাস্তব রূপ।

আল্লাহ এই আয়াতে একটি বিস্ময়কর ফলাফলের কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, উত্তম আচরণের ফলে শত্রুও একসময় ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো হয়ে যেতে পারে। এটি কেবল একটি নৈতিক উপদেশ নয়; বরং মানবমনের গভীর বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত। কঠোরতার জবাবে কঠোরতা মানুষের অহংকারকে আরও জাগিয়ে তোলে, কিন্তু উদারতা অনেক সময় কঠিন হৃদয়ও গলিয়ে দেয়। ইতিহাসে অসংখ্য মানুষের ইসলাম গ্রহণের পেছনে মুসলমানদের এই মহান চরিত্রই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘এই চরিত্রের অধিকারী কেবল তারাই হয় যারা ধৈর্যশীল, এই চরিত্রের অধিকারী তারাই হয় যারা মহাভাগ্যবান’ (হা-মীম সাজদাহ : ৩৫)। এ আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে মন্দের জবাবে উত্তম আচরণ করা সহজ কাজ নয়। এটি আবেগের নয়, ঈমানের সিদ্ধান্ত। মানুষের নফস প্রতিশোধ চায়, কিন্তু ঈমান ক্ষমার দিকে আহ্বান জানায়। 

তাই ধৈর্য ছাড়া এই গুণ অর্জন সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেই প্রকৃত অর্থেই শক্তিশালী। তাই আল্লাহ এই গুণকে সৌভাগ্যবানদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পবিত্র কুরআনের অন্যত্রও একই শিক্ষা পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন’ (সুরা আলে ইমরান : ১৩৪)। 

এই আয়াতে মুত্তাকিদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ একত্রে বর্ণনা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ক্রোধ দমন ও ক্ষমাশীলতার কথা। রাগ হওয়া মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; কিন্তু সেই রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা ঈমানদারের পরিচয়। যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দমন করে, সে নিজের চরিত্রকে উন্নত করে এবং সমাজেও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। এরপর মানুষকে ক্ষমা করার যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা কেবল মুখে ক্ষমা নয়; বরং অন্তরের বিদ্বেষ দূর করার আহ্বান।

এক হাদিসে নবীজি বলেছেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’ এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সবচেয়ে বড় বিজয় অন্যের ওপর নয়; নিজের নফসের ওপর। আজকের সমাজে এই শিক্ষার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এখন সামান্য মতপার্থক্য থেকেই বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে। 


পারিবারিক জীবনে ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। ব্যবসা, কিংবা সামাজিক জীবনেও প্রতিশোধের সংস্কৃতি দিন দিন বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় কুরআন এবং রাসুল (সা.)-এর হাদিসের শিক্ষার অবলম্বনে উত্তম ভাষা, সংযত প্রতিক্রিয়া এবং ক্ষমাশীল মনোভাব বহু বিরোধকে বড় হওয়ার আগেই থামিয়ে দিতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, ইসলাম কখনো অন্যায়ের সমর্থন করে না। অত্যাচারের প্রতিবাদ করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং নিজের অধিকার রক্ষা করাও ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা ও অহংকার থেকে প্রতিশোধ নেওয়াকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে। যেখানে ক্ষমা মানুষের সংশোধন ও সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথ খুলে দেয়, সেখানে ক্ষমাই উত্তম। আর যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা জরুরি, সেখানে শরিয়ত ন্যায়সংগত প্রতিকারের সুযোগ রেখেছে।

একজন মুমিনের চরিত্রের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তখনই, যখন সে প্রতিকূল অবস্থায়ও কুরআন-হাদিসের শিক্ষা আঁকড়ে ধরে। অন্যের ভুলের উত্তরে নিজের চরিত্রকে কলুষিত না করে বরং আরও উন্নত করা এটাই ঈমানের দাবি। কারণ একজন মুসলমানের লক্ষ্য কেবল মানুষের প্রশংসা অর্জন নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা।

মন্দের জবাবে উত্তম আচরণ দুর্বলতার পরিচয় নয়; এটি তাকওয়া ও পরিপক্ব ঈমানের প্রকাশ।

যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ক্ষমাকে বেছে নিতে পারে এবং উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করতে পারে, সে-ই প্রকৃত অর্থে কুরআনের শিক্ষাকে ধারণ করেছে। কুরআন এবং রাসুল (সা.)-এর এই মহান শিক্ষা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে বাস্তবায়িত হলে শত্রুতার জায়গায় বন্ধুত্ব, বিদ্বেষের জায়গায় ভালোবাসা এবং বিভেদের জায়গায় সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে উঠবে। 

আর তখনই কুরআনের এই চিরন্তন শিক্ষা মানুষের জীবনকে সত্যিকার অর্থে আলোকিত করবে। 


সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে/এমকে
  বিষয়:   রাগ  মুহূর্ত  উত্তম  আচরণ 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: